দ্বিতীয় দফায় ‘স্বেচ্ছায়’ ভাসানচর গেলেন এক হাজার ১৩৪ রোহিঙ্গা

নুরুল হক, টেকনাফ
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ শরণার্থী শিবির থেকে স্বেচ্ছায় দ্বিতীয় দফায় এক হাজার ১৩৪ জন রোহিঙ্গা ভাসানচরের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। এরা ২৩টি বাসে করে যাত্রা করেন।

সোমবার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুর পৌণে ১২টার দিকে উখিয়া ডিগ্রী কলেজ মাঠ থেকে ভাসানচরের উদ্দেশে রওনা দেন এসকল রোহিঙ্গারা।

ইতোপূর্বে তাদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে নিয়ে এসে উখিয়া ডিগ্রী কলেজ মাঠে অস্থায়ী পয়েন্টে কার্যক্রম শেষ করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বিকাল তিনটার দিকে বাসে করে এসকল রোহিঙ্গা যাত্রা করেন।

তারও আগে গত ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে স্থানান্তরের প্রথম ধাপে বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ ভাসানচরে ১ হাজার ৬৪২ জন রোহিঙ্গা হাসি মুখে পৌঁছেছিলেন। ভাসানচরে যেতে আগ্রহী ওই সকল রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে গাড়িতে এনে চট্টগ্রামের বিএফ শাহীন স্কুলের ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। এবারও সেভাবে নিয়ে যাওয়া হবে তাদের।

এ বিষয়ে জানতে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াতের সাথে যোগাযোগ করলেও তিনি কোন জবাব দেননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা নিয়ে ২৩টি বাস দ্বিতীয় দফায় ভাসানচরে যাত্রা করেছে। তবে সেখানে কতজন নারী পুরুষ রয়েছেন সেটি এখন বলা যাচ্ছে না।

একটি সূত্র জানায়, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৩টি বাসে করে ১ হাজার ১৩৪ জনের মতো রোহিঙ্গা রওয়ানা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের কর্মকর্তা (সিআইসি) নওশের ইবনে হালিম সাংবাদিকদের জানান, তার শিবির থেকে স্বেচ্ছায় একশ রোহিঙ্গা ভাসানচরের উদ্দেশে ক্যাম্প ত্যাগ করেছে। সকালে তারা ক্যাম্প থেকে উখিয়া রওনা দেন। এর আগে শিবির থেকে ২১ পরিবার ভাসানচরে পৌঁছেছিল।

সোমবার সকালে স্থানীয় সাংবাদিকরা সরেজমিনে টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা শরাণার্থী শিবিরে দেখেন, সকাল ৮টা থেকে ক্যাম্পে বাস আসলে সিআইসি কার্যালয়ের কাজ শেষে কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গাড়িতে তোলা হয়। এসময় তাদের স্বজনরা দেখতে ভীড় করেন।

এর আগে প্রথম দফায় ভাসানচরে তাদের স্বজনরাও পৌছেছিলেন। পরে বাসে করে উখিয়া ট্রানজিট পয়েন্ট ও কলেজের অস্থায়ী ট্রানজিট ঘাটে প্রক্রিয়া শেষ করে ভাসানচরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই ক্যাম্প থেকে ১০০ জন মানুষ ভাসানচরে উদ্দেশে ক্যাম্প ত্যাগ করেন।

পরিবার দিয়ে ভাসাচরে উদ্দেশে যাত্রাকালে টেকনাফ শামলাপুরের জাহেদ হোসাইন বলেন, ‘কেউ আমাদের জোর করেনি। স্ব ইচ্ছায় আমরা পুরো পরিবার ভাসানচরে চলে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘ভাসানচরে যারা আছে তারা ভাল আছেন বলে ফোনে জানিয়েছিল। তাই আমরা উন্নত জীবনের আশায় সেখানে যাত্রা করছি।’

শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের হেড মাঝি আবুল কালাম জানান, তার শিবির থেকে ২৫ পরিবারের ১০০ রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় ভাসানচরে উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। তাদের চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। মঙ্গলবার সকালে তারা ভাসানচর পৌছার কথা রয়েছে।

ভাসানচর থেকে মুঠোফোনে মো. ইসমাইল নামে রোহিঙ্গা কিশোর বলেন, ‘টেকনাফ শামলাপুর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পরিবারের সঙ্গে ভাসানচরে এসেছি। এখানে আমরা সবাই খুব ভাল আছি। এখানকার পরিবেশ ক্যাম্পের চেয়ে অনেক ভাল। এই ভাসানচরে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত নৌবাহিনীর সদস্যরা খুব ভাল ব্যবহার করেন। তাঁরা সব সময় সহায়তা করছে। ক্যাম্পে থেকে আমার এক বোন এখানে চলে আসার জন্য বারবার ফোন করছে।’

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। আগে আশ্রয় নেয়াসহ বর্তমানে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে ৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। সেখানে এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ভাসানচরের পুরো আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

এদিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আরও ২০ থেকে ২১টি বাস রোহিঙ্গা নিয়ে রওয়ানা করার অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।