রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না কেউ!

রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুর দায় নিচ্ছে না কেউ!

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

রাজধানীর মালিবাগে পাশাপাশি দু’টি রেললাইনের মাঝে ফলের পসরা সাজিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান। সেখানে ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন ফল কিনতে। ট্রেন আসার সংকেত পেয়ে আবার দৌঁড় দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান সিদ্দিক।

এভাবেই ১০ বছর ধরে লেভেল ক্রসিংয়ের আশেপাশে ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছেন তিনি। তার মতো অনেকেই বিভিন্ন পয়েন্টে লেভেল ক্রসিং ঘেঁষে দোকান করছেন। জুরাইন রেললাইনে সারি সারি ফলের দোকান। সেখানে নিয়মিত অসংখ্য পথচারী চলাচল করে। ট্রেন আসার সংকেত পেলেই তড়িঘড়ি করে তারা রেললাইন থেকে সরে যায়। দোকানগুলোর ওপরে ছাওনিগুলো সরিয়ে ফেলে। আবার ট্রেন চলে গেলে মহূর্তেই সেগুলো টানিয়ে দেয়। মানুষগুলো দোকানের আড়াল থেকে বের হয়।

কমলাপুর থেকে মগবাজার পর্যন্ত রেললাইন ধরে হাঁটলে অনেকগুলো লেভেল ক্রসিং চোখে পড়ে। এসবের অধিকাংশই অসংরক্ষিত। সিদ্দিকের মতো ক্রসিংসের আশেপাশে চায়ের টং দোকান ও ফল-সবজিসহ নিত্যপণ্যের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন দোকানিরা। অবৈধ ক্রসিংয়ের কোথাও কোনো বেরিকেড নেই। ট্রেন আসলে পথচারীদের সংকেত দেয়ার মতোও কেউ নেই।

অবাধে চলছে মানুষের চলাফেরা। ছোট ছোট যানবাহনও ক্রসিং দিয়ে পার হচ্ছে। বারবার উচ্ছেদের পরও রেললাইনের আশেপাশে ছাউনি দিয়ে ঘরবাড়ি গড়ে তুলেছেন অনেকে। রেললাইনের দু’পাশে ইটের স্তূপও রেখে দিয়েছেন স্থানীয়রা।

এই চিত্র শুধু কমলাপুর থেকে মগবাজার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নেই। সারাদেশে এমন অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে এক হাজারের উপরে। এতে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। ভারী হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে রেলপথে ৯৫২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৭৮ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১১৪০ জন। এরমধ্যে মার্চ মাসে সর্বোচ্চ ২২২টি দুর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৮৬ জন। আর জুলাই মাসে ঈদযাত্রাসহ ১৪২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৪ জন। আহত হন ২৩২ জন।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, সারাদেশে দুই হাজার ৯০০ কিলোমিটার রেলপথে ক্রসিং রয়েছে দুই হাজার ৭৮৯টি। এরমধ্যে ৪৭ শতাংশ অর্থাৎ এক হাজার ৩২১টি লেভেল ক্রসিং অবৈধ। আর বৈধ এক হাজার ৪৬৮টির মধ্যে ৬১ শতাংশ অর্থাৎ ৯০৪টিতেই কোনো নিরাপত্তারক্ষী নেই। যদিও আইন অনুযায়ী রেলপথে লেভেল ক্রসিং নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে অনুমোদন নিতে হয়।

অনুমোদনহীন এসব লেভেল ক্রসিং গড়ে ওঠায় শুধুমাত্র যে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিন, কোচ ও রেলপথ।

সূত্র জানায়, রেলওয়ে পূর্ব ও পশিচমাঞ্চল মিলে অনুমোদন ছাড়া এসব লেভেল ক্রসিংয়ের ৯৫০টিই নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এছাড়া অবৈধ আরও ১২টি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), ৫৪টি সিটি করপোরেশন, ৯টি উপজেলা পরিষদ, ১১৬টি বিভিন্ন পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ও ১৭০টি লেভেল ক্রসিং অন্যান্য সংস্থা নির্মাণ করেছে। লেভেল ক্রসিংয়ের গেটের ওপর মোটরযান থামানো আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ হলেও তার তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন মোটরসাইকেল, লেগুনা, রিকশা থামিয়ে যাত্রী উঠা-নামা করছে। বিভিন্ন লেভেল ক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা গেটকিপারদের অভিযোগ- ট্রেন আসার সংকেতে বেড়িয়ার নামিয়ে দিলেও মানুষ তার নিচ দিয়ে চলাফেরা করে।

বেড়িয়ার নামাতে দেখলে ট্রেনের আগে গাড়ি পার হওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সংকেত অমান্য করে অধিকাংশ সময়ে লেগুনা, মোটরসাইকেল আর সাইকেলের চালকরা বেড়িয়ার হাত দিয়ে উঁচু করে রেললাইন পার হয়।

ঢাকার কমলাপুর-এয়ারপোর্ট রেইলাইনে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ বার ট্রেন আসা যাওয়া করে উল্লেখ করে রাজধানীর মালিবাগে লেভেল ক্রসিংয়ের দায়িত্বে থাকা গেটকিপার মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ট্রেন আসার সংকেত পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে বেরিকেড নামাই। গাড়িগুলো এটা দেখে ঝুঁকি নিয়ে আরও দ্রুত পার হতে চায়। অনেকেই বেরিকেডের পাশে ফাঁকা দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলে যায়। অনেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিকেড হাত দিয়ে উঁচু করে চলে যায়। আমরা যদি তখন তাদের বাধা দেই তাহলে আমাদের হুমকি দিতে আসে। মানুষের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়।

এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলের ওপর দিয়ে যারা রাস্তা করে এই দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। রেল তো নিজস্ব লাইনে চলে। রাস্তার কোনো গাড়িকে রেল ধাক্কা দেয় না। গাড়িগুলো উল্টো রেলের লাইনে চলে এসে ধাক্কা খায়। এখন এটার দায় আমাদের না। কেউ রেলের রাস্তা দিয়ে ক্রসিং করলে সেটার নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে।

এ ব্যাপারে দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ বলেন, লেভেল ক্রসিংয়ের রাস্তাগুলো ভাঙা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। তখন ট্রেন আসলে দুর্ঘটনা হয়। ক্রসিংয়ের আশেপাশে হাটবাজার থাকায় কোলাহলের শব্দে ট্রেন আসার শব্দ শোনা যায় না দেখাও যায় না। ফলে মনে হয় হঠাৎ করে ট্রেন চলে আসায় দুর্ঘটনা হয়। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই লেভেল ক্রসিং ঝুঁকিপূর্ণ। এরমধ্যে যদি আবার গেটম্যান না থাকে বা অবৈধ লেভেল ক্রসিং হয় তাহলে সেটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়। কারণ তখন সেসব লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো সাইন, সিগনাল থাকে না। ট্রেন আসার কোনো সংকেত দেয়ার কেউ থাকে না।

লেভেল ক্রসিংয়ের এলাকায় হাটবাজার, দোকানপাট যেন না বসতে পারে কর্তৃপক্ষকে সেদিকে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়ে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো চিহ্নিত করে দুইপাশে গতি কমানোর ব্যবস্থা করা উচিত বলেও জানান তিনি।
সুত্র : মানবজমিন

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!