আইইইএফএ'র প্রতিবেদন

চীনের তুলনায় মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১০ গুণ বেশি খরচ

মাতারবাড়ির বিদ্যুৎ প্রকল্প ৬৭০০ মানুষের অকাল মৃত্যু ডেকে আনবে

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশে কয়লাচালিত মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ চীনের সমমানের প্রকল্পের তুলনায় ৮ থেকে ১০ গুণ। প্রকল্প ব্যয় ও নির্মাণকাল ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এটি এশিয়ার মধ্যে অন্যতম ব্যয়বহুল কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টস (আইইইএফএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই কথা বলা হয়েছে।

বুধবার এই রিপোর্টটি নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে আইইইএফএ।

‘জাপান-ফান্ডেড মাতারবাড়ী কয়েল প্লান্ট ইন বাংলাদেশ কস্ট এইট টু টেন টাইমস মোর দ্যান কমপ্যার‌্যাবল প্লান্টস ইন চায়না’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারে মাতারবাড়ী এবং মহেশখালীতে বাংলাদেশ বড় ধরনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলছে। এতে ব্যয় হচ্ছে দেড় ট্রিলিয়ন টাকা (১৮০০ কোটি মার্কিন ডলার)। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রতিদিন এক লাখ ১২ হাজার টন কয়লা এবং ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি লোড-আনলোড করার অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ১ ও ২, প্রতিটি ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। এই বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। প্রকল্পের ফেজ-১ এর কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। প্রথম বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ২০২৪ সালের উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হলে বছরে ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টন কয়লা আমদানি করতে হবে।

আইইইএফএর প্রতিবেদনে চীনের কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী অন্যতম প্রতিষ্ঠান শেনহুয়া এনার্জি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্নেষণ করে মাতারবাড়ী প্রকল্পের উচ্চ ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

শেনহুয়া এনার্জির ১৩২০ থেকে ২০০০ মেগাওয়াটের চারটি প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে মাতারবাড়ী প্রকল্পের খরচের তুলনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে ১৩২০ মেগাওয়াটের ফেজ-১ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬০০০ কোটি টাকা। ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৫১ হাজার ৭০ কোটি টাকা। সর্বশেষ প্রকল্প ব্যয় অনুসারে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে মেগাওয়াট প্রতি খরচ ৫০ লাখ ডলার।

অন্যদিকে শেনহুয়ার চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেগাওয়াট প্রতি খরচ ৪ লাখ ৮৮ হাজার থেকে ৬ লাখ ৫৭ হাজার ডলার। অর্থাৎ চীনের চেয়ে মাতারবাড়ী প্রকল্পে আট থেকে দশগুণ বেশি খরচ হচ্ছে বাংলাদেশে।

প্রতিবেদনে এই খরচ বৃদ্ধির পেছনে কিছু কারণ তুলে ধরা হয়- এর মধ্যে রয়েছে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, চুক্তিমূল্য, যন্ত্রপাতি-সরঞ্জামের দাম।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের জন্য জাপান ও কোরিয়ার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। আর শেনহুয়া চীনে তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। চীনা যন্ত্রপাতির দাম কম হলেও এত কম না যে ব্যয়ের পার্থক্য হবে আট থেকে দশগুণ বেশি। চীনের ওই চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে তিনটিই দেশের ভেতরে এবং তা কোনো বন্দরের সুবিধা পায় না। সেখানে হয়তো এই জন্য নির্মাণ খরচ কম পড়েছে।

পক্ষান্তরে মাতারবাড়ী ফেজ-১ এর ক্ষেত্রে একটি যুক্তি দেখানো হয়েছে সেখানে নিজস্ব বন্দর এবং কয়লা হ্যান্ডলিং সুবিধা সংবলিত জেটি তৈরি করা হবে।

এদিকে জাপানের কোম্পানি সুমিতোমো করপোরেশন মাতারবাড়ী ফেজ-২ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নতুন করে অনিশ্চয়তা শুধুই প্রকল্পের খরচ বাড়িয়েছে।

২০২২ সালের এপ্রিলে জাইকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জাইকার অর্থায়নকৃত ৩৩ প্রকল্পের বাজেট বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্যতম।

ওদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে কয়লা এবং এলএনজির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এ জাতীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। ফলে সামনে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়বে।

দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাপানকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, উন্নত রাষ্ট্রগুলোর জোট জি৭-এর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার কয়লা খাতে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে জাপান।
সুত্র : সমকাল