পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’!

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’!

বিশ্ব ডেস্ক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

একজন রাজনৈতিক নেতা যখন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলেন তখন তাতে খুব একটা অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল যে- পাকিস্তানের সিংহভাগ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের দাবিতে বিশ্বাস করে আসছে এবং তাদের বিশ্বাস মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

ঐতিহাসিক ভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সরকারকে পছন্দ করেছে, সেটি হল দেশের নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বার্থের জন্য একটি সামরিক শাসন। যেহেতু এই ধরনের সরকারের জীবনকাল শুরু এবং শেষ হয়েছে মার্কিন সংযোগের সাথে, তাই যুক্তি দেয়া হয় ওয়াশিংটন অবশ্যই এই সরকারকে ক্ষমতায় এনেছে এবং যখন প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাদের অপসারণ করেছে। বাস্তবতা হল যে- পাকিস্তানে রাজনৈতিক গতিশীলতা প্রায় সবসময়ই স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করে, তাই সরকারের উত্থান ও পতনের উদ্দীপনা সবটাই অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক নয়।

আফগান জিহাদ এবং মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কের পুনরুজ্জীবনের আগে পাকিস্তানে ছিল জিয়াউল হকের শাসনকাল। ১৯৭৭ সালের অভ্যুত্থানের সময় একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড এবং পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতি নিবিড় ঝোঁক দেখেছিল পাকিস্তানের মানুষ। জিয়ার আমলেই ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের ফলে জিয়া পশ্চিমে একজন জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠেন। যদিও তার মৃত্যুর আগে তার প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন নড়বড়ে হতে শুরু করেছিল।

এর আগে পাক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চীনের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করে দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকান স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনসনের পক্ষে চলে যান। কিন্তু তিনি আরও চার বছর দেশ শাসন করেছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে উপেক্ষা করা হয়েছিল যতক্ষণ না তিনি মার্কিন-চীন সম্পর্ক স্থাপনে সাহায্য করেন। জেনারেল মোশারফকে ৯/১১ পর্যন্ত দুই বছর বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তি তার বাইরেও অব্যাহত ছিল।

এটা মনে হতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ‘অভ্যুত্থান’ এর ভাবনা পরিত্যাগ করেছে। নিঃসন্দেহে, আমেরিকা এখনও অন্যান্য দেশে প্রভাব অর্জন এবং বজায় রাখার জন্য কাজ করে বিশেষ করে যেখানে এর গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে আমেরিকা গোপনে কোনো সরকার তৈরি বা ভাঙার কাজ করেছে তা সত্যিই বিতর্কিত বিষয়। পরিবর্তে তারা কখনো অস্ত্র দিয়ে, কখনো গণআন্দোলনকে সমর্থন করে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

দেশের নীতিগুলি পরিচালনা করার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো পাকিস্তানকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। কখনো কূটনৈতিক পথে, কখনো আবার ওয়াশিংটন থেকে কড়া ভাষায় বার্তা আসে পাকিস্তানের কাছে। আসলে শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের অভিজাত, সেনা-নেতৃত্বাধীন এবং আধিপত্যবাদী ‘সংগঠন’ এর ধারণা দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তার বাহ্যিক স্তম্ভ হিসাবে ধরে রেখেছে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করেছে এবং অগ্রগতির জন্য সহায়তা করেছে। কিন্তু এটাই ছিল শেষবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পাকিস্তানকে সাহায্য করা। এরপর যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানের সম্পর্ক আগের মতো হয়নি।

দুর্বল নীতি এবং স্থানীয় সংকটের কারণে পাকিস্তান আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মতো বহিরাগত অর্থদাতাদের উপর অত্যধিক নির্ভরশীল, যারা বিষয়টিকে তাদের নিজস্ব কৌশলগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন হয়তো আর বাহ্যিক স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে না ঠিকই, তবে পাকিস্তানের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার হওয়ার দরুন দেশকে ক্রমাগত একটা হুমকির মুখে রাখার প্রবণতা জারি রেখেছে।

মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্ক কেবল আমেরিকার প্রয়োজনে পরিচালিত হয় না। এটি পাকিস্তানের চাহিদা দ্বারাও সমানভাবে পরিচালিত। পাকিস্তানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রয়োজনীয়তা কেবলমাত্র শাসন পরিবর্তনের কঠোর পদক্ষেপের জন্য যথেষ্ট নয়, আসলে এস্টাবলিশমেন্টের স্বার্থই পাকিস্তানে প্রাধান্য পায়। আর তাই ওয়াশিংটনের সাথে একটি নরম সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে পাকিস্তান, যেখানে উভয়দেশের স্বার্থই জড়িত আছে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকারকে উৎখাতের প্রয়োজন নেই।

পাকিস্তানি অভিজাতরা হয়তো পাকিস্তানের জনগণকে হতাশ করেছে, কিন্তু নিজেদের নয়। কয়েক দশক ধরে, তারা ক্ষমতার জন্য লড়াই করেছে দক্ষতার সাথে এবং সেই ব্যবস্থাই তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। পাকিস্তানের সাংগঠনিক ধারণা, যার উপর তারা সভাপতিত্ব করে এসেছে তা তাদের মালিকানাধীন এবং শুধুমাত্র তাদের দ্বারাই পরিচালিত। কোনো বিদেশি শক্তি দ্বারা নয়।

সূত্র: www.dawn.com
লেখক: তৌকির হোসেন, একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক এবং সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো।