করোনা রোগীর প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর

করোনায় দেশে একদিনে ৪০ জনের মৃত্যু

দেশে গত আট মার্চ তিন জন করোনা আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ দেয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। তবে করোনা মহামারির চার মাস পার হলেও দেশে আক্রান্তদের সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। নিয়মিত বুলেটিনে কেবল করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া নির্ধারিত হাসপাতালের তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে একটা বিরাট অংশ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন, চিকিৎসা নিচ্ছেন অধিদফতরের নির্ধারিত হাসপাতালের বাইরের হাসপাতালে। তাদের তথ্য বা সংখ্যা অধিদফতরের কাছে নেই। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির ভয়াবহতা বোঝার জন্য মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তা না হলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৮০টি পরীক্ষাগারে কোভিড-১৯ এর নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। ২৩ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ বিষয়ক নিয়মিত অনলাইন বুলেটিনে জানানো হয় তার আগের ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১২ হাজার ৯২টি আর নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১২ হাজার ৩৯৮টি। করোনা রোগী শনাক্তের ১৩৮ তম দিনে জানানো হয়, দেশে এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন দুই লাখ ১৬ হাজার ১১০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫০ জনের মৃত্যুর (২৩ জুলাইয়ের তথ্য) সংবাদ জানিয়ে বলা হয়, করোনাতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন দুই হাজার ৮০১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ২৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

আবার ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন দুই হাজার ছয় জন, এখন পর্যন্ত সুস্থ এক লাখ ১৯ হাজার ২০৮ জন। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৫৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার এক দশমিক ৩০ শতাংশ।

তবে দেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে কত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, ভর্তি আছেন সে সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির ভয়াবহতা বোঝার জন্য মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা দরকার, যেটা অধিদফতরের কাছে নেই। সেটা না হলে মহামারিতে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা যেমন জানা যাবে না, তেমনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব নয়।

একইসঙ্গে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে রোগী নেই প্রশ্নে তারা বলছেন, সংক্রমণ ভীতি, আস্থাহীনতা, হাসপাতাল অব্যস্থাপনা এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে রোগী নেই।

গত ২৪ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৫০ শয্যা বা তার বেশি শয্যার সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড এবং নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে পৃথক ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু কয়েকটি হাসপাতাল বাদে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কত রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন সেটা স্বাস্থ্য অধিদফতর জানাচ্ছে না। ২৩ জুলাই পর্যন্ত অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশের আট বিভাগে কোভিড রোগীদের জন্য মোট সাধারণ শয্যা রয়েছে ১৫ হাজার ১৩৪টি। আর বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন চার হাজার ২৪৮ জন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ( আইসিইউ) রয়েছে ৫৩২টি আর রোগী ভর্তি আছেন ৩০৩ জন।

এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে অবস্থিত ২২টি হাসপাতালে বেড সংখ্যা রয়েছে সাত হাজার ৫৩টি, রোগী ভর্তি আছেন দুই হাজার ১৩৮ জন। শয্যা খালি রয়েছে চার হাজার ৯১৫টি। আইসিইউ রয়েছে ২৮০টি শয্যা, রোগী ভর্তি আছেন ১৮৮ জন। আর খালি আছে ৯২টি আইসিইউ বেড।

আবার মহানগরী বাদে ঢাকা বিভাগে করোনা রোগীদের জন্য সাধারণ শয্যা রয়েছে এক হাজার ৫৪৯টি, রোগী ভর্তি আছেন ২১৩ জন। আইসিইউ বেড রয়েছে ৬৪টি, রোগী ভর্তি আছেন ১৯ জন।

ময়মনসিংহ বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৪৮০টি, রোগী ভর্তি রয়েছে ৭৭ জন, আইসিইউ রয়েছে ১৭টি, রোগী ভর্তি আছেন চার জন।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৬৬৫টি, ভর্তি আছেন ৩১০ জন, ৩৫৫টি বেড ফাঁকা। আইসিইউ রয়েছে ৩৯টি, রোগী ভর্তি আছেন ২২ জন, বেড ফাঁকা রয়েছে ১৭টি। চট্টগ্রাম মহানগরী ছাড়া বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে এক হাজার ৭০৩টি, রোগী ভর্তি আছেন ৪৯১ জন। আইসিইউ বেড রয়েছে ৩০টি, রোগী ভর্তি আছেন ১৮ জন।

রাজশাহী বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে এক হাজার ৩০৩টি, রোগী ভর্তি আছেন ২২৬ জন। আইসিইউ বেড রয়েছে ৩৮টি, রোগী ভর্তি আছেন ১৭ জন।

রংপুর বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৭৫৭টি, রোগী ভর্তি আছেন ১১২ জন। আইসিইউ বেড রয়েছে ২০টি, রোগী ভর্তি আছেন সাত জন।

খুলনা বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৭৫৫টি, রোগী ভর্তি আছেন ৩০৬ জন। আইসিইউ বেড ১৮টি, রোগী ভর্তি আছেন ১২ জন।

বরিশাল বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৪৪৩টি, রোগী ভর্তি আছেন ২২১ জন। আইসিইউতে রয়েছে ১০টি বেড, রোগী ভর্তি আছেন আট জন। আর সিলেট বিভাগে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৪২৬, রোগী ভর্তি আছেন ১৫৪জন। আইসিইউ বেড রয়েছে ১৬টি, রোগী ভর্তি আছেন আট জন।

এদিকে অধিদফতরের তালিকার বাইরের হাসপাতালগুলোর রোগী সংখ্যা সরকারি তালিকাতে যোগ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যারা রোগী ভর্তি নিচ্ছে তাদের তথ্য মোটামুটি রয়েছে।

‘সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য আমরা রাখা শুরু করেছি, আপডেট হচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।

তবে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরার্মশক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রতিদিন যে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দিচ্ছে, তার বাইরে অনেক রোগী রয়েছেন। এরা তালিকাভুক্ত হচ্ছেন না।

কোন বেসরকারি হাসপাতালে কত রোগী ভর্তি রয়েছে, সেটা তারা (অধিদফতর) খবর রাখে বলে মনে হয় না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অথচ তাদের অধিভুক্ত করা উচিত। প্রতিটি রোগীকে তালিকাতে আনতে হবে মহামারির ব্যাপকতা বোঝার জন্য, তার কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের জন্য, ভবিষ্যত সার্ভিলেন্সের জন্য। এটা না করা গেলে বিরাট একটা ‘গ্যাপ’ থেকে যাবে আমাদের।’

সব রোগী তালিকাতে আসা কেন প্রয়োজন সে বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, সব হাসপাতাল কিংবা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া কোভিড আক্রান্ত রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে যাচ্ছে না। কিন্তু মহামারির ভয়াবহতা বোঝার জন্য মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নির্ধারণ করা দরকার। রোগী সংখ্যা না বোঝা গেলে বর্তমান করণীয় এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা করা যাবে না।

তবে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা অবশ্যই স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকাতে থাকা উচিত মন্তব্য করেন জাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, সব হাসপাতালে কোভিড রোগী ভর্তি করানোর জন্য তারা নিজেরাই নির্দেশনা দিয়েছে। সে হিসেবে সব হাসপাতালের রোগী তালিকা যদি তাদের কাছে না থাকে, তাহলে সেটা সমন্বয়হীনতার উদাহরণ। আর কোনোভাবেই এটা বলার সুযোগ নেই, যে সংক্রমণ কমেছে। বরং সঠিক তথ্যের অভাবে, টেস্টের অভাবে রোগীর সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!