সাইবার ক্রাইম

‘প্রেমিকা’ই যখন অপহরণকারি, তার বাবা চক্রের প্রধান!

‘প্রেমিকা’ই যখন অপহরণকারি, তার বাবা চক্রের প্রধান!

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

সোনিয়া মেহেরের সঙ্গে রাকিবের পরিচয় হয়েছিল একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে। দু’জনের মধ্যে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান হয়। তারপর শুরু হয় নিয়মিত কথাবার্তা।

নিঃসঙ্গ রাকিব তার নিঃসঙ্গতা কাটাতে দিন-রাতের বেশির ভাগ সময় সোনিয়ার সঙ্গে কথা বলতেন ও মেসেজ আদান-প্রদান করতেন। খুব বেশিদিন লাগেনি দু’জনের সখ্যতা বাড়তে। ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগটি সোনিয়া নিজেই করে দিয়েছিলেন রাকিবকে। ভার্চ্যুয়ালি দু’জন দু’জনের অনেক আপন হয়ে যান। স্বাভাবিক কথাবার্তার বাইরে দ্রুতই তারা অন্তরঙ্গ ও একান্ত বিষয় শেয়ার করতেন।

বলতে গেলে অল্প দিনেই তারা গভীর সম্পর্কে পৌঁছে যান। কিছুদিন যেতে না যেতে রাকিব তার প্রেমিকাকে প্রস্তাব দেন সরাসরি সাক্ষাতের। কারণ গভীর সম্পর্কে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলে মন ভরছিল না।

সোনিয়া প্রথমদিকে কিছুটা নারাজি থাকলেও পরে আগ্রহ প্রকাশ করেন। দেখা করার জন্য দিনক্ষণও ঠিক হয়। স্থান নির্বাচন করেন সোনিয়া নিজেই। কাঙ্ক্ষিত সেই দিনে ওই স্থানে গিয়ে হাজির হন রাকিব। ভেবেছিলেন সোনিয়ার সঙ্গে দিনভর একান্তে আড্ডা দিয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরবেন। কিন্তু রাকিবের ভাগ্যে আর সেটি হয়নি। ওইদিন অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। সোনিয়ার দেয়া স্থানে দেখা করতে গিয়ে রাকিব অপহরণকারীচক্রের হাতে পড়েন। অপহরণকারীরা তার চোখ মুখ বেঁধে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় একটি অজানা ফ্ল্যাটে।

রাকিব তখনও বুঝতে পারেননি তার সঙ্গে কি হতে যাচ্ছে। তিনি সেটা কল্পনাও করেননি।

ফ্ল্যাটে নেয়ার পর তার চোখ মুখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। চোখ খুলে দেখেন আরও কয়েকজন নারী পুরুষের সঙ্গে তার প্রেমিকা সোনিয়া মেহেরও দাঁড়িয়ে আছেন। রাকিব কিছু বুঝে ওঠার আগেই ৫/৬ জন ব্যক্তি রাকিবের ওপর শারীরিক নির্যাতন করতে শুরু করেন। ঘণ্টাখানেক মারধরের একপর্যায়ে সেখানে থাকা নারীদের সঙ্গে রাকিবের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তোলা হয়। এরপর তার কাছে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা ৫০ লাখ টাকা দাবি করে।

কিন্তু এত টাকা কীভাবে দিবে রাকিব? সে বারবার প্রেমিকা সোনিয়ার কাছে কাকুতি মিনতি করছিল। সোনিয়া তাতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেননি।

চক্রের সদস্যরা রাকিবকে একটু পরপর মারধর করছিল। প্রাণে মেরে ফেলার ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। উপায়ন্তর না পেয়ে রাকিব তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের ২ লাখ টাকা দেয়। যদিও দুই লাখ টাকা পেয়ে মন ভরছিল না তাদের। আরও টাকা দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল। রাকিবের পক্ষে আর টাকা দেয়া সম্ভব ছিল না।

পরে অপহরণকারীরা তার সঙ্গে তোলা বিভিন্ন নারীদের আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও রেখে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। ছাড়ার সময় তারা হুমকি দিয়ে বলে পরে আরও টাকা পাঠাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্য কাউকে বিষয়টি জানালে আপত্তিকর ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দিবে। এতে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে তার মানহানি হবে।

অপহরণকারীদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে রাকিব চলে আসেন তার বাসায়। কিছুদিন পর ওই চক্রের সদস্যরা তার মোবাইলে ফোন দিয়ে টাকা চায়। টাকা না দিলে ছবি ও ভিডিও ভাইরাল করে দেয়ার হুমকি দেয়। এছাড়া সেগুলো রাকিবের আত্মীয়-স্বজনের কাছে পাঠাবে বলে জানায়।

রাকিব তখন উপায়ন্তর না পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যান। ঘটনার বিবরণ দিয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা করেন। পরে ওই মামলার ভিত্তিতে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম অভিযান চালিয়ে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো সোনিয়া মেহের (১৮), তার বাবা আব্দুল জলিল হাওলাদার (৫৬) ও মো. ইউসুফ মোল্লা (৪৩)।

ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টসূত্র মতে, শুধু রাকিবের ক্ষেত্রে যে এমনটা হচ্ছে তা নয়। ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার, টানটান, মামবা ব্যবহার করে অনেক নারী পুরুষই এখন প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন। এসব অ্যাপ ঘিরে ফাঁদ পেতে রেখেছে অপহরণকারী ও প্রতারক চক্র। এসব চক্রের সদস্যরা বিভিন্নভাবে মানুষকে ফাঁদে ফেলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রত্যাশিত টাকা আদায় করতে না পারলে হত্যা করে লাশ গুম করে দেয়।

ডিবি বলছে, এ ধরনের অনেক চক্র ডেটিং অ্যাপ দিয়ে প্রতারণা করছে।

ডিবি জানায়, এই চক্রে অন্তত ১০ জন সদস্য রয়েছে। যাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কাজ ছিল। বিশেষ করে চক্রের নারী সদস্যরা কলগার্লের কাজ করে। এদের মধ্যে সোনিয়াও অন্যতম। তিনি ডেটিং অ্যাপে ছেলেদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সখ্যতা গড়ে তুলতেন। নিজে থেকেই তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতেন। ছেলেদের দুর্বল করার সব পন্থা অবলম্বন করতেন। অন্তরঙ্গ কথা বলে আকর্ষণ বাড়াতেন।

তার বাবা আব্দুল জলিল হাওলাদার ও ইউসুফ মোল্লা পেশাদার অপহরণকারী। আব্দুল জলিল হাওলাদার মেয়েকে দিয়ে ডেটিং অ্যাপ ও অন্যান্য মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলাতেন। প্রেমিকদের অপহরণ করে তার ভাড়া করা ফ্ল্যাটে নিয়ে আসতেন। আর গ্রেপ্তার অন্য সদস্য ইউসুফ মোল্লা অপহরণ করার পর ওই প্রেমিকদের চক্রের নারী সদস্যদের দিয়ে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও তুলতেন। এছাড়া অন্য সদস্যরা ভুক্তভোগীদের মারধর করতেন। টাকার ব্যবস্থা করার চাপ দিতেন। ভয়ভীতি দেখাতেন।

অপহরণ করে ছেলেদের নির্যাতন করে যে টাকা আসতো তার বড় অংশই আব্দুল জলিল হাওলাদার ও তার মেয়ে সোনিয়া নিয়ে যেতেন। বাকি টাকা দিয়ে অপহরণ করে ভুক্তভোগীদের রাখার জন্য ফ্ল্যাট ভাড়া, গাড়ি ভাড়া খরচ ও চক্রের অন্য সদস্যদের ভাগ করে দিতেন।

ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ফাইন্যান্সসিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে বিভিন্ন বয়সী ছেলেদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে অপহরণ করে এ রকম একটি চক্রকে আমরা গ্রেপ্তার করেছিলাম। তাই অনলাইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
সুত্র : মানবজমিন