হারিছ চৌধুরী আত্মগোপনকালিন ৩ বছর ছিলেন কোথায়?

হারিছ চৌধুরী আত্মগোপনকালিন ৩ বছর ছিলেন কোথায়?

মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

পর্দা ফাঁস হয়েও হলো না। জানা গেল না হারিছ চৌধুরীর আসল পরিচয়। অজানা রয়ে গেল কিভাবে ১৪ বছর ভয় আর আতঙ্কের সঙ্গী ছিলেন তিনি। যদিও এখন তার আত্মগোপনের গল্প সবার মুখে মুখে। অনেকটাই প্রকাশিত হয়ে গেছে কিভাবে তিনি ১১ বছর আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু বাকি তিন বছর তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন তা নিয়ে এখনো রয়েছে নানা রহস্য।

প্রথম অনুসন্ধানে আমরা জেনেছিলাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী নাম বদল করে মাহমুদুর রহমান পরিচয়ে ঢাকার পান্থপথে বহাল তবিয়তেই ছিলেন। এলাকার সবাই জানতো তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। যে কারণে কারো কোন সন্দেহ হয়নি।

চেহারায়ও এসেছিল অস্বাভাবিক পরিবর্তন। হারিছকে নিয়ে কৌতূহল থাকলেও মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে ছিল না। যে কারণে গোয়েন্দাদের নজর ছিল না ঢাকার পান্থপথের দিকে। পুলিশ বক্স থেকে সামান্য দূরে একটি এপার্টমেন্ট বাড়িতে হারিছ একটানা এগারো বছর কাটিয়েছেন। মাহমুদুর রহমান নামে পাসপোর্ট করেছেন। ফিঙ্গার প্রিন্টের জন্য অফিসেও গিয়েছেন। ওমরায় যাওয়ার জন্য ভিসা নিয়েছেন। কিন্তু যাননি। জাতীয় পরিচয়পত্রও পেয়েছেন খুব সহজেই। গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকার বাইরেও গেছেন কয়েকবার। কিন্তু কোথায় তা জানা সম্ভব হয়নি।

১১ বছরের আত্মগোপনের কাহিনী রহস্যে ঠাসা। প্রশ্ন থাকাটা স্বাভাবিক বাকি প্রায় ৩ বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

অনুসন্ধানে জানা গেল ওয়ান ইলেভেনের পরপর তিনি সিলেটে বেশ কিছুদিন ছিলেন। এক রাজনৈতিক বন্ধুর বাসায়। এ সময় তিনবার বাসা বদল করেন। লুঙ্গি পড়ে চলাফেরা করতেন। মাথায় থাকতো সাধারণ টুপি। জানাজানি হয়ে যাবে এই ভয়ে হারিছ চৌধুরী ঢাকায় আসেন। তখন তার মুখে লম্বা সাদা দাড়ি। চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।

সূত্র বলছে, ঢাকায় এসে ওঠেন এক বন্ধুর বাসায়। বন্ধুটি বিদেশে থাকেন। অনেক পুরনো বন্ধু, তাই তাকে ঠাঁই দেন। বলা হচ্ছে ঢাকার গেন্ডারিয়ার একটি বাড়িতে ছিলেন। সেখান থেকে পান্থপথে আসেন এক ডাক্তার বন্ধুর সহযোগিতায়। মাহমুদুর রহমান নামে বাড়ি ভাড়া করেন ওই ডাক্তার ভদ্রলোক। এপার্টমেন্টের মালিকের কোন সন্দেহ হয়নি। কোন কৌতূহলও ছিল না। একা থাকতেন। সঙ্গে দু’জন কাজের মানুষ। মসজিদে নামাজ পড়তেন নিয়মিত। মাঝে মধ্যে নামাজও পড়াতেন। এপার্টমেন্টের সবাই প্রফেসর সাহেব হিসেবেই চিনতেন। বাড়ি ভাড়াও দিতেন সময়মতো। কখনো বিলম্ব হয়নি। কারা টাকা দিয়ে যেতো এটাও ছিল অজানা। তার ব্যাংক একাউন্টও ছিল জব্দ।

ওষুধ কিনতে নিজেই ফার্মেসিতে যেতেন। বাজার সওদা করতেও কোন লুকোচুরির আশ্রয় নিতেন না। মাঝে মধ্যে হাঁটতে বের হতেন। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। কেউ আসতো না তার বাসায়। দু’জন নিকট আত্মীয় ভিন্ন পরিচয়ে মাঝে মধ্যে আসতেন। বলাবলি আছে- এরাই নাকি টাকা পয়সা যোগান দিতেন।

একজন কাজের বুয়া, একটি কাজের ছেলে তার দেখাশোনা করতো সারাক্ষণ। বই পড়ে, খবরের কাগজ পড়ে সময় কাটাতেন হারিছ। রাজনীতি নিয়ে কারো সঙ্গে কোন কথা বলতেন না। কোন আড্ডায় বসলে চুপচাপ থাকতেন। তর্কে জড়াতেন না। তাকে নিয়ে মিডিয়ার খবর দেখে নিশ্চুপ থাকতেন। বোঝার উপায় ছিল না তিনিই হারিছ। তিনিই আইনের চোখে পলাতক এক আসামি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন এপার্টমেন্টবাসী কথায় কথায় বলেন, কতবার তার সঙ্গে বসে কথা বলেছি। নানা বিষয়ে মতবিনিময় করেছি। কিন্তু একবারও বুঝতে পারিনি তিনিই যে হারিছ চৌধুরী। মাহমুদুর রহমান হিসেবেই তাকে জেনেছি। সখ্যতাও গড়ে ওঠেছিল। নানা রোগে পেয়ে বসেছিল তাকে। ডাক্তারের পরামর্শ নিতেন। কিন্তু সরাসরি হাসপাতালে যেতেন না। বছর চারেক আগে গ্রীনরোডের কোন একটি হাসপাতালে গিয়েছিলেন স্বল্প সময়ের জন্য। পরিবার থেকে এই তথ্যের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি।

দলের কেউ না জানলেও জানতেন বেগম খালেদা জিয়া। হারিছ চৌধুরী নিজেই দলীয় একটি সূত্র মারফত খালেদা জিয়ার কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন চিন্তা না করতে। তিনি নিরাপদ আছেন। ভাল আছেন। তবে ঢাকায় কোথায় আছেন তা তিনি জানাননি। হয়তো কৌশলগত কারণে।

অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে তাতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল হারিছের। আইনী পরামর্শও নিতেন। একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর আত্মগোপন নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। মওদুদ আহমদ এতে সায় দেননি। বলেন, এতে কোন লাভ হবে না। জেলে থাকতে হবে। আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। এমনকি রাজসাক্ষী করার জন্যও বাধ্য করতে পারে। তাই এই ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না।

বিলেত প্রবাসী ব্যারিস্টার কন্যা সামিরা চৌধুরীর সঙ্গে তেমন যোগাযোগ হতো না। বিশেষ ব্যবস্থায় কয়েকবার কথা হয়েছে। অসুস্থ স্ত্রীর সঙ্গেও কথা হতো কম। মোবাইলে কোন সিম ব্যবহার করতেন না। তবে জুরিখ প্রবাসী ছেলের সঙ্গে ঘনঘন যোগাযোগ ছিল। পাসপোর্ট করার পর কেউ কেউ তাকে লন্ডনে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আইনী পরামর্শে এই সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে তিনি বিরত থাকেন। তখন তাকে জানানো হয় বিলেতে কিভাবে থাকবেন? সেখানে তো পরিচয় বলতে হবে। মাহমুদুর রহমান বললে তো রাজনৈতিক আশ্রয় হবে না। এরপর তিনি দেশে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

কেউ কেউ জানতেন হারিছ ভারতের আসামে চলে গেছেন। তার নানার বাড়ি আসামে। অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি আসামে যাওয়ার কোন চিন্তা করেননি। কারণ ভারতীয় পুলিশ বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে বার কয়েক হানা দিয়েছিল। এ খবর জানতেন হারিছ। শেষ দিন পর্যন্ত ঢাকার পান্থপথেই ছিলেন। এখান থেকে পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়েছেন। ঠিকানা হিসেবে শ্রীমঙ্গল কেন বেছে নিলেন এ নিয়েও অপার রহস্য। নিশ্চয়ই এমন কেউ ছিল যে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে ঠিকানা ব্যবহার করতে দিয়েছে।

ব্যারিস্টার সামিরা চৌধুরী তার বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন এক সাক্ষাতকারে। এর আগে ‘মানবজমিন’ জানতে পারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হারিছ চৌধুরী ঢাকায় মারা গেছেন। সামিরা জানান, মাহমুদুর রহমান নামে যে ভদ্রলোক মারা গেছেন তিনিই তার বাবা হারিছ চৌধুরী। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। এমনকি ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে মাহমুদুর রহমান নামে যে ভদ্রলোক মারা যান তা নিয়েও কোন মন্তব্য করতে চায়নি।

মানবজমিন যখন সামিরা চৌধুরীর কাছে জানতে চায় কিভাবে তার বাবা মারা গেলেন? তখন তিনি বলেন, করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসাও তেমন হয়নি। সুযোগও তেমন ছিল না। গ্রীনরোডের যে হাসপাতালে প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে তার ভাল চিকিৎসা হয়নি। এরপর যখন তাকে এভারকেয়ারে নেয়া হয় তখন করোনা তাকে কাবু করে ফেলেছে। চিকিৎসকরা তখন বলেছিলেন আগে নিয়ে আসা হলে হয়তো বাঁচানো যেতো।

নাম গোপন রেখে একজন চিকিৎসক বলেন, আমরা শেষ দিন পর্যন্ত টের পাইনি উনিই একাধিক মামলার হাইপ্রোফাইল রাজনীতিক। তার মেয়ের আচরণ থেকেও আমরা বুঝতে পারিনি। মারা যাওয়ার পরও কেউ এসে বলেনি বা শুনিনি মৃত মাহমুদুর রহমানই হারিছ চৌধুরী। মারা যাওয়ার খবর শুনে সামিরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। কিন্তু একবারও উচ্চারণ করেননি তার বাবার আসল পরিচয়।

হারিছ যেমন ১৪ বছর নাম পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। তার মেয়েও একই নজির স্থাপন করেন। যে কারণে রহস্য থেকেই গেছে। আমি যখন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগযোগ করি তখন তারা মাহমুদুর রহমান মারা গেছেন তাও বলতে চাননি। আমার একজন সহকর্মী চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ছিল কি জানতে চান তা উল্লেখ করে মেইল করুন। তাই করেছিলাম। জবাব আসেনি। তারা কি জেনে গিয়েছিলেন। কোনভাবে মাহমুদুর রহমানের পরিচয়। পুলিশের ভয়ে তা প্রকাশ করেননি বা করতে চাননি। তাদের বক্তব্য, আমাদের নীতি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির পরিচয় তার আত্মীয় স্বজন ছাড়া কাউকে বলা নিষেধ।

আমার কাছে মনে হয়েছে তারা সত্য গোপন করেছিলেন। কারণ যে ভদ্রলোক মারা গেছেন তার পরিচয় প্রকাশ করতে আপত্তি কোথায়? এমন তো নয় ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, কোন ঝামেলায় তারা জড়াতে চান না বলেই নাম প্রকাশ না করার ব্যাপারে অনড় ছিলেন।

সামিরাকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি তার বাবাকে কিভাবে পেলেন? কোথায় পেলেন? তার জবাব, এভারকেয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে গিয়ে দেখি বাবা কাতরাচ্ছেন। কখনো চোখ মেলে তাকান। তবে কথা বলার মতো অবস্থা নয়। শেষ দিন পর্যন্ত একইভাবে ছিলেন। এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে তিনি যখন বিদায় নেন তখনকার অবস্থা বলতে পারবো না। একদিকে ভয় অন্যদিকে আমার সামনে বাবার লাশ। আত্মীয় স্বজনও তেমন নেই। কিভাবে সামাল দেবো? প্রতি মুহূর্তে মনে হতো কেউ যদি এসে বাবার লাশটা নিয়ে যায়?

সামিরা জানান- এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে তিনি নিজে লাশ গ্রহণ করেছেন। নিজে গোসলের ব্যবস্থা করেছেন। প্রথমে বলতে চাননি কোথায় দাফন করা হয়েছে।

১৫ জানুয়ারি মানবজমিন হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, হারিছ লন্ডনে নয়, ঢাকায় মারা গেছেন। হারিছ চৌধুরীর চাচাতো ভাই আশিক চৌধুরী এর আগে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন তিনি লন্ডনে মারা গেছেন। এ নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলের মাঝখানে সামিরা দাবি করেন লন্ডনে মারা যাওয়ার খবর মিথ্যা। তার বাবা ঢাকায় ছিলেন এবং ঢাকাতেই না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

এরপর থেকে মানবজমিন অনুসন্ধান চালাতে থাকে। ৬ মার্চ মানবজমিন খবর দেয় হারিছ নয়, মাহমুদুর রহমান মারা গেছেন। এরপর এ নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয় দেশে বিদেশে। মিডিয়ার শিরোনাম হন হারিছ। প্রশাসনও নড়েচড়ে বসে।

আত্মগোপনের ইতিহাসে এটা এক বিরল ঘটনা। রহস্য উপন্যাসকেও হার মানায়। কিভাবে হারিছ নিজেকে এভাবে গুটিয়ে রাখলেন তা ইতিহাস হয়ে থাকবে। যদিও প্রশাসন এখনো ফাইলটা ওপেন রেখে চলেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হারিছকে প্রথমে গ্রীনরোডের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার পর তাকে নেয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। এই পর্যায়ে হারিছ চৌধুরীর কন্যা ঢাকায় চলে আসেন। নিজেই দেখাশোনা করতে থাকেন। নিজে জানার পরও বাবার পরিচয় গোপন রাখেন। তার ভয় ছিল জানাজানি হয়ে গেলে হয়তো লাশটাই পাবেন না।

বৃটিশ সরকারের অতিলোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে সামিরার দেশে আসা নিয়ে পরিবারের মধ্যেই দ্বিমত ছিল। কিন্তু বাবার ব্যাপারে কোন আপোষ করতে চাননি সামিরা। অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় আসেন। তার বয়ানে জানা গেল হারিছের আত্মীয়স্বজনরা লাশ সিলেটে নিতে কোন আগ্রহ দেখাননি। বারবার অনুরোধ করার পর তারা ঝুঁকির কথাই বলেছেন। এ নিয়ে দুঃখবোধ রয়েছে সামিরার। তার কথা, যে মানুষটি মারা গেছেন তাকে নিয়ে এত ভয় কেন? কি এমন হতো দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হলে।

বেশি বিরোধিতা করেছেন আশিক চৌধুরী। কি সে কারণ? সম্পত্তির লোভ নাকি গ্রেপ্তারের ভয়। এই প্রশ্নের এখনো সুরাহা হয়নি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত অন্য আত্মীয়দের পরামর্শে সামিরা তার বাবাকে সাভারে নিয়ে যান। প্রায় তিন মাস সেটা গোপন রাখেন। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলতে যাই তখনো সরাসরি বলতে রাজি হননি। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, এটা ঠিক সাভারের একটি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তার দাফন হয়েছে। মাদ্রাসার নাম গোপন রাখতে চান।

মানবজমিন সেখানেও খোঁজখবর নিতে থাকে। জানা যায়, সাভার জালালাবাদ এলাকার একটি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন সম্পন্ন হয়। এজন্য সামিরাকে মাদ্রাসার তহবিলে ৫ লাখ টাকা অনুদান দিতে হয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশিকুর রহমান কাসেমী এটা স্বীকার করেন। বলেন, তাদের কোন আত্মীয়স্বজন যেহেতু দেশে নেই সে কারণে আমরা দাফনে সম্মত হই। বলেন, সামিরা নামে একজন মহিলা মাহমুদুর রহমানের লাশ নিয়ে আসেন।

সামিরা বলেন, মস্তবড় ঝুঁকি ছিল। নিজ পিতৃভূমিতে দাফন যেখানে হলো না তখন দাফন কোথায় হবে? কেউ কেউ আজিমপুর গোরস্তানের কথা বলেছিলেন। কিন্তু সামিরা অনড়। তার কথা, আজিমপুরে পাঠালে তো কোন নাম পরিচয়ই থাকবে না। বেওয়ারিশ হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। তার একান্ত ইচ্ছা ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যের পরামর্শে শেষ পর্যন্ত সাভারের জালালাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। তাছাড়া প্রমাণের বিষয় রয়েছে। তাই তিনি নিজেই বলেন, আমি নিশ্চিত মাহমুদুর রহমানই আমার বাবা হারিছ চৌধুরী। ডিএনএ টেস্ট হলে প্রমাণিত হবে। আমরা সহযোগিতা করবো।

ইন্টারপোলও জানতে চায় মৃত মাহমুদুর রহমানই হারিছ চৌধুরী কিনা? কিন্তু সিআইডি কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তারা কখনো আদালতের নির্দেশের কথা বলছে। কখনো বলছে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা। আমার কাছেও তারা একাধিকবার ফোনে নানা তথ্য জানার চেষ্টা করেছে। লাশ তুলে ডিএনএ টেস্ট করলেই সবকিছুর সুরাহা হয়ে যায়। এটা জানার পরও তারা কেন কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না তা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

সামিরা ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন। বলেছেন, তার বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিতে ডিএনএ টেস্ট করা হলে তার কোন আপত্তি নেই।

কেন সিআইডি লাশ তুলছে না এ নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন হয়তো তাদের ব্যর্থতা প্রমাণ হয়ে যাবে এই আশঙ্কা থেকে সময় নিচ্ছে। যদিও সিআইডি’র একটি সূত্রের দাবি বিষয়টি যেহেতু আদালতে রয়েছে সে জন্য আদালতের নির্দেশ ছাড়া লাশ তোলা যাবে না।

ইন্টারপোল বলছে- তারা রেড নোটিশ তখনই প্রত্যাহার করবে যখন তাদের কাছে মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ আসবে। এখন বল সিআইডির কোর্টে। সিআইডি যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় তাহলেই বিষয়টি খোলাসা হয়ে যাবে। জানা যাবে মৃত মাহমুদুর রহমানই হারিছ চৌধুরী।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন বিএনপি’র এই শীর্ষ নেতা। এই মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সনে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।

হারিছ চৌধুরী রাজনীতিতে বরাবরই ছিলেন আলোচিত। ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে ডাবল এম.এ করার পর কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছিলেন অধ্যাপনায় যোগ দিতে। কিন্তু হারিছের মগজে তখন রাজনীতি ঢুকে গেছে। তাই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই বেছে নেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পেয়ে যান। তখন অন্তত তিনজন প্রার্থী ছিলেন। হারিছ চৌধুরী বলতেন, ভাগ্য কখন কার দরজায় এসে কড়া নাড়বে তা কেউ বলতে পারে না।

(মানবজমিন ঈদসংখ্যা ম্যাগাজিন থেকে নেয়া)