উখিয়া আইসোলেশনে এ্যাকশন চলছে, দুই ডাক্তার চাকুরিচ্যুত

উখিয়া আইসোলেশনে এড. আবু সিদ্দিকের অনশন, বদলে গেল অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

উখিয়ার এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারের দুইজন সিনিয়র চিকিৎসককে চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে। চাকুরিচ্যুত চিকিৎসকদ্বয় হলেন প্রতিষ্ঠানটির চতুর্থ প্রধান ডা. নাজিয়া নাজি এবং মেডিকেল অফিসার ডা. সাজু।

রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের হেলথ এন্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার, নাইজেরিয়ান নাগরিক পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে গণমাধ্যমকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, রোগীদের প্রতি চরম অসদাচরণ, দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও গাফেলতির বিষয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই দু’জন চিকিৎসককে চাকুরি থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কয়েকজনের কাছ থেকে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে।

পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের ১১০১, ১৪তম ষ্ট্রীট, এন ডাব্লিউ স্যুট ওয়াশিংটন ডিসিস্থ সদর দপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে চিকিৎসকদ্বয়ের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা ৯ জুলাই থেকে কার্যকর করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট রোগীকে গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল উখিয়ায় স্থাপিত এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি সার্বিক পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রেখে আরও গোছালো, চমৎকার ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা কৌশল তৈরি করছেন বলেও জানান তিনি।

সুত্র মতে, প্রতিষ্ঠানটির আরও কিছু অযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয় লোককে অপসারণ করা হবে। রোগীদের সেবায় আনা হবে, মান ও গুণগত পরিবর্তন।

পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে বলেন, গুটিকয়েক অযোগ্য মানুষের জন্য বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জনকারি রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের সামগ্রিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।

তবে তিনি মনে করছেন, নতুন একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে একটু সমন্বয়হীনতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এটা ক্রমান্বয়ে কাটিয়ে উঠা হচ্ছে।

জাতিসংঘের অংগ প্রতিষ্ঠান ইউএনএইচসিআর চলমান করোনাভাইরাস সংকটে তাদের মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসাবে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে মাত্র ৪০ দিনে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করেছে। গত ২৭ মে থেকে সেখানে কোভিড-১৯ রোগী ভর্তি দেয়া শুরু হয়।

ওয়াশিংটনভিত্তিক এনজিও রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল উখিয়ার এই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটির পরিচালনা করার দায়িত্ব পায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ৩৪টি আলাদা বিভাগে বিভক্ত করে উখিয়ার এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি পরিচালনা করা হয়। রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে তাদের কার্যক্রম চালালেও স্থানীয় ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করে আসছিল ৩৪টি বিভাগের। দায়িত্বপালনকারি এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে হাসপাতালের কার্যক্রম।

করোনা ‘পজিটিভ’ হয়ে গত ২৮ জুন পরিবারের ৭ সদস্যসহ ভর্তি হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী। ভর্তি হয়ে তিনি সেখানে দেখতে পান বিভিন্ন বিভাগে চরম অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতা।

গত ৪ জুন গণমাধ্যমকর্মী মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীকে প্রেসক্রাইব করা সেফিরক্সিম ১ গ্রাম নামের একটি ইনজেকশন সকাল ৯টায় দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ৯টার ইনজেকশন বিকেলেও কেন দেয়া হলো না- তা মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী দায়িত্বপালনরত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন। তাতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তারা মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীর দিকে দলবল নিয়ে মারমুখী হয়ে তেড়ে আসেন, দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ করেন। ওই ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী হাসপাতালের ডি-২ নম্বর সিটে অনশন শুরু করেন।

সিনিয়র আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মী এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী হাসপাতালের বেডে অনশন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, এসএসসি ব্যাচ ৮৪ এসোসিয়েশনসহ একের পর এক বিভিন্ন দায়িত্বশীল সংগঠন।

নিজ বেডে অনশনরত অবস্থায় মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা না খেয়ে, ওষুধ সেবন না করেই কাটিয়ে দেন। ফলে তিনি একজন কোভিড-১৯ রোগী হয়েও জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে যান।

পরে দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা পর রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের হেলথ এন্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারের ডি-২ নম্বর বেডে নিজে হাজির হয়ে পানি পান করিয়ে এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীর অনশন ভাঙ্গান। গত সোমবার (৬ জুন) বেলা ১টার দিকে আবু সিদ্দিক ওসমানীর অনশন ভঙ্গ করানো হয়।

তার আগে আইসোলেশন সেন্টারটির চরম অব্যবস্থাপনা, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়া, ভুল ওষুধ দিয়ে ফাইল গায়েব করা, মেডিকেল যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা ও রোগীদের প্রতি দুর্ব্যবহারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয় অনশনরত মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীকে।

আবু সিদ্দিক ওসমানীর মতে, এতবড় একটি প্রতিষ্ঠানে ডায়াবেটিক মাপার কোন গ্লোকোমিটার নেই। রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের হেলথ এন্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে এ্যাকশন শুরু করেন।

সুত্র মতে, ব্রেকফাস্টে পানির মতো টলটলে ডাল ও ইউএনএইচিআরের ত্রিপলের মতো মোটা, রোগীদের খাওয়ার অযোগ্য রুটি সরবরাহ দেয়া হতো। ৭ জুলাই সকাল থেকে তা পরিবর্তন করে উন্নতমানের রুটি, ডাল ও অন্যান্য আইটেম রোগীদের দেয়া হচ্ছে। এটি চালু হওয়ার ৩৭ দিন পর্যন্ত কোন দিন কোন রোগীকে ম্যানুতে থাকা সত্বেও ফল দেয়া না হলেও ৭ জুলাই বিকেলে হাসপাতালটি চালুর ৩৮তম দিবসে রোগীদের উন্নতমানের ফল দেয়া হয়েছে। যা নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। রাতের খাবারের ম্যানুতে দেশি মুরগীর সাথে দেয়া হয়েছে ডাল ও শবজি। খাওয়া দাওয়ার সাথে এই হাসপাতালে আগে পুষ্টিবিদের কোন পরামর্শ না থাকলেও ৭ জুলাই থেকে এখানকার সব খাবার তৈরিতে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। রোগীদের পানির মতো দুধ সরবরাহ করা হলেও ৭ জুলাই নৈশভোজের পর থেকে রোগীদের ভালমানের দুধ দেয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে যে উন্নয়ন কাজ সমুহ অসম্পূর্ণ ছিলো, তা সম্পন্ন করতে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে জোরেশোরে শ্রমিক নামানো হয়েছে। ওয়াশ ও বাথরুম গুলো ৭ জুলাই সকাল থেকে ঝকঝক করছে। অথচ অন্যান্য সময় দুর্গন্ধে ওয়াশ ও বাথরুম গুলোতে যাওয়া যেতো না।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!