ভাসানচরের পথেই আছে রোহিঙ্গাবাহী জাহাজ

ভাসানচরের পথেই আছে রোহিঙ্গাবাহী জাহাজ

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

আরো এক হাজার ৮০৪ জন রোহিঙ্গা নিয়ে নোয়াখালীর ভাসানচরের পথে রওনা দিয়েছে নৌবাহিনীর জাহাজ। মঙ্গলবার (২৯ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নৌবাহিনীর জেটি থেকে প্রথম জাহাজটি ছেড়ে যায়। এরপর ধাপে ধাপে আরো ৪টি জাহাজ ভাসানচরের পথে ছেড়ে যায়।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের শরণার্থী শিবির থেকে আসা রোহিঙ্গারা দ্বিতীয় দফায় স্বেচ্ছায় ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন।

সোমবার (২৮ ডিসেম্বর) ২৩টি বাসে করে তাদের চট্টগ্রাম নেয়া হয়। আর আজ সেখান থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে করে তাদের ভাসানচরে নেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পের ৪২৭টি রোহিঙ্গা পরিবার থেকে এক ৮০৪ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়েছেন। এর আগে প্রথম ধাপে এক হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে প্রথম ধাপের চেয়ে ১৬২ জন বেশি রোহিঙ্গা ভাসানচরে উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।’

সমাজ কল্যাণ ও উন্নয়ন সংস্থার (স্কাস) চেয়ারম্যান জেসমিন প্রেমা রয়েছেন সেখানে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি এক হাজার ৮০৪ জন রোহিঙ্গা অতি উৎসাহ নিয়ে ভাসানচরে যাচ্ছেন। রোহিঙ্গা ও তাদের বাচ্চাদের মুখে হাসির ঝলক দেখা যাচ্ছে।’

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, ভাসানচরের সুযোগ সুবিধা নিয়ে প্রথম যাত্রায় রোহিঙ্গাদের অনেক বোঝাতে হয়েছিল। কিন্তু এবার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে এবার নিজেরাই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। গত ৪ ডিসেম্বর যাদের আত্মীয়-স্বজন ভাসানচরে গেছেন তাদের কাছে সুযোগ-সুবিধার খবর শুনে অনেকেই সেখানে যেতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন।

জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফের তালিকাভুক্ত (রেজিস্টার) ক্যাম্প ছাড়া বাকি সব ক্যাম্প থেকেই এবার রোহিঙ্গারা ভাসানচর যাচ্ছেন। উখিয়ার কুতুপালং-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৮ ডব্লিউ ক্যাম্প থেকেও যাচ্ছে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার। উখিয়ার কুতুপালং-৪ নম্বর ক্যাম্প থেকে ২৭ ও কুতুপালং-২ ডব্লিউ থেকে ২৪টি পরিবার ভাসানচরে যাচ্ছে।

ভাসানচরের পথেই আছে রোহিঙ্গাবাহী জাহাজ

নোয়াখালীর হাতিয়ায় সাগরের মাঝে ভেসে থাকা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের জন্য সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ঝড় জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে। বসবাসের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে তা দেখতে গত সেপ্টেম্বরে দুই নারীসহ ৪০ রোহিঙ্গা নেতাকে সেখানে নিয়ে যায় সরকার। তারা ভাসানচরের আবাসন ব্যবস্থা দেখে মুগ্ধ হন। তারা ক্যাম্পে ফিরে অন্যদের ভাসানচরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। দুবছর আগে সরকার ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তাদের অনিচ্ছার কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে এর যাত্রা শুরু হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফের সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করছেন।

এর আগে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিরুদ্ধে কক্সবাজারে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) বিরোধিতা করেছে বলে অভিযোগ উঠলেও এখন সেখানে কাজ শুরু করেছে তারা। এর মধ্যে ২২টি এনজিও নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরে গেছে। এর আগে একাধিকবার তারা সেখানে পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের জীবন যাপনের জন্য সরকারের সুপরিকল্পিত আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, উন্নত মানের একটি আবাসিক এলাকায় যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে, তার সবই সেখানে রয়েছে।

ভাসানরে মূলত তাদের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা দেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকতে পারবেন। প্রকল্পটিতে যাতে এক লাখ এক হাজার ৩৬০ জন শরণার্থী বসবাস করতে পারেন সেই ব্যবস্থার আলোকে গুচ্ছগ্রামসমূহ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি গৃহে প্রতি পরিবারের ৪ জন করে মোট ১৬টি পরিবার বসবাস করতে পারবে। এছাড়াও প্রতিটি ক্লাস্টারে জন্য দুর্যোগকালে আশ্রয় নেয়ার জন্য তৈরিকৃত শেল্টার স্টেশনে স্বাভাবিক সময়ে ২৩টি পরিবার বসবাস করতে পারবে। এই হিসাবে ক্লাস্টারের ১২টি হাউজে মোট ৭৬৮ জন এবং একটি শেল্টার স্টেশনে মোট ৯২ জনসহ সর্বমোট ৮৬০ জন সদস্য বসবাস করতে পারবেন। প্রতিটি হাউজের এক প্রান্তে বসবাসকারী পরিবারসমূহের নারী-পুরুষদের জন্য আলাদা গোসলখানা ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এব রান্নাঘরও রয়েছে।

১২০টি শেল্টারে দুর্যোগকালে প্রতিটিতে এক হাজার মানুষ এবং এর নিচতলায় ২০০ গবাদি পশু আশ্রয় নিতে পারবে। এই শেল্টার স্টেশনগুলো স্টিল ও কংক্রিটের কম্পোজিট স্ট্রাকচারে তৈরি, যা আনুমানিক ২৬০ কিলোমিটার বেগের ঘূর্ণিঝড় সহনীয়। রয়েছে বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা। এছাড়া তাদের জন্য আরও আবাসস্থল নির্মাণ করা হচ্ছে।

ধর্মীয় ইবাদত পালনের জন্য উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য ৩টি শেল্টার স্টেশনকে মডিফাই করা হয়েছে এবং এর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তের আলোকে কক্সবাজার ক্যাম্পের ন্যায় বর্ণিত শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখার উদ্দেশ্যে প্রকল্প এলাকায় বিদ্যমান দুটি চারতলা বিশিষ্ট শেল্টার স্টেশনকে মডিফাই করে নন-ফরমাল শিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা রাখা হয়েছে।

ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে ৩৬টি শেল্টারকে মোডিফাই করে দুটি ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল এবং চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ সংক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে।

ত্রাণ সামগ্রী (খাদ্য ও অন্যান্য আইটেম) সংরক্ষণের জন্য এক লাখ রোহিঙ্গার আনুমানিক তিন মাসের খাবার সংরক্ষণের লক্ষ্যে চারটি ওয়্যারহাউজ নির্মাণ করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘১৯৯৭ সালে দ্বীপের সবচেয়ে কাছাকাছি সাইক্লোন এসেছিল। এটি ৭০ কিলোমিটার দূরে ছিল। এছাড়া দ্বীপটিতে কোনো সাইক্লোন হয়নি। তবে পানি উঠেছিল।’

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে যাতে পানি না ওঠে এজন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ৯ ফুট উঁচু করে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি নির্মাণে ২০০ থেকে ২৫০ বুলডোজার কাজ করেছে।’