করোনামুক্তির গল্প

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-০১

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

জাহাঙ্গীর আলম, একজন এনজিও কর্মী। এনজিও কর্মী বলাটা ঠিক হচ্ছে না, ওনি এনজিও লিডার। কোস্ট ট্রাস্টের সহকারি পরিচালক ও কক্সবাজার আঞ্চলিক অফিসের টিম লিডার। তিনি আবার কক্সবাজারেরই অধিবাসী।

তিনিও বিশ্ব মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই’ করে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন।

জীবন আর মৃত্যুর সেই লড়াইয়ের গল্প তুলে ধরেছেন তার ফেসবুক ওয়ালে। তিনি বাস্তব জীবনের সেই গল্পের নাম দিয়েছেন ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই!

জাহাঙ্গীর আলমের করোনাকালের মানবিকতা ও অমানবিকতার সেই কাহিনী কক্সবাজার ভিশন ডটকমের পাঠকদের জন্য সংশোধিত আকারে তুলে ধরা হলো।

আজ তুলে ধরলাম ‘মৃত্যুর সাথে লড়াই’ প্রথম পর্ব।

মৃত্যুর সাথে লড়াই
জীবনের সাথে লড়াই চলছে সে অনেক আগ থেকেই। সবশেষে বিগত ১২ বছর ধরে কাজ করে চলেছি প্রিয় সংগঠন ‘কোস্ট ট্রাস্টে’র সাথে। সম্প্রতি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।

মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো। প্রতিটি দিন প্রতিটি মিনিট বেঁচে থাকার আকুল প্রার্থনা কাজ করছিল মনে-প্রাণে। ১৭-১৮ জুন, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ দুইদিন শরীরে জ্বর ছিল। মনে হয়েছিল হয়তো কাটিয়ে উঠতে পারব। পরামর্শ নেয়া শুরু করেছিলাম প্রিয় ডা. আবিদুর রেজা এবং প্রিয় আমিনুল ভাইয়ের কাছ থেকে। ১৮ জুন রাতে চিন্তা করলাম, কাল সকাল হলে অফিসেই চলে যাব। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই কথা বললাম প্রিয় অভিভাবক/বড় ভাই/পিতৃতুল্য, সংগঠনের প্রিয় অভিভাবকের (রেজাউল করিম চৌধুরী) সাথে নিজের শরীরের বিষয় নিয়ে। আর দেরি না করে মুহুর্তেই অফিসের গাড়িতে চলে আসলাম প্রিয় অফিসে, আলাদা কক্ষে।

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-০১

১৯ জুন, দিন যত গড়াতে থাকে শরীরে অবস্থা বেশ টের পাচ্ছিলাম, শরীরটা খারাপের দিকে যাচ্ছে। একটু পরপর ফোন করে যাচ্ছেন প্রিয় অভিভাবক রেজা ভাই। ওনি বেশ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, আমার অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নয়। ডা. রিসালাত ও ডা. আবিদুর রেজাকে দিয়ে আমাকে ফোন করিয়েছেন বারবার। সহকর্মী জুলফিকার, ডা. রিসালাত ও ডা. আবিদুর রেজার পরামর্শে পালস অক্সিমিটার দিয়ে বারবার অক্সিজেনের সিচ্যুরেশন মেপে দেখছিলেন আমার সব আঙ্গুল গুলোতে। কিছু একটা অপরপ্রান্ত থেকে বুঝতে পারছিলাম কোন বিপদ ঘটতে যাচ্ছে!

আমার অক্সিজেনের সিচ্যুরেশন ছিল ৭২-৭৫’র মধ্যে। মুহুর্তেই ডা. আবিদুর রেজা বললেন, ‘আংকেল, অফিসে আর পাঁচ মিনিটি থাকাও ঠিক হবে না, এখনি আপনাকে হাসপাতালে চলে যেতে হবে।

দুই চোখে অন্ধকার দেখছিলাম, এত রাতে কোন হাসপাতালে যাব? কি করব? চোখে মুখে যেন অন্ধকার দেখছিলাম। আবারও প্রিয় অভিভাবকের সাহস “তুমি অফিসের গাড়ি নিয়ে সদর হাসপাতালে রওয়ানা দাও”।

সহকর্মী জুলফিকার, রিয়াজ ও বাদশার সহায়তায় রওয়ানা দিলাম, প্রিয় সহকর্মী শাহিনুরের সহায়তায় সদর হাসপতালে পৌঁছালাম। কিন্তু হাসপতালে ঢুকতেই লাশ, আর লাশকে ঘিরেই চারপাশে কান্না। মনটা বেশ ভারি লাগছিল। ততক্ষণে হাসপতালের তত্ত্বাবধায়ককে ফোন করেছেন অনেকেই। কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি মোর্শেদ ভাই (আবু মোর্শেদ চৌধুরী), সাংবাদিক ইমরুল ভাই (ইমরুল কায়েস) ও চ্যানেল আইয়ের মানিক ভাই (সরওয়ার আজম মানিক)।

ধরাধরি করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চতুর্থ তলায়। চারপাশে নীরব আর আতংক কাজ করছিল সবার মনে। দীর্ঘ ঘন্টাখানেক অপেক্ষা শেষে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো করোনা রোগীদের ওয়ার্ডে। চারপাশে শুয়ে আছেন করোনা রোগী। অজানা ভয় কাজ করছিল। এইবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করল রোগীর সাথে রাতে কাউকে থাকতে হবে এবং বাধ্যতামূলক। এমন সময় আমার সকল চিন্তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে এলেন প্রিয় সহকর্মী রিয়াজ। বললেন, টেনশানের কোন কারণ নেই, আমি আপনার সাথে থাকব ভাই।

পিতামাতার একমাত্র পুত্র সন্তান রিয়াজ। তার দিকে থাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, আমি এমন কি করলাম ছেলেটার জন্য যে, এক বাক্যে আমার সাথে রাতে জীবনবাজি রেখে থাকার জন্য রাজী হয়ে গেল। আমার চোখ থেকে কখন যে পানি গড়িয়ে পড়ল টেরই পেলাম না।

মৃত্যুর সাথে লড়াই, পর্ব-০১

অক্সিজেন একটার পর একটা শেষ হচ্ছে। আর মনের মধ্যে অজানা আতংক কাজ করছিল, অক্সিজেন পর্যাপ্ত আছে তো? ডা. আবিদুর রেজা হাসপাতালের ডিউটিরত ডাক্তারদের সাথে প্রতিনিয়ত কথা বলে যাচ্ছিলেন, তা বেশ টের পাচ্ছিলাম। রাত যত বাড়ছে তত আতংকও বাড়তে ছিল। বেঁচে থাকার আকুতি করছিলাম মনে মনে।

ঘরে আমার ১১ দিনের নবজাতক শিশু কন্যা। একটু কোলে নেয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়নি। আর বড় মেয়ের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। সে ১৯ জুন সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমি কাপড় গুছিয়ে অফিসে চলে এসেছি। ১৯ জুন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আমার মা কান্না করে যাচ্ছিলেন অনবরত। মায়ের কান্না শুনে বড় মেয়ে আরিয়া বুঝে গেছে, তার বাবার কিছু একটা হয়েছে!

রাত ১১টায় ফোন করলাম প্রিয় ভাবী (মা সমতুল্য) মিসেস রেজা ভাইকে। ভাবীকে বললাম, ‘আমি বাঁচতে চাই, ভাবী আমি উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা যেতে চাই।’ ভাবী এক বাক্যে বললেন, ‘আপনার ভাইকে আমি এখনি বলছি এবং আপনার ভাই আপনার জন্য সর্বোচ্চ করবে, আমি তা জানি। পরক্ষণে মোবাইলে প্রিয় কামাল ভাইকেও বিষয়টি জানালাম। ওনি সাথে সাথে আমাকে আশ্বস্ত করলেন এবং অভয় দিলেন। ততক্ষণে প্রিয় অভিভাবক এয়ার এম্বুলেন্স যোগাড় করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন কামাল ভাইকে সাথে নিয়ে। প্রতিটি মুহুর্তে আমাকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্ঠা চালিয়েছেন তারা। সবার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

১৮ জুন সকাল ৭টায় কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জনাব আনোয়ারুল নাসের স্যার ফোন দিয়ে জানলেন আমার খোঁজখবর। আর আমাকে বললেন, তোমাদের অফিস থেকে এয়ার এ্যাম্বুলেন্স খোঁজা হচ্ছে, সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমি করব।

২০ জুন সারাদিন আমাকে চট্টগ্রামে যে কোন একটি আইসিইউতে নেয়ার জন্য প্রিয় অভিবাবক পাগলপ্রায় ছিলেন। সবার সাথে যোগাযোগ করেই চলেছেন, আমি তা বুঝতে পারছিলাম আর আমার শতভাগ বিশ্বাস ছিল আমার অভিভাবক আমার জন্য কিছু না কিছু করবেনই, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সকাল থেকেই আত্মীয় স্বজনদের উপস্থিতি বেশ টের পাচ্ছিলাম। ততক্ষণে এম্বুলেন্স প্রস্তুত চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য। আশা করেছিলাম সাথে যাবেন আমার স্ত্রীর বড় ভাই, এবং তাকে বেশ ভরসা করেছিলাম। ওনি অন্তত সব চিনেন জানেন, সচেতন মানুষ। মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে অনুরোধ করেছিলাম, ‘ভাই আমার সাথে চলেন। কিন্তু সেদিন কুমিল্লা থেকে তাঁর স্ত্রী উখিয়া আসার ‘বাহানা’ এবং চাকরির বাহানা দিয়ে আর গেলেন না!

মৃত্যু পথযাত্রী হিসেবে চিন্তা করছিলাম এম্বুলেন্সে বসে, কত কিছুই না করেছি এদের (স্ত্রীর বড় ভাই) জন্য। আর আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বললেন, “ভাই তুমি যাও, আমি কাল সকালে আসব।” সেই সকাল এখনও আসেনি। কিন্তুটা আইসিইউতে বসে কান্না করেছি ঘুমের মধ্যে। লোকটা কি করে না এসে পারলেন?

এক অজানার মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামে এম্বুলেন্সে যাত্রা শুরু করেছিলাম। বারবার শহর দিয়ে বের হওযার সময় ভাবছিলাম, এই শহরে আর ফিরতে পারব তো?

চুনতী পর্যন্ত গিয়ে প্রিয় আবু মোর্শেদ ভাই খবর দিলেন সার্জিস্কোপে একটি আইসিইউ পাওয়া গেছে। কিছুটা শান্তি কাজ করছিল। সার্জিস্কোপে পৌছেই আমার সাথে যাওয়া তিনজনই চলে গেলেন নিজেদের হোটেলে, আর আমাকে নিয়ে গেলো হাসপতাল কর্তপক্ষ আইসিইউতে। হাসপতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে অক্সিজেন দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমার সাথে যাওয়া লোকজনের অনুপস্থিতির কারণে আমাকে চিকিৎসা দিতে তিন ঘন্টা বিলম্ব করেছেন। আমার স্ত্রীর বড় ভাই যদি আমার অনুরোধটুকু রাখতেন হয়তো আমি আরো তিনটা ঘন্টা আগে চিকিৎসা পেতাম। যাই হোক, আল্লাহ ওনার মঙ্গল করুক।

পিতৃতুল্য অভিভাবক/বড় ভাই, যে অবদান আমাকে বাঁচানোর জন্য আপনি করেছেন আমি সারাজীবন এই উপকারের কথা মনে ধরে রাখব। মনির ভাই সার্বক্ষনিক সাহস যুগিয়েছেন, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।

ধন্যবাদ ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা সুব্রতদা’কে সার্বক্ষনিক খোঁজ নেয়ার জন্য। কামাল ভাই, মনে থাকবে আপনার অবদানের কথা আমৃত্যু।

চলবে ….

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!