রোহিঙ্গা সন্ত্রাসিদের আস্তানা থেকে ফেরা নুরুল বশর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন

রোহিঙ্গা সন্ত্রাসিদের আস্তানা থেকে ফেরা নুরুল বশর নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন

হেলাল উদ্দিন, টেকনাফ
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

সম্প্রতি কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে হ্নীলার মাইক্রো চালক নুরুল হুদা হত্যার পেছনের রহস্য এখনও অজানাই রয়ে গেছে। তবে সন্ত্রাসীদের জিম্মিদশা থেকে ফিরে এসেছেন অপর মাইক্রো চালক নূরুল বশর, কিন্তু তিনি মুখ খুলেছেন।

ঘটনার রহস্য উন্মোচনে স্থানীয় সচেতন মহল ও নিহতের পরিবার, গাড়ি ভাড়ায় সম্পৃক্ত লোকদের জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও এলাকার সচেতন মহল। ভাড়ায় সম্পৃক্ত দুই ভাই ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে চলে গেছে বলেও জানিয়েছেন এলাকাবাসি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার হ্নীলা দরগাহ এলাকার কালু এবং দদাইয়্যা হ্নীলা এলাকার মাইক্রো চালক নুরুল বশর এবং নুরুল হুদাকে ভাড়া করে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থান করা নিকটাত্মীয়দের নিয়ে আসতে পাঠায়। গাড়িতে দদাইয়্যাও ক্যাম্প এলাকায় যান। ক্যাম্পে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে দদাইয়্যা বলে যে, ‘সামনে মরকজের পাশে আমার আত্মীয়রা অবস্থান করছে, তাদের নিয়ে আসার পথে আমাকে এখান থেকে উঠিয়ে নিও’ বলে মাইক্রোবাস থেকে নেমে পড়েন। নামার সময় চালক নূরুল বশর থেকে দদাইয়্যা খরচের জন্য ৫০ টাকা ধার নেন।

ফেরত আসা মাইক্রো চালক নূরুল বশর জানান, ওইদিন হ্নীলা দরগাহপাড়া এলাকার মৃত লম্বা বক্করের ছেলে ছৈয়দ আলম কালু কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারি তার মামাসহ নিকটাত্মীয়দের নিয়ে আসতে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় নোহা গাড়িটি ভাড়া করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ছৈয়দ আলম কালুর ভাই শামসুল আলম ওরফে দদাইয়্যাসহ অপর ড্রাইভার নূরুল হুদাও যান।

তিনি বলেন, ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছলে কালুর ভাই দদাইয়্যা ৫০ টাকা নিয়ে মাঝপথে নেমে পড়ে। নামার সময় সে বলে যে, মরকজের পাশে আমার স্বজনরা দাঁড়িয়ে আছে। তাদের নিয়ে আসার পথে আমাকে উঠিয়ে নিও। তার কথা মতো মরকজের সামনে গিয়ে স্বজনদের গাড়িতে উঠিয়ে চৌরাস্তায় পৌঁছলে অস্ত্র সজ্জিত শতাধিক লোক হায়েনার মতো মুহুর্তের মধ্যে গাড়ির উপর ঝাপিয়ে পড়ে।

তার মতে, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হামলায় ড্রাইভার নূরুল হুদা এবং এক যাত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যান। ওই সময় আমি (নোয়াহ চালক নূরুল বশর) হামলায় আহত হয়ে একটি বাড়িতে আশ্রয় নিই। পরক্ষণে ১০/১২ জন লোক এসে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা আমাকে (নূরুল বশর) লাথি, কিল ও ঘুষি মেরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে চোখে কাপড় বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়।

চালক নুরুল বশর বলেন, গভীর রাতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে বন্দি ও আহতাবস্থায় স্থান পরিবর্তন করে আমাকে তাদের দলনেতার কাছে নিয়ে যায়। পরের দিন পুরোটা সময় অন্ধকার একটি গুহায় চোখ বেঁধে আমাকে ফেলে রাখে।

দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা দুই রাত একদিন গুরুতর আহতাবস্থায় এক মুঠো ভাত পর্যন্ত দেয়নি, দাবি করেন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসিদের আস্তানা থেকে ফেরা নুরুল বশর। তিনি বলেন, একদিকে ক্ষুধার জ্বালা, অন্যদিকে দা’র কোপের ব্যথায় অতিষ্ট হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম আমি। এ সময় আমি শুধু আল্লাহকে ডেকেছি এবং অঝোর নয়নে কেঁদেছি।

এদিকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা টিভি রিলে কেন্দ্রস্থ পাশের ঝিরিতে চোখ বন্ধ অবস্থায় বশরকে রেখে চলে যায়। পরে আহত বশর কাপড় খুলে কোন মতে রাস্তায় উঠে সিএনজি এবং বাসে করে বাড়িতে ফেরত আসেন।

এক সপ্তাহ পার হলেও ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি আইন শৃংখলাবাহিনী। তবে মাইক্রো চালক নূুরুল বশর গাড়ি ভাড়ায় সম্পৃক্তরা ওই ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করছেন। স্থানীয় সচেতন মহলও দদাইয়ার মাঝপথে নেমে যাওয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।

গাড়ী ভাড়ায় সম্পৃক্ত ছৈয়দ আলম কালু বলেন, আমার ভাইয়ের স্বজনদের নিয়ে আসতে গাড়িটি ভাড়া করে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল ঠিক। তবে এ ঘটনায় আমার কোন ধরণের সম্পৃক্ততা নাই।

জানতে চাইলে নিহত নূরুল হুদার ছোট ভাই মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ওই ঘটনার জন্য কালু ও দদাইয়্যা দায়ী। তারা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংশ্লিষ্ট স্বজনদের নিয়ে আসতে আমার ভাই এবং বশরকে তথ্য গোপন করে ক্যাম্পে পাঠিয়েছিল। তাই পুরো ঘটনার মূল নায়ক এই সহোদর।

তিনি ভাই হত্যায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী জানান, ঘটনার নেপথ্য কারণ খুঁজে বের করা খুবই জরুরী। উখিয়াতে গাড়ীর অভাব নেই। এতো কি প্রয়োজন ছিল, হ্নীলা থেকে গাড়ী ভাড়া করে পাঠানোর!

তিনি বিলম্ব না করে ঘটনায় সম্পৃক্তদের খুঁজে বের করার দাবি জানান।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সনজুর মোরশেদ বলেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তিনি ঘটনায় সম্পৃক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন বলেও জানান।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!