উখিয়া আইসোলেশনে এড. আবু সিদ্দিকের অনশন, বদলে গেল অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

উখিয়া আইসোলেশনে এড. আবু সিদ্দিকের অনশন, বদলে গেল অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

উখিয়া উপজেলার টিএন্ডটি মাঠের দক্ষিণে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প সংলগ্ন বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১৪৪ বেডের পরিপূর্ণ এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার। জাতিসংঘের অংগ প্রতিষ্ঠান ইউএনএইচসিআর চলমান করোনাভাইরাস সংকটে তাদের মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসাবে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে মাত্র ৪০ দিনে এই হাসপাতালটি নির্মাণ করে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন গত ২১ মে হাসপাতালটি আনুষ্টানিক ভাবে উদ্বোধন করেন। প্রায় এক সপ্তাহ ‘মেডিকেটেড রিহার্সাল’ দেয়ার পর ২৭ মে থেকে সেখানে কোভিড-১৯ রোগীদের ভর্তি শুরু হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি এনজিও উখিয়া এসএআরআই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

৩৪টি আলাদা বিভাগে বিভক্ত করে এই আইসোলেশন এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টারটি পরিচালনা করা হয়। রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করলেও স্থানীয় ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করে আসছিল ৩৪টি বিভাগেই। দায়িত্বপালনকারি এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিচালনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে হাসপাতালের কিছু অনিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম।

সুত্র মতে, করোনা ‘পজিটিভ’ হয়ে এখানে ২৮ জুন পরিবারের ৭ সদস্যসহ ভর্তি হন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণমাধ্যম কর্মী এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী। ভর্তি হয়ে তিনি সেখানে দেখতে পান হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগে চরম অনিয়ম ও সমন্বয়হীনতা।

গত ৪ জুন গণমাধ্যমকর্মী মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীকে প্রেসক্রাইব করা সেফিক্সিম ১ গ্রাম নামের একটি ইনজেকশন সকাল ৯টায় পুশ করার কথা ছিল। কিন্তু সকাল ৯টার ইনজেকশন বিকেলেও কেন দেয়া হলো না- তা মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী দায়িত্বপালনরত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে জানতে চান। তিনি জানতে চাওয়ায় হাসপাতালটির কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারি মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীর দিকে দলবল নিয়ে তেড়ে আসেন, দুর্ব্যবহার ও অসদাচরণ করেন। তারই প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী হাসপাতালের ডি-২ নাম্বার বেডে অনশন শুরু করেন।

সিনিয়র আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মী এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীর হাসপাতালের বেডে অনশন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, এসএসসি ব্যাচ ৮৪ এসোসিয়েশনসহ একের পর এক বিভিন্ন সংগঠন।

নিজ বেডে অনশনরত অবস্থায় মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা না খেয়ে, ওষুধ সেবন না করেই কাটিয়ে দেন। ফলে তিনি একজন কোভিড-১৯ রোগী হয়ে জীবন সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ে যান।

পরে দীর্ঘ ১৮ ঘন্টা পর রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের হেলথ এন্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে হাসপাতালের ডি-২ নম্বর বেডে নিজে হাজির হয়ে পানি পান করিয়ে এডভোকেট মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানীর অনশন ভঙ্গ করিয়েছেন। সোমবার (৬ জুলাই) বেলা ১টার দিকে এই অনশন ভঙ্গ করান তিনি।

তার আগে হাসপাতালটির চরম অব্যবস্থাপনা, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেয়া, ভুল ওষুধ দিয়ে ফাইল গায়েব করা ও রোগীদের প্রতি দুর্ব্যবহারের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়।

এই ঘটনার পর রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের হেলথ এন্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার পেট্রেশিয়া এফে আজকিয়ে এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে এ্যাকশন শুরু করেন।

ব্রেকফাস্টে পানির মতো টলটলে ডাল ও ইউএনএইচসিআরের ত্রিপলের মতো মোটা, রোগীদের খাওয়ার অযোগ্য রুটি সরবরাহ দেয়া হতো। ৭ জুলাই সকাল থেকে তা পরিবর্তন করে উন্নতমানের রুটি, ডাল ও অন্যান্য আইটেম রোগীদের দেয়া হয়েছে। এটি চালু হওয়ার ৩৭ দিন পর্যন্ত কোনদিন কোন রোগীকে ম্যানুতে থাকা সত্বেও ফল সরবরাহ দেয়া না হলেও ৭ জুলাই বিকেলে হাসপাতালটি চালুর ৩৮তম দিবসে রোগীদের উন্নতমানের ফল সরবরাহ দেয়া হয়েছে। যা নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।

রাতের খাবারের ম্যানুতে এসেছে পরিবর্তন। এখন রাতের ম্যানুতে দেশি মুরগীর সাথে দেয়া হয়েছে ডাল ও শবজি।

খাওয়া দাওয়ার সাথে এই হাসপাতালে আগে পুষ্টিবিদের কোন পরামর্শ না থাকলেও ৭ জুলাই থেকে এখানকার সকল খাদ্য তৈরিতে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। রোগীদের পানির মতো দুধ সরবরাহ করা হলেও ৭ জুলাই নৈশভোজের পর থেকে রোগীদের ভালমানের দুধ সরবরাহ দেয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে যে উন্নয়ন কাজ অসম্পূর্ণ ছিল, তা সম্পন্ন করতে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে জোরেশোরে নামানো হয়েছে পর্যাপ্ত শ্রমিক। ওয়াশ ও বাথরুম গুলো ৭ জুলাই সকাল থেকে ঝকঝক করছে। অথচ অন্যান্য সময় দুর্গন্ধে ওয়াশ ও বাথরুম গুলোতে যাওয়া যেতো না। হাসপাতালের লন্ড্রীতে আনা হয়েছে শৃঙ্খলা। হাসপাতাল প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা দূর করতে আনা হচ্ছে চেইন অব কমান্ডভিত্তিক জবাবদিহিতা। রোগীদের সাথে অসদাচরণ, দুর্ব্যবহার নিয়ে যারা জড়িত তাদেরও হাসপাতাল চাকুরীবিধির সুস্পষ্ট লঙ্গনের অভিযোগ এনে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায়, কৌশলে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। গঠন করা হচ্ছে স্পর্শকাতর বিষয়ে তদন্ত কমিটি।

রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের একজন উর্ধ্বতন কর্মকতা সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাদের সদর দপ্তরের কোন নির্দেশনা ছাড়া স্থানীয়ভাবে তারা কোন মৌলিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না। তাই গত দুইদিনের ঘটনাপ্রবাহ সবই তাদের ১১০১, ১৪তম ষ্ট্রীট, এন ডাব্লিউ স্যুট ওয়াশিংটন ডিসিস্থ কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে।

রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের সদর দপ্তর থেকে কোভিড-১৯ রোগীদের স্বার্থে আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে আরো কঠিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন ওই কর্মকর্তা।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!