মুক্তমত

‘আমি রোহিঙ্গা নই’, আপদ, বিপদ ও মুসিবত থেকে রক্ষা পাবেন কি কক্সবাজারবাসী?

‘নামে কীই-বা আসে যায় ....’!

এম.আর মাহমুদ, সাংবাদিক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজার জেলার স্থায়ী/প্রকৃত বাসিন্দারা বড়ই বিপদে। জেলাবাসীকে কোনভাবেই আপদ, বিপদ, মুসিবত থেকে নিস্তার পেতে দিচ্ছে না। শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলাটি মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় আমাদের কপালে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ভোটার হতে গেলে বিপদ, জন্মনিবন্ধন করতে আপদ, দূরে কোথাও গাড়ি যোগে গেলে ইয়াবার মুসিবত। এক কথায় পদে পদেই বিপদ ‘যা কহনও যায় না সহনও যাচ্ছে না’। তারপরও নিরবে হজম করতে হচ্ছে।

ক’দিন আগে এক শিক্ষার্থীর হাতে দেখলাম ‘রোহিঙ্গা নয়’ মর্মে ইউপি চেয়ারম্যানের একটি প্রত্যয়নপত্র। আমি তা দেখে জানতে চাইলাম, ব্যাপারটা কি? সে জবাব দিল ভোটার হওয়ার জন্য ‘রোহিঙ্গা নয়’ মর্মে একটি সনদপত্রের প্রয়োজন হয়। ওই শিক্ষার্থীর বাবা আমার পরিচিতি একজন। তিনি একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। সঙ্গত কারণেই পরিচয় উল্লেখ করলাম না। তার চৌদ্দ গোষ্ঠী এ জেলার বাসিন্দা। তারপরও সেই শিক্ষার্থীকে বহন করতে হচ্ছে ‘রোহিঙ্গা নয়’ মর্মে প্রত্যয়নপত্র।

কক্সবাজার জেলার ৪টি পৌরসভা ও ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্মনিবন্ধন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তবে জেলা প্রশাসন ও শীর্ষ জনপ্রতিনিধিরা অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম চালু করেছেন। তবে জেলার সব ইউনিয়নে নয়। চকরিয়া উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বিষয়টি চকরিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ মহোদয় নিশ্চিত করেছেন।

এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই স্ব স্ব ইউনিয়ন পরিষদে বাদ পড়া ও নবাগত শিশুদের জন্মনিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য সেবা কেন্দ্রে গিয়ে ভিড় জমাচ্ছেন। পরিষদের সচিবেরা কিভাবে জন্মনিবন্ধন করতে হবে তা অভিভাবকদের হাতে প্রচারপত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন। প্রচারপত্রের শর্তগুলো পূরণ করতে একজন অভিভাবকের জন্য কতই কষ্টদায়ক ভূক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে মন্তব্য করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এরপরও সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ জন্মনিবন্ধন সনদ দিতে পারবে না। ইউনিয়ন পরিষদ জন্মনিবন্ধনের জন্য করা আবেদনগুলো সঠিক হলে উপজেলা ট্রান্সপোর্ট কমিটির কাছে পাঠাবে। ট্রান্সপোর্ট কমিটির সন্তোষজনক দলিল দস্তাবেজ পেলে হয়তো জন্মনিবন্ধনের জন্য অনুমোদন দেবে।

এছাড়া বয়স নির্ধারণের জন্য টিকার কার্ড না থাকলে সিভিল সার্জনের কাছে শরণাপন্ন হতে হবে। এসব শর্ত দেখে একজন সচেতন অভিভাবককে মন্তব্য করতে শোনা গেছে। সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটি তার অধিকার জন্মনিবন্ধন করতে যেন বিসিএস ক্যাডারে পরীক্ষা দেয়ার মতো অবস্থা!

কক্সবাজার জেলার বাসিন্দারা ইচ্ছা করেই এই জেলায় জন্মগ্রহণ করেননি। কে কোথায় জন্মগ্রহণ করবে, কে কোথায় মারা যাবে, এসব সিদ্ধান্তের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তারপরও কক্সবাজারে জন্মগ্রহণ করে যেন ভুল করেছি।

ইতিমধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজির আহমদ সাহেব একটি চমৎকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তা হচ্ছে- পুলিশে যারা মাদকের সাথে সম্পৃক্ত তাদের ডোব টেস্ট করাচ্ছে। এরই মধ্যে ডোব টেস্টে মাদকাসক্তের প্রমাণ পাওয়ায় ৯ জনকে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে। আরো কিছু চাকুরী হারানোর পথে রয়েছেন। হয়তো এমনও সময় আসতে পারে কক্সবাজার জেলাবাসীকে ইয়াবা সেবন ও পাচারে জড়িত কিনা তা নির্ণয়ের জন্য ডোব টেস্টের ব্যবস্থা হয়তো কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করলে নিতে পারে।

কক্সবাজার জেলার সকল বাসিন্দা ইয়াবার নেশায় আসক্ত নন। আবার সবাই ইয়াবা পাচারেও জড়িত নন। তারপরও শুধু টেকনাফ সীমান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচার হচ্ছে বলে কক্সবাজারবাসীকে প্রতিনিয়ত মুসিবতের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

আমার এক প্রতিবেশী ছিলেন চিকচিকে কালো। কিন্তু তার নাম ছিল লাল মিয়া। আরেকজন ছিল চমৎকার ফর্সা মানুষ, তার নাম ছিল কালা মিয়া। অনুরূপ অবস্থায় আমরা আছি। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিতাড়িত করার পর আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের এ জেলার উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় দিয়েছে সরকার। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত নানা অপকর্মে জড়িত হয়ে যাচ্ছে। মূলতঃ সীমান্ত রক্ষায় যারা অতন্দ্র প্রহরী তারা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ইয়াবা পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিদিনই বানের পানির মতো সীমান্ত হয়ে ইয়াবা ঢুকছে। বিজিবি র‌্যাব কিছু কিছু ইয়াবা জব্ধ করছে। তবে পুরোপুরি ইয়াবা পাচার রোধ হচ্ছে- এমন কথা বলার সময় এখনও আসেনি। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকান্ডের পর পুলিশ ইয়াবা উদ্ধারে তেমন তৎপর নয় বলা চলে।

লেখক : এম.আর মাহমুদ, চকরিয়া, কক্সবাজার।