এক মাসেই ৩ হাতির মৃত্যু

কক্সবাজারে হাতি হত্যা চলছেই, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

কক্সবাজারে হাতি হত্যা চলছেই, বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

বিশেষ প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারে একের পর এক মারা পড়ছে বন্যহাতি। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ বসতি, হাতি চলাচলের করিডোর বন্ধ করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া, ফসল রক্ষায় বিদ্যুৎ শক দেয়া, ইটভাটা, আবাসস্থল উজাড়কেই এ জন্য দায়ি করা হচ্ছে। খাবার সংকটের কারণে বন্যহাতি পাহাড় থেকে খাবারের খোঁজে লোকালয়ে এসেও মারা পড়ছে। চলতি ডিসেম্বর মাসেই এভাবে তিনটি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

হাতির মৃত্যুর মিছিল ক্রমাগত বাড়লেও থামানোর কোন উদ্যোগ নেই। সরকারি ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বন্যহাতির মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে বলেই মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

পরিবেশবাদীদের দাবি, সংরক্ষিত পাহাড়ি জনপদে বিচরণকারী হাতির সুরক্ষায় অভয়ারণ্য গড়ে তোলা না গেলে বন্যহাতিরা অস্থিত্ব সংকটে পড়বে।

সুত্র মতে, চলতি ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩টি বন্যহাতি মারা গেছে। এ নিয়ে বিগত দুই বছরে অন্তত ১৪টি এশিয়ান বন্যহাতির মৃত্যু হয়েছে।

এ নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বন উজাড় করে নিত্যনতুন ঘরবাড়ি. রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে হাতির আবাসস্থল উজাড়, চলাচলের করিডোরে চরমভাবে বাধাগ্রস্থ ও খাদ্য সংকটে পড়েছে হাতিরা। ফলে প্রায় সময় লোকালয়ে হানা দেয় বন্যহাতির দল। আর এই কারণে ফসল রক্ষায় কতিপয় ব্যক্তিরা বিদ্যুৎ শক ও গুলি ও খাবারে বিষ প্রয়োগ করে বন্যহাতি হত্যা করছে।

তারা বলেন, চোরা শিকারিরাও দাঁত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের লোভে বন্যহাতিকে হত্যা করে। অনেক সময় এলাকাবাসি ক্ষেতের ফসল রক্ষায় বৈদ্যুতিক ফাঁদ তৈরি করে। সেই বিদ্যুতের পাতা ফাঁদে পড়েও হাতির মৃত্যু ঘটছে। মনে হচ্ছে, মানুষ আর হাতি এক প্রকার দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েছে।

সুত্র জানায়, লোকালয়ে কিংবা বনে মারা যাওয়া হাতির মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে বন বিভাগ ও পুলিশ। থানায় একটি সাধারণ ডাইরি (জিডি) হয়। সরকারের প্রাণীসম্পদ বিভাগ ময়নাতদন্তের জন্য ফুসফুস, পাকস্থলীসহ কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে। পরে ‘খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মারা যেতে পারে’ এমন ধরণের গল্প তৈরি হয়। বুনো হাতির মৃত্যুর পরের কাহিনী প্রায় একই গল্পে তৈরি। ময়নতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

প্রাণী সম্পদ বিভাগ মতে, কক্সবাজার জেলায় বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য রয়েছে। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল বন্যহাতিসহ বিভিন্ন প্রাণীর নিরাপদ আবাস। কিন্তু গত ১০ বছরে এই আবাসস্থল ধ্বংসের অংশ হিসেবে গাছ কাটা, পাহাড় সাবাড় এবং সংরক্ষিত বন দখলে নিয়ে সেখানে স্থাপন করা হয়েছে অবৈধ ইটভাটা ও শত শত বাড়িঘর। ফলে বনের নিরাপদ আবাস হারিয়ে হাতির পাল ঘন ঘন নেমে পড়ছে লোকালয়ে।

সুত্র জানায়, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন-২০১২ অনুযায়ী, বুনো হাতি হত্যা করলে দুই থেকে সাত বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। আর হাতির আক্রমণে নিহত হলে সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বন বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে এক লাখ টাকা এবং আহত হলে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়া হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পেলেও বুনো হাতি হত্যার ঘটনায় সাজার কোনো তথ্য নেই।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, পাহাড়ে বনের জমি জবরদখল করে অবৈধ বসতি স্থাপন করার কারণে বন্যহাতির আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। এতে পাহাড় ও বন ধ্বংসের পাশাপাশি হাতিসহ বন্যপ্রাণীদের বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পথ নষ্ট হচ্ছে। জবরদখলকারিরা বিভিন্নভাবে প্রভাবশালিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়ায় তাদের উচ্ছেদও করা যাচ্ছে না। অবৈধ বসতি ও জবরদখলকারিদের উচ্ছেদ করা না গেলে এখানকার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কঠিন হবে।

কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বন্যহাতির চলাচলের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আগে ২৫-৩০টি হাতি একত্রে দল বেঁধে চলাফেরা করতো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, একটি-দুটি হাতি দলছুট হয়ে চলাফেরা করছে। এতে ঝুঁকি বাড়ছে।

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাসের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, কক্সবাজারে বিভিন্ন এলাকায় হাতিসহ বন্যপ্রাণী হত্যার বিষয়টি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন মানব সৃষ্ট কারণে এসব হাতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে অবিরত। ফলে তাদের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, বনভূমি থেকে জবর দখলকারিদের উচ্ছেদ করে দ্রুত বন সৃজন করা না গেলে বন্যপ্রাণী রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না।

ইয়াছিন নেওয়াজের মতে, আগের মতো হাতি দেশে নেই বললেই চলে। বর্তমানে যা-ও আছে তা অপ্রতুল। হাতির বংশ বিস্তার জরুরি। হাতি এখন মহাবিপন্ন। এই মুহুর্তে হাতি সংরক্ষণ করতে না পারলে দ্রুত সময়ে হাতি বিলুপ্তি হতে পারে। হাতি হত্যাকারিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নেয়াও জরুরি।

তিনি সংশ্লিষ্টদের নিজ দায়িত্ব থেকে হাতি হত্যা রোধ করতে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন।