রোহিঙ্গা: সিটিজেন, রিফিউজি, স্টেটলেস পিপল?

রোহিঙ্গা: সিটিজেন, রিফিউজি, স্টেটলেস পিপল?

ড. মাহফুজ পারভেজ
অনলাইন, কক্সবাজার ভিশন ডটকম

রোহিঙ্গারা স্বদেশে ‘সিটিজেন’ নয়। কোনো কোনো দেশের কাছে ‘রিফিউজি’ এবং কোনো কোনো দেশের কাছে ‘স্টেটলেস পিপল’। পরিচিতির ঘোরতর সঙ্কটে বিপন্ন ও ক্রম-ধ্বংসপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা।

নিজ দেশ মায়ানমারের এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় রোহিঙ্গারা তাদের পরিচিতির স্বচ্ছ স্বীকৃতি ও নাগরিকত্বের সুস্পষ্ট অধিকার থেকে বঞ্চিত। আন্তর্জাতিক আইনে ‘উদ্বাস্তু’ ও ‘বাস্তুহীন’/ ‘রাষ্ট্রহীন’ (রিফিউজি ও স্টেটলেস) প্রত্যয় দু’টির মধ্যে ধারণা ও সংজ্ঞাগত পার্থক্য বিদ্যমান। আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রহীন শরণার্থীদের সমস্যা, উদ্বাস্তু সমস্যার চেয়ে জটিলতর। ফলে পরিচিতির সঙ্কটে জর্জরিত রোহিঙ্গাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে সংজ্ঞা ও আইনের জটিল জট এবং তাদের সমস্যার সমাধান পথটিও আবর্তিত হচ্ছে জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে।

উদাহরণ স্বরূপ, নিকট-প্রতিবেশী আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মঞ্চ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে বিফল। আরেক শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতও অক্ষম উদ্বাস্তু নিরাপত্তা বা উদ্বাস্তু সুরক্ষা নীতি তৈরি করতে। যদিও ভারতের বিভিন্ন স্থানে কিছু রোহিঙ্গার বসবাস ও দুরবস্থার কথা জানা যায়, তথাপি শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের জন্য আইনি ব্যবস্থা ও নীতি থাকা সত্ত্বেও ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় প্রাপ্য সুবিধা দিতে নারাজ।

ভারত কেন রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করছে না, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

উদ্বাস্তু পরিচয়ের সঙ্গে কিছু ন্যূনতম অধিকার দাবি করা গেলেও শরণার্থী হিসেবে সেটুকু প্রাপ্যও রোহিঙ্গাদের দেওয়া হচ্ছেনা। দিল্লিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবাদ জমায়েতের মূল কারণ ছিল উদ্বাস্তু পরিচয় দাবি। ভারতে উদ্বাস্তুদের বেশির ভাগ জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশন-এর উদ্বাস্তু ও শরণার্থী নীতির আওতায় পড়েন। বাকিরা ভারত সরকারের উদ্বাস্তু নীতির মুখাপেক্ষী।
ভারত যেহেতু ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন-এর স্বাক্ষরকারী নয়, কাজেই ভারতের উদ্বাস্তু বা শরণার্থী আশ্রয় ও পুনর্বাসন নীতি নির্ভর করে শরণার্থীদের প্রতি ভারতের মনোভাবের উপর। যে কারণে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তাদের ধর্ম (ইসলাম) ভারতের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সাহায্য, সহযোগিতা বা মানবিকতা নয়, ভারতীয়দের মনে রোহিঙ্গাদের প্রতি গভীর সন্দেহ ও অসহযোগিতার প্রমাণ সুস্পষ্ট। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই সন্দেহ ও বিদ্বেষের প্রতিফলনের ছবি তুলে ধরা হয় প্রায়ই। এসব সন্দেহের সঙ্গে রাজনৈতিক-মতাদর্শিক দূরত্বের ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান কঠিন।

সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষকগণ অত্যন্ত দক্ষ ভাবে আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব, উদ্বাস্তু ও শরণার্থী আইন ও অধিকারের চিত্র তুলে ধরেছেন রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে। জানিয়েছেন, কী ভাবে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা বিদ্যমান আইনের ফাঁক গলে তলিয়ে যায় জাত ও ধর্মের বিদ্বেষের অন্ধকারে। বিষয়টি ভারতের রাজনীতি ও উদ্বাস্তু নীতির প্রেক্ষাপটে আরো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ফলে সাম্প্রতিক কালে, ভারতের নাগরিকত্ব আইনের প্রেক্ষাপটে, রোহিঙ্গাদের বিষয়টি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

বিশ্বায়নের একটি পরিণতি হিসেবে ১৯৯০-এর দশক থেকে গবেষকরা বিশ্বাস করেছিলেন এক দিকে রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা হ্রাস, অন্য দিকে শরণার্থী, উদ্বাস্তু, ও নারী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিহীন গোষ্ঠীগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধি হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা এই তত্ত্বকে অনেকাংশেই ভুল প্রমাণ করেছে। দেখিয়ে দিয়েছে আসলে রাষ্ট্রের হাতেই মানুষের পরিচয়, তথা জীবন বাঁধা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এমন ক্ষমতাশালী যে উদ্বাস্তু, শরণার্থী, বা নিরাপত্তা সমস্যা হলে রাষ্ট্রের মাধ্যমেই তা নিরসন হবে।

১৯৭৪-এর সংবিধানে, মায়ানমার সরকার আরাকানকে রাখাইন নামকরণের মাধ্যমে বৌদ্ধ পরিচয় চাপিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ ইসলামধর্মী আরাকানিদের পাকাপাকি বহিষ্কারের ব্যবস্থা তৈরি হয়। ১৯৮২-র নাগরিকত্ব আইন এই বহিষ্করণ নীতিতে সিলমোহর দিয়ে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে পুরোপুরি বর্জন করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত মায়ানমারের ইতিহাস বহন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হারানোর সাক্ষ্য। ২০১৭ থেকে মায়ানমার সেনা নতুন করে রোহিঙ্গা-দমন শুরু করে। তাঁদের কার্যত বাধ্য করে দেশান্তরী হতে। মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এক করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে ভিটেছাড়া করা হয় রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু নাগরিকদের।

প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেশন বা পরিযাণ মূলত ঘটে সমুদ্রপথে, যা স্থলপথে যাত্রার তুলনায় অনেক বেশি বিপদসঙ্কুল। ডিঙি নৌকায় বিপজ্জনক যাত্রা করে রোহিঙ্গারা কখনও পৌঁছন বাংলদেশ, কখনও বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়াতে। অনেক সময়েই এই যাত্রার পরিণাম নৌকাডুবি ও সলিলসমাধিতে মৃত্যু।

যাঁরা কোনও মতে অন্য রাষ্ট্রে পৌঁছতে পারেন, তাঁদের ঠাঁই জোটে শরণার্থী শিবিরে। কখনও বা শিবিরের বাইরে। অকল্পনীয় অমানবিক পরিকাঠামোর মধ্যে তাঁদের থাকতে বাধ্য করা হয়। রোহিঙ্গাদের ‘বোট পিপল’ হয়ে ওঠার কারণটি এবং সমুদ্রপাড়ির নানা বিপদের সম্মুখীন হওয়ার বাস্তবতা লুকিয়ে আছে রোহিঙ্গা নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ইতিহাসে।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নিপীড়ন-দমন তাদের ঘর ছাড়া, দেশ ছাড়া করেছে। যদিও বিভিন্ন কারণে দেশান্তরের ইতিহাস নতুন নয়। আইনি ও বেআইনি, দুই পথেই রোহিঙ্গারা বহু দিন ধরে পাড়ি দিচ্ছেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। হামেশা পাচারকারীর শিকার হয়েছেন। এতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই রক্তাক্ত ভূগোলে শরণার্থীদের যাত্রা ও মানুষ পাচারের আখ্যান একাকার হয়ে গিয়েছে।

বিশ্ব জুড়ে উদ্বাস্তু সমস্যার যে বিপুল বিস্ফোরণ, তার মূলে রয়েছে গুটিকতক ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের জাত এবং ধর্মের গোঁড়ামি। বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরা এই রাজনীতির শিকার। মুসলিম রোহিঙ্গারাও বাদ পড়েননি এহেন জাতিগত নিধন ও আগ্রাসনের কবল থেকে। এখনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বহু দেশ, বহু মানুষই রোহিঙ্গা ও তাঁদের সমস্যাটি নিয়ে গভীর ও যথাযথ ভাবে অবহিত হতে চান না এবং মায়ানমারে তাদের ন্যায্য নাগরিক মানবাধিকারের বিষয়টিকে নিষ্পন্ন ও প্রতিষ্ঠিত করতে স্বচ্ছ দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান সূত্র খুঁজে পেতে আগ্রহী হন না। মানবিক সাহায্য ও অধিকার প্রাপ্তির গোলকধাঁধা তৈরি করে স্বদেশের মতো সর্বত্রই রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে ক্রমশ ঘোলাটে করে আস্ত একটি জাতিগোষ্ঠীর রাষ্ট্রহীনতার বিপন্ন পরিচিতিকেই সুকৌশলে প্রলম্বিত করার মাধ্যমে ‘বাস্তবতার অংশ’-এ পরিণত করা হচ্ছে।
(মানবজমিনে প্রকাশিত)