করোনামুক্তির গল্প

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-২

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

জাহাঙ্গীর আলম, একজন এনজিও কর্মী। এনজিও কর্মী বলাটা ঠিক হচ্ছে না, ওনি এনজিও লিডার। কোস্ট ট্রাস্টের সহকারি পরিচালক ও কক্সবাজার আঞ্চলিক অফিসের টিম লিডার। তিনি আবার কক্সবাজারেরই অধিবাসী।

তিনিও বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই’ করে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন।

জীবন আর মৃত্যুর সেই লড়াইয়ের গল্প তুলে ধরেছেন তার ফেসবুক ওয়ালে। তিনি বাস্তব জীবনের সেই গল্পের নাম দিয়েছেন ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই!

জাহাঙ্গীর আলমের করোনাকালের মানবিকতা ও অমানবিকতার সেই কাহিনী কক্সবাজার ভিশন ডটকমের পাঠকদের জন্য সংশোধিত আকারে তুলে ধরা হলো।

আজ তুলে ধরলাম ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই’ দ্বিতীয় পর্ব।

মৃত্যুর সাথে লড়াই
এ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজিয়ে যাওয়ার শব্দটি সবসময় বেদনাদায়ক এবং কষ্টের। এ্যাম্বুলেন্স চালানো পেশাটি মানবিক একটি পেশা, কিন্তু পেশাটিতে কিছুটা মানবিকতার ঘাটতি চোখে পড়েছে। প্রতিটি এ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেন চালানোর জন্য একজন দক্ষ লোক থাকা দরকার। ড্রাইভারই গাড়ি চালাচ্ছেন, পাশাপাশি তিনি অক্সিজেনও নিয়ন্ত্রণ করছেন।

দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌছানোই যেন তার একমাত্র উদ্দেশ্যে। বারবার বলছিলাম, ভাই আমি পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছি না। যতবারই বলেছি ততবারই রীতিমত ড্রাইভার ধমকের সুরে জবাব দিচ্ছিলেন, আমি দেখছি আপনি অক্সিজেন পাচ্ছেন। পরে এক প্রকার বাধ্য হয়ে রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করালাম। বললাম, ভাই অক্সিজেন পাচ্ছি না। ততক্ষণে তিনি স্বীকার করলেন অক্সিজেন সমস্যা করছে।

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-২

যাই হোক, অবশেষে ২টা ৪০ মিনিটে যাত্রা করে পৌঁছলাম চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হপপিটালে, ততক্ষণে সন্ধ্যা ৬টার কিছুটা বেশি সময়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা আগে থেকে অবগত ছিল বলে কিছুটা সুবিধা হয়েছে। সময় নষ্ট হয়নি। গাড়ি থেকে নামতেই অনেক সহকর্মীকে চোখে পড়ল, যারা দীর্ঘক্ষণ আমার যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। তাদের চোখে মুখে সহকর্মী হারানোর এক ভয় আমি দেখেছি। কৃতজ্ঞ তাদের কাছে যারা আমার অপেক্ষায় ছিলেন এবং সারাদিন চট্টগ্রামে ঘুরে ঘুরে আইসিইউ’র খবরাখবর নিয়েছেন।

এই প্রথম আইসিইউতে আমি। অজানা ভয় কাজ করছে মনে। চারপাশে সব মৃত্যুপথযাত্রী রোগী। সবাই যুদ্ধ করছেন বাঁচার জন্য। ডাক্তার নার্স কথা বলার ফুসরত নেই। জীবন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন সবাই। খোলা চোখে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। পুরোদমে অক্সিজেন চলছিল। অন্তত একটা ভরসা কাজ করছিল অক্সিজেনের অভাব হবে না। হাসপাতালে মাথার কাছাকাছি অক্সিজেন ওঠানামার যন্ত্রটি দেখেছিলাম প্রায় সারাক্ষণই। কখনও বেড়ে যাচ্ছিল, আবার কখনও কমে যাচ্ছিল। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় অক্সিজেন কমে যেতো, তাই ভয়ে রাতে ঘুমাতাম না। হঠাৎ উঠে বসে যেতাম।

আইসিইউতে আমার পাশের সিটের একজনের হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। তীব্র আকারে তিনি চিৎকার করছিলেন বারবার, বাঁচার জন্য। ততক্ষণে আমার চোখে কিছুটা ঘুম চলে আসছিল। ঘুম ভাঙ্গতেই দেখি আমার পাশের সিটের ভাইটি আর নেই। সিট খালি। ততক্ষণ্ রাত বাজে ৩টা ১৫ মিনিট।

২০ মিনিট যেতে না যেতেই আমার ঠিক সামনাসামনি আর এক মুরব্বিও মারা গেলেন। এক রাতে চোখের সামনে হারালাম দুইজনকে। মনটা বেশ ভারী হয়ে ওঠছিল। বারবার ভাবছিলাম, প্রিয় শহরে ফিরে যেতে পারব তো? ভাবছিলাম, প্রিয় কর্মস্থলে কি আবার ফিরতে পারব?

মৃত্যুর ভয় যে এতটা কঠিন তা আগে কখনও ভাবিনি। আর ডাক্তাররা সরাসরি রোগীকে বলছেন, ‘আপনার অবস্থা ভাল না’- এই কথা শোনার পর রোগীর মনের অবস্থা কেমন হতে পারে একবার ভেবে দেখুন।

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-২

লাশ প্যাকেট করছেন একদল লোক, শব্দ শোনা আসছিল স্পষ্ট। বলছিল, এই প্যাকেটেই দাফন করতে পারবেন। আপনাদের আর কিছু করা লাগবে না।

সাতদিনে আইসিইউতে চোখের সামনে হারিয়েছি ছয়জনকে। আল্লাহ তাদের বেহেশত নসীব করুন। পরিবারকে ধৈর্য্য ধারণ করার ক্ষমতা দিন।
বিশেষ করে রাতে আমার পাশে ছিলেন আমার প্রিয় ভাই মুক্তার আহামদ লাভু (স্ত্রীর ইমিডিয়েট বড় ভাই)। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন আমার জন্য। আমার পাশে বসে হাতের এবং পাঁয়ের নখ কেঁটে দিয়েছেন। হাতে তুলে খাইয়ে দিয়েছেন। আমি বরাবরই ওনার প্রতি সারাজীবনই দূর্বল ছিলাম। মনের ভিতরে তাঁর প্রতি ভালবাসা ছিল সবসময়। অনেক রাগারাগীও করেছি হাসপাতালে তাঁর সাথে। নীরবে সহ্য করেছেন। আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুন।

সহকর্মী শাহজাহান জীবনঝুঁকি নিয়েছেন। সারাদিন পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। আমাকে মনোবল দিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ তার প্রতি। সহকর্মী নুরুল আলম মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। কৃতজ্ঞ তার প্রতি।

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-০১

আমার সহোদর ফয়সাল সারাক্ষণ পাশে ছিলেন। কাপড় পরিষ্কার হতে শুরু করে সবকিছু নিজ হাতে করেছেন। যত খাবার আর ওষুধ খুশি মনে নিয়ে এসেছেন আমার জন্য। বিরক্তি দেখিনি ভাইয়ের চোখে। শুধু অভয় দিয়েছেন, তোমার সব খরচ অফিস বহন করছে, এর বাইরে যত টাকা লাগে তুমি চিন্তা করো না। ক্যাশ টাকা প্রস্তুত আছে। তুমি একদম চিন্তা করো না। আর এক সহোদর আমার সাইফুল ইসলাম বর্তমানে রাইট যশোরে কাজ করছে, তার আন্তুরিকতা আমার অবর্তমানে পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ সবকিছু যেন গোছালো ছিল।

আমার ভাই এডভোকেট নিয়াজ মোর্শেদ (সুপ্রিম কোর্ট) একটি ভরসার নাম। আমাদের পরিবারে সে অন্যদের থেকে আলাদা। সে সারাক্ষণ খবরাখবর রেখেছেন। টাকা পয়সার কথা ভাবতে বারবার নিষেধ করেছেন। সারাক্ষণই আমার জেঠা জনাব মাষ্টার নুরুল ইসলাম আমার চিন্তায় উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমাদের পরিবারের মুরব্বী, শুধু আমাদের পরিবারের নয়, টেকনাফ উপজেলার মুরব্বি প্রবীণ আইনজীবী আমার জেঠা জনাব এডভোকেট আমির হোসেন সারাক্ষণ দোয়াতে মগ্ন ছিলেন। খবরাখবর রেখেছেন। আল্লাহ ওনাকে দীর্ঘ হায়াত দান করুন।

কর্মজীবনে কখনও হবে না,পারব না, অসম্ভব এই কথা গুলো কম বলার চেষ্টা করে চলছি। অফিস যে কত বড় বন্ধু হতে পারে সেই অনুভবটা করতে না পারলেই জীবনটাই ব্যর্থ। অফিস আমার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করেছে, কিন্তু আমাকে বুঝতে দেয়নি।
সবাই প্রতিষ্টানে চাকরি করে মাস শেষে বেতন নেয়। মানবিকতা দেখায় কর্মীর প্রতি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কোস্ট ট্রাস্ট অনন্য। কর্মীদের প্রতি সবসময় মানবিক এবং সংবেদনশীল। কর্মীর নিরাপত্তা সবার আগে। কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে রাতদিন সংস্থা কাজ করে চলছে।

সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আগাগোঁড়া একজন মানবিক ব্যক্তি। তিনি সবার জন্য সমান। সবার জন্য মানবিক আচরণ করেন। কখনও পিতার ভূমিকা, কখনও বড় ভাই য়ের ভূমিকা, কখনও অভিভাবকের ভূমিকায়, আবার কখনও শক্ত হাতে শাসন, সব কিছুই তিনি করে থাকেন আমাদের সংশোধনীর জন্য। আল্লাহ তাঁর দীর্ঘ হায়াত দান করুন।

কক্সবাজারের মিডিয়ার বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা সব সময় আমার খবরাখবর নিয়েছেন। পাশে ছিলেন। বারেক ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ, যিনি সবসময় আমার খবরাখবর নিয়েছেন।

জীবনের বড় শিক্ষা সুস্থতার কোন বিকল্প নেই। সুস্থ থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বস্ত মানুষ তৈরি আর ভাল কাজের কোন বিকল্প নেই। ভাল মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটা জরুরি। বিশ্বস্ত মানুষের পাশে থেকে যেন আমার মরণ হয় এইটায় শেষ চাওয়া।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!