করোনামুক্তির গল্প

আইসোলেশন সেন্টারে শ্বাসরুদ্ধকর ২০ দিন

আইসোলেশন সেন্টারে শ্বাসরুদ্ধকর ২০ দিন

এম ইব্রাহিম খলিল মামুন, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

১৩ জুন শনিবার। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করতেই অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হলো আমি এবং আব্বা দু’জনেরই করোনা পজিটিভ। অথচ আব্বার কয়েকদিন ধরে জ্বর থাকলেও আমার করোনার কোন উপসর্গ ছিল না। ১১ জুন আমি আর আব্বা দু’জনেই করোনা টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিয়েছিলাম। ওই স্যাম্পল পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ সেন্টার থেকে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা ফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন। তখন বাসার কাউকে বিষয়টি না জানিয়ে প্রথমে ফোন দিলাম কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ নুরুল আলম ভাইকে। ওনি বেশ কিছু পরামর্শ দিলেন। পরের ফোনটি দিলাম বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আপাকে। বিষয়টি জানার পর ওনি ঢাকার বেশ কয়েকজন ডাক্তারের সাথে কথা বলে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ল্যাবএইড হাসপাতালে আমি আর আব্বার জন্য একটা কেবিনের ব্যবস্থা করে দিলেন এবং বললেন টাকা-পয়সার সমস্যা থাকলে ওনাকে বলতে। ঠিক করলাম একটা এম্বুলেন্সও। পরে বিষয়টি জানালাম সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজার এর সাধারণ সম্পাদক আনছার ভাইকে (আনছার হোসেন)।

দূর্ঘটনার আশংকায় করোনা আক্রান্তের বিষয়টি রাতে জানায়নি আব্বাকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঢাকায় যাওয়ার জন্য সবকিছু রেডি করে ফেললাম। এরই মধ্যে দুর্ণীতি দমন কমিশনের দুইজন সহকারি পরিচালক ফোন দিয়ে আমাকে সাহস দিলেন অবশ্যই দুদকের এই দুই কর্মকর্তা করোনা রিপোর্ট তাড়াতাড়ি পাওয়ার জন্যও সহযোগিতা করেছিলেন।

রাত ১০টার দিকে ফোন দিলেন গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম অর্থাৎ আমার বড় জেঠাতো ভাই। ওনি আমাকে রামু আইসোলেশন সেন্টারে থাকার পরামর্শ দিলেন। বলেছেন, রামুর ইউএনও এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ওনাকে
আশ্বস্ত করেছেন আমাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে।

এখন সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম ল্যাবএইড হাসপাতালে নাকি রামু আইসোলেশন সেন্টারে যাব! ১০ মিনিট পরপর ঢাকা থেকে ফোন দিয়ে শক্ত থাকার পরামর্শ দিচ্ছিলেন রিজওয়ানা আপা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওনার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রথমে রামু আইসোলেশন সেন্টারে যাব, ভালো না লাগলে ওখান থেকে সোজা ঢাকায় চলে যাব। বিষয়টি চেয়ারম্যান নজরুল ভাই ও ডাক্তার নুরুল আলম ভাইকেও জানিয়ে দিলাম।

সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে বিষয়টি আব্বাকে কৌশলে জানালাম এবং সাহসও দিলাম। কথা বলে বুঝতে পারলাম, ওনি ভেতরে ভেতরে খুবই অসুস্থাবোধ করছেন। আমি বলার সাথে সাথে আব্বা রাজি হয়ে গেলেন। এরমধ্যে বিষয়টি প্রচার হলে অনেক আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই ফোন দিতে লাগলেন।

সকাল ৯টায় চেয়ারম্যান নজরুল ভাই ফোন দিয়ে বললেন, বাসার সামনে এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে তাড়াতাড়ি আইসোলেশন সেন্টারে চলে যেতে। এম্বুলেন্সের সাথে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুইজন লোকও পাঠালেন আমাদের সহযোগিতা করতে।

নিজেকে মৃত্যুর জন্য তৈরি করে বাসা থেকে বিদায় নিয়ে দুই চোখের পানি মুচতে মুচতে আইসোলেশন সেন্টারে ঢুকতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডাক্তার নুরুল আলম ভাইয়ের ছাত্র পরিচয় দিয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতার কথা বললেন এবং দু’জন থাকার জন্য সুন্দর একটা রুমেরও ব্যবস্থা করে দিলেন।

আইসোলেশন সেন্টারে যাওয়ার একদিন পর আমি মোটামুটি ভালো থাকলেও আব্বার অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। অক্সিজেন সেচ্যুরেশন কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। তখন অনেকেই উখিয়া আইসোলেশন সেন্টার অথবা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এক পর্যায়ে আমি সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে পড়ে যাই। এদিকে আব্বার অবস্থাও তেমন ভালো না। এই অবস্থায় রিজওয়ানা আপার সাথে পরামর্শ করলাম কি করা যায়। তখন ওনি ঢাকা বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক বেন্নুর ভাইয়ের সাথে কথা বলেন এবং আমার সাথেও কথা বলিয়ে দেন।

করোনা রোগী যত কম নাড়াচাড়া করা যায় ততই ভালো এবং আরো কিছু গাইডলাইন দিয়ে সাহস দেন বেন্নুর ভাই। একই পরামর্শ দেন ডা. নুরুল আলম ভাইও। নুরুল আলম ভাই আব্বাকে কিভাবে ভালো রাখা যায় সে ব্যাপারে আইসোলেশন সেন্টারের ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন। কথা বললাম ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ মেডিকেলের কয়েকজন ডাক্তারের সাথেও। অবশ্যই তাদের সাথে কথা হয় দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার দেলোয়ার ভাইয়ের মাধ্যমে। আগে থেকে পরিচয় থাকায় দেলোয়ার ভাই আব্বার বিষয় নিয়ে কথা বলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন মহোদয়ের সাথে। এরই মধ্যে চেয়ারম্যান নজরুল ভাই সাংসদ কমল ভাইয়ের সাথে কথা বলে এসডিইউ’তে থাকার ব্যবস্থাও করে ফেলেন। আব্বার জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউর জন্য ফোন করলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাও। এ বিষয়ে কথা হয় সাংবাদিক জিন্নাত ভাই ও কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ সরওয়ার সোহেল ভাইয়ের সাথে। সোহেল ভাই হাই ফ্লো অক্সিজেন থাকায় কক্সবাজারে ইউনিয়ন হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। একই বিষয়ে রামু আইসোলেশন সেন্টার কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার কথা বলেছেন সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজার এর সাধারণ সম্পাদক আনছার হোসেন ও আরটিভির কক্সবাজার প্রতিনিধি সাইফুর রহিম শাহিন ভাই। সবার পরামর্শ আমলে নিয়ে রিজওয়ানা আপার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম রামু আইসোলেশন সেন্টারেই রাখব আব্বাকে, কারণ আমি রামু আইসোলেশন সেন্টারে থাকলে আব্বাকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলে ওনি সেবা পাবেন না। এ সময় আব্বা এক গ্লাস পানিও হাতে নিয়ে খাওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না।

ঠিক ১০ দিন পর আব্বার অবস্থা একটু উন্নতি হতে লাগল। এরই মধ্যে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ আশরাফুল আফসার মহোদয় ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নেন এবং সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাসও দেন। খবর নেন কক্সবাজার ও রামুতে থাকা আমার সহকর্মীরা (বেশি হওয়ায় নাম প্রকাশ করা হয়নি)। অবশ্যই একটা কথা না নললে নয়, আইসোলেশন সেন্টারে কক্সবাজার থেকে আমাকে প্রয়োজননীয় ওষুধগুলো দিয়ে যেতেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক মোঃ জোনাব আলী।

আব্বার অবস্থা যখন খারাপ ছিল তখন রিজওয়ানা আপা এবং এবি ভাই কয়েকটি রাত ঘুমাননি। খবর নিয়ে সাহস দিতেন রাত ২টা, ৩টা এমনকি রাত ৪টায়ও। এরই মধ্যে একদিন আব্বার অবস্থা বেশি খারাপ হলে চট্টগ্রামে যে কোন হাসপাতালে আইসিইউ’র কথা বলে রাখলাম ডেইলি স্টারের সাংবাদিক মোস্তফা ইউসুফ ভাইয়ের সাথে। ঠিক করে রাখলাম একটা এম্বুলেন্সও। কিন্ত আল্লাহর অসীম রহমতে সকলের দোয়ায় রামু আইসোলেশন সেন্টার থেকে কোথাও যেতে হয়নি। রামু আইসোলেশন সেন্টারে কর্মরত ডাক্তার, নার্স এবং কর্মচারীদের সঠিক পরিচর্যায় আব্বা আর আমি দু’জনেই সুস্থ হতে লাগলাম। এরই মধ্যে ২৭ জুন আমি ফলোআপ টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিলে ২৮ জুন রিপোর্ট আসে আমি করোনা নেগেটিভ। ১ জুলাই আব্বার ফলোআপ টেস্টের জন্য স্যাম্পল দিলে ২ জুলাই নেগেটিভ রিপোর্ট আসে।

দীর্ঘ ২০ দিন পর অবশেষে বাসায় ফিরে যাই দু’জনেই।

অভিজ্ঞতা
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে সকল মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন আমি মনে করি তাদের অর্ধেকেই সেবা-যত্নের অভাবে এবং মনোবল ভেঙে যাওয়ায় মৃত্যুবরণ করছেন। যদি করোনা রোগীকে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই তাদের পাশে থেকে আমরা সেবা-যত্ন করতে পারতাম, তাহলে অনেকেই অবহেলায় মৃত্যুবরণ না করে সুস্থ হয়ে উঠতেন।

লেখক : করোনামুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরা দৈনিক বনিক বার্তার কক্সবাজার প্রতিনিধি ও ইয়ুথ এনভাইরনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজার এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!