মানসিক স্বাস্থ্যে করোনার প্রভাব মারাত্মক উদ্বেগের কারণ

করোনা ‘হটস্পট’ চকরিয়ায় সর্বাধিক ৫৩ রোগী, সদরে ৩৫ আর দুইদিনে ৪ রোহিঙ্গা

বেসরকারি চাকরিজীবী সঞ্জয় দে করোনায় আক্রান্ত হন। পরে তার সংস্পর্শে থাকার কারণে আক্রান্ত হন তার স্ত্রী অন্যা দে। অন্যা জানান, করোনায় শারীরিকভাবে যতটা ক্ষতি হয়েছে তার চেয়ে বেশি মানসিকভাবে ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আসলে এটা একটা মানসিক যুদ্ধ এবং সেটা যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন তারাতো বটেই, পরিবারের অন্য মানুষগুলোর জন্যও সমান প্রযোজ্য।’ এটা যে কেবল ভুক্তভোগী অন্যার বক্তব্য তা-ই নয়, বরং করোনা রোগী এবং করোনা রোগী নন— এমন অনেকেই যে এখন তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগছেন, তা জোর দিয়েই বলছেন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরাও।

করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। সংস্থাটি বলছে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভুগছেন এমন মানুষরা যদি সর্বোচ্চ চিকিৎসাও পান, তারপরও তাদের লক্ষণ বেড়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মহামারির প্রভাব ইতোমধ্যে মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা, সংক্রমণভীতি, পরিবারের সদস্য হারানোর দুঃখ ও কষ্ট— এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপার্জন ও চাকরি হারানোর ভয়।’

করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতরও। গত ৪ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত বুলেটিনে অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামাররি কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা আমাদের সবার মনের ওপরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে অনেকেরই নিয়মিত ঘুম ব্যাহত হচ্ছে।’

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়মিত রোগীর সংখ্যা কমে গেছে। রোগী কমেছে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও। তবে ঘরে ঘরে মানুষের নানা ধরনের মানসিক সংকট বেড়ে চলেছে বলে জানতে পারছেন তারা। ফোনেই অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কাউন্সিলিং করছেন। অনেকের মন্তব্য, দেশে করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা হয়তো গোনা যাচ্ছে, কিন্তু মানসিক চাপে থাকা বা মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা চিহ্নিত করা যাচ্ছে না বা গোনা যাচ্ছে না। সারাদেশের মানুষই এখন প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন। ফলে এটাই এখন মারাত্মকভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য মতে, লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে হয়তো কোভিড প্যান্ডেমিক মোকাবিলা করা যাবে, কিন্তু এর প্রভাবে যে ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ আসবে, সেটা হবে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্যান্ডেমিক। বহু মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত হবেন। বহু মানুষ পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগবেন।

চীনের উহান, ইতালি এবং নিউইয়র্কে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের মধ্যে পিটিএসডি হওয়ার আশঙ্কা আছে।

যুদ্ধ, প্যান্ডেমিক বা যেকোনও বড় বিপর্যয়ের পরে এটা হয়ে থাকে বলেও মন্তব্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। আর তাই মানসিক স্বাস্থ্যের যে বিপর্যয় তাকে মোকাবিলার জন্য একটি লংটার্ম পরিকল্পনা দরকার বলেও মন্তব্য তাদের।

তবে অন্যান্য সময়ের চেয়ে এখন হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা কম। বহির্বিভাগে সাধারণ সময়ের চেয়ে রোগী আসছে চার ভাগের এক ভাগ, রোগী ভর্তি রয়েছে বেডের তুলনায় তারও কম। তাই প্রকৃত চিত্র বোঝায় উপায় নেই, বলছেন চিকিৎসকরা। যাতায়াত ব্যবস্থা, হাসপাতালে সংক্রমণ ভীতি, বাইরে যাওয়ার ভীতি, হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা এসব কারণে মানুষ ‘মিসিং’।

আবার সব ধরনের ওষুধও এসব রোগীদের দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে চিকিৎসকরা বলছেন, আলাদা করে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা স্বাস্থ্য অধিদফতরে দেওয়া হলেও করোনা বিষয়ক জাতীয় চিকিৎসার যে গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে, তাতে ‘ইন্ট্রিগ্রেটেডভাবে’ মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হয়নি। এটা খুবই জরুরি কোভিড রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যসহ যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্যও।

‘করোনাভাইরাসকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব’ শীর্ষক একটি জরিপ করেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি। গত ১৪ মে প্রকাশিত জরিপের ফলাফলে বলা হয়, করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে। জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের মধ্যে করোনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ, অনিদ্রায় ভুগছেন ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ, বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা আর শঙ্কার কথা বলেছেন ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অপরদিকে, সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আতঙ্কিত ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ। আর জীবন অর্থহীন হয়ে পরেছে এমনটা বলেছেন ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটট ও হাসপাতাল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ খান ও সিফাত-ই সৈয়দ ‘করোনাভাইরাস মহামারি পরিস্থিতিতে ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু কিশোরদের আচরণ ও আবেগজনিত পরিবর্তন’ শীর্ষক একটি অনলাইন জরিপ করেছেন। এই জরিপে শিশুদের মা বাবার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। এই দুই বিশেষজ্ঞের জরিপের ফলাফল এখনও অপ্রকাশিত। তবে তারা জানান, জরিপে শিশুদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আচরণগত পরিবর্তন পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে শিশুদের ঘুমের সমস্যা, আগ্রাসী আচরণ, রুটিন এলোমেলো হয়েছে। একইসঙ্গে মনমরা হয়ে থাকা, কান্নাকাটি করার সমস্যাও পাওয়া গেছে।

এই জরিপে একইসঙ্গে শিশুদের মা বাবাদের মানসিক চাপও পরিমাপ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, যে সব বাবা-মায়েদের মধ্যে মানসিক চাপ বেশি, তাদের সন্তানের মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন বেশি, অথবা বিপরীতভাবে যেসব শিশুর মধ্যে আচরণগত মানসিক চাপ বেশি, সেই শিশুদের বাবা-মায়ের মধ্যেই মানসিক চাপ বেশি।

করোনার সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে এখনও জাতীয় পর্যায়ের কোনও জরিপ নেই জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বিগ্নতা রয়েছে। তবে সেটা রোগের পর্যায়ে কিনা, এটা এখনই বলা যাবে না। যেহেতু তারা চিকিৎসকের কাছে আসছেন না। তবে প্যান্ডেমিক সিচুয়েশন, অভিজ্ঞতা বা বৈজ্ঞানিকভাবেও মানুষের সমস্যা বাড়ার কথা বলা যায়।’

বর্তমান অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের কী কী ক্রাইসিস চলছে, করোনার পরে আফটার ইফেক্ট হিসেবে কী কী মানসিক সমস্যা হতে পারে, তার প্রেডিকটিভ রিসার্চ এবং রেজাল্ট করা উচিত বলে জানান অধ্যাপক সালাহউদ্দিন কাউসার।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেবল করোনা আক্রান্ত রোগী নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা, ঘুম না হওয়া বহুগুণ বেড়ে গেছে।’

এসব মানসিক সমস্যা কাটাতে স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রাখতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে যাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা সংক্রমিত হচ্ছে, তাদের চিকিৎসার জন্য দেশে যথেষ্ট পরিমাণে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নেই। তাই সব চিকিৎসকের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও মাথায় রেখে চিকিৎসা দেওয়ার অনুরোধ করছি।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব ডা. রিজওয়ানুল করিম শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক নির্দেশনার আলোকে করোনার সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য এবং মনোসামাজিক বিবেচ্য বিষয়গুলো নিয়ে গাইড লাইন করা হয়েছে গত ১৫ মার্চ। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, ফ্রন্ট লাইন ওয়ার্কার, নাজুক জনগোষ্ঠী (অন্তঃসত্ত্বা মা, শিশু, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক মানুষ) এবং সেবাদানকারীদের ব্যবস্থাপকদের জন্যও করণীয় বিষয় রয়েছে।’

করোনার সময়ে সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। আবার একইসঙ্গে এটা সবচেয়ে অমানবিক ব্যবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করোনা আক্রান্ত হলে ওই ব্যক্তি কাছের মানুষের সাহচার্য থেকে দূরে থাকছেন। এতে করে মানসিক প্রশান্তির মতো অনুভূতি থেকে মানুষ ডিপ্রাইভ হচ্ছে। এটা রোগী এবং স্বজন সবার জন্যই অত্যন্ত কষ্টকর বিষয়, যেটা থেকে মানুষ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী সচেতনতামূলক পোস্টার, লিফলেট তৈরি করে বিতরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে করোনার নমুনা সংগ্রহের সময় তাদেরকে সেগুলো দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে অনলাইনে দেশের ৩৮০টি স্বাস্থ্য স্থাপনার ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ১৬২৬৩ নম্বরে তিন শিফটে তিন জন করে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সেবা এখনও চলমান রয়েছে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!