ফারাক্কা বাঁধের ইতিকথা

মোহাম্মদ সাখাওয়াৎ হোসেন ইবনে মইন চৌধুরী
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কেন প্রয়োজন দেখা দিলো এই বাঁধ নির্মাণের! ভারতবর্ষ বিভক্তির পর করম চাঁদ গান্ধী আশা করেছিল সুজলা-সুফলা পূর্ব বাংলা তাদের অধীনে থাকবে! কিন্তু তখনকার মুসলিম নেতারা শের-এ-বাংলা, একেএম ফজলুল হক, নবাব খাজা স্যার সলিমুল্লাহ, মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো দুরদর্শিত সম্পন্ন নেতারা বুঝতে পারেন ইন্ডিয়ার সাথে থাকলে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে! তাই তারা ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এরপর থেকে তারা নানা প্রকার কূটকৌশল শুরু করে। তারপর ১৯৪৬ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে বহু মুসলিম পরিবার নির্মম ভাবে হত্যা, নির্যাতন, জুলুম, নিপীড়নের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ পূর্ব বাংলায় চলে আসে!বাঙালি ছাড়া উর্দু ভাষীরা এখনো মজলুম। চরম সাম্প্রদায়িক অপশক্তি হিন্দুস্থান হাল ছাড়ে না? তারা ৬০ এর দশকে ফারাক্কার বাঁধ দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তাভাবনা করে শুরু করে। কিন্তু তখনকার পাকিস্তান সরকার আর বাঙালী সেনাবাহিনীর শক্ত মেরুদণ্ড থাকায় কাজের গতি ধীরে চলতে থাকে!

ইতিহাস যা বলে
ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা নদীর উপর অবস্থিত একটি বাঁধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই বাঁধটি অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২,২৪০ মিটার (৭,৩৫০ ফুট) লম্বা যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় বানানো হয়েছিল। বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ফিডার খালটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল (৪০ কিমি)। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর গঙ্গার জল বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা শুরু করে।

১৯৭৪ সালের ১৬ মে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এই সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত হয় যে, উভয় দেশ একটি চুক্তিতে আসার আগে ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করবে না। যদিও বাঁধের একটি অংশ পরীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৫ সালে দশ দিনের (২১ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ২১ মে ১৯৭৫) জন্য ভারতকে গঙ্গা হতে ৩১০-৪৫০ কিউসেক পানি অপসারণ করার অনুমতি দেয়। কিন্তু ভারত ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত গঙ্গা নদী থেকে ১১৩০ কিউসেক পানি অপসারণ করে পশ্চিমবঙ্গের ভাগরথি-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করে।ভারতকে পানি অপসারণে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়ে, বাংলাদেশ এই বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করে। ২৬ নভেম্বর ১৯৭৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ভারতকে বাংলাদেশের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়টির সুরাহার করার নির্দেশ দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। কয়েকবার বৈঠকের পর উভয় দেশ ৫ নভেম্বর ১৯৭৭ সালে একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও ভারত পরবর্তি পাঁচ বছরের (১৯৭৮-৮২) জন্য শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগ করে নেবে। ১৯৮২’র অক্টোবরে উভয় দেশ ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালে পানি বণ্টনের একটি চুক্তি করে। নভেম্বর ১৯৮৫ সালে আরও তিন বছরের (১৯৮৬-৮৮) জন্য পানি বণ্টনের চুক্তি হয়। কিন্তু একটি দীর্ঘ চুক্তির অভাবে বাংলাদেশ তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য গঙ্গার পানি ব্যবহারে কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেনি। কোনো চুক্তি না থাকায় ১৯৮৯ সালের শুষ্ক মৌসুম থেকে ভারত একতরফা প্রচুর পরিমাণ পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নেয়, ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশর নদ-নদীতে পানি প্রবাহের চরম অবনতি ঘটে।

১৯৯২ সালের মে মাসে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীদের এক বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে ভারত বাংলাদেশকে সমান পরিমাণ পানি দেবার ব্যাপারে সম্ভাব্য সকল কিছু করবে। ফলে এরপর দুই দেশের মধ্যে কোন মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়নি।

১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রীজ অঞ্চলে মাত্র ২৬১ কিউসেক পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যেখানে ফারাক্কা-পূর্ব সময়ে একই অঞ্চলে ১৯৮০ কিউসেক পানি প্রবাহিত হতো। ১৯৯৩ সালের মে মাসে যখন উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আবার মিলিত হন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে দেয়া তার কথা রাখতে ব্যর্থ হন। অবশেষে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়া ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই করেন। ইতিহাস জানান দেয়, হিন্দুস্হান কখনই বাংলাদেশের মৌলিক ও ন্যায্য অধিকার গুরুত্ব দেয়নি?এমন কি কোন প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেনি! এমন অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বয়োবৃদ্ধ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী করেন ফারাক্কা লং মার্চ। ১৯৭৬ সংগঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে ভারত কর্তৃক একতরফা গঙ্গার জল অপসারণের মাধ্যমে পদ্মা নদীকে জলশূন্য করে ফেলার বিরূদ্ধে। বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা মাওলানা ভাসানী এই প্রতিবাদী পদযাত্রার আহবান করেন। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার এই লঙ মার্চ আয়োজনে সহায়তা দিয়েছিল।

১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ এপ্রিল এই বাঁধ চালু করার কয়েক মাসের মধ্যে এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয। বাংলাদেশের পরিবেশে ফারাক্কার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মাওলানা ভাসানী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য জাতির প্রতি আহবান জানান। আর এই লং মার্চ দেশপ্রেমিক সরকার থাকার কারণেই গ্রান্টিকজসহ সম্পন্ন হয়। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ মে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখী এই অভিযাত্রা শুরু করা হয়। যদিও মাওলানা ভাসানী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে ফারাক্কা পর্যন্ত পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছিলেন তবু সরকারের পরামর্শে এই পদযাত্রা ১৭ মে অপরাহ্নে ভারতীয় সীমান্তের কাছে কানসাটে গিয়ে শেষ করা হয়। আজ মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীও নাই, শহীদ জিয়াউর রহমান নাই! বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যরা যাতে দিল্লির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে না পারে কাল্পনিক মামলায় দিশেহারা! আরেকটি কাজ তারা অত্যন্ত সুক্ষ্ম ভাবে করেছে! আর তা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে কথিত স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ বানিয়ে লেবাসধারীদের দিয়ে বিভক্তি করা! তারপর সার্ককে খুব কৌশলে অকার্যকর করে ফেলা! সীমান্তরক্ষী বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বিজিবি করা! আজ এগুলো দেখে মনে পড়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ‘সাপ্তাহিক হককথা’র সেই শিরোনাম ‘বাংলাদেশের সংবিধান দিল্লি’র অনুমোদন নিয়ে দেশে ফিরছে। এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, আমরাও কি সিকিমের পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছি!

ভোটারের ভোটের অধিকার নাই! ইসকনসহ নানা জঙ্গি সংগঠন প্রকাশ্যে বিভিন্ন সামাজিক বিশূঙ্খলা ঘটনার মত অপরাধ ঘটালেও নিরব দর্শক হয়ে থাকতে হয়! কাশ্মীরসহ পুরা ইন্ডিয়াতে নির্বিচারে মুসলিম হত্যা!মসজিদে মাইক ব্যবহার নিষিদ্ধ! অনেক স্হানে গরু জবাই নিষিদ্ধ! বাবরী মসজিদ ভাঙা, নানা জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি বিশ্বমানবতার নেতা রহমুতুল্লিল আল আমিন (স.) প্রসঙ্গে কুটক্তি করা! আর এসবের প্রতিবাদ করতে কথিত ডক্টরেটের হুমকি প্রদান! এরপরই ফারাক্কার বাঁধ খুলে দেয়ার পরও সার্কের পরিবর্তে কথিত বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ পরামর্শক কমিশন (জেসিসি) বৈঠক হতে পারে।

দেশের মেরুদণ্ড সম্পন্ন দেশপ্রেমিকদের মন্তব্য- আজ বাংলাদেশের সিলেট সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পানি বৃদ্ধি বা ফারাক্কার বাঁধ খুলে দেয়ার জন্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক আদালতে দাবী তোলা প্রয়োজন! সেখানে তাদের তাবেদারী যেন করম চাঁদ গান্ধীকে হার মানিয়েছে। নেহেরু -প্যাটেল গং যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল ১০/১৫ বছরের মধ্যে পূর্ব বাংলা তাদের নিয়ন্ত্রণে যাবে! সেটাই বাস্তবায়নের পথে কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহের কারণ বলে মন্তব্য শুরু হয়েছে।

বাংলার দামালরা ১৯৭১ সালে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন ৬ ডিসেম্বর স্বীকৃতি দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ আর সেদিন হিন্দুস্হানের সংসদে তাদের প্রধানমন্ত্রী দরাজ কন্ঠে ঘোষণা দিলেন- ‘হাজার বছর ক্যা বদলা লিয়া’ আজ এগুলো পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। আমাদের অতন্দ্র প্রহরীদের সাথে তাদের যৌথ মহড়া সামরিক বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে! আজ জাতিসংঘ হিন্দুস্হানের কাছ থেকে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে এবারের বন্যায় ক্ষতিপুরণ নিরুপন করে আদায় অথবা তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে কিনা এটাও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণকে আবার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়্ছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক এ্যাসোসিয়েশন (বিআরজেএ)।