‘জীবন্ত ঈগল গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আযম’

কর্নেল (অব:) মোহাম্মদ আবদুল হক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

বাংলাদেশ যেসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গর্ব করতে পারে সেগুলোর মধ্যে একটি হলো পৃথিবীর সেরা ফাইটার পাইলট হলেন আমাদের দেশের সন্তান। বিশ্বে আকাশযুদ্ধে অদ্যাবধি যত ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে, আমার জানা মতে সে ইতিহাস সৃষ্টিকারীদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আমাদেরই বাংলাদেশের এক ক্ষণজন্মা বীরপুরুষ ফাইটার পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আযম, সিতারা-ই-জুরাত, যিনি ছিলেন আমাদের বাংলাদেশ বিমানবাহিনীরই অত্যন্ত গৌরবান্বিত চৌকস অফিসার। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এত মেধাবী, দুঃসাহসী, নিখুঁত বৈমানিক দ্বিতীয় একজন আছে কি না আমার জানা নেই। তিনি বিমান যোদ্ধাগণের সর্বোচ্চ উপাধি ‘লিভিং ঈগল’ নামেই বেশি পরিচিত।

১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার, ফরিদপুর থানার বনোয়ারিনগর ইউনিয়নের খাগরবাড়িয়া গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম আবুল ওহাব নূরুল আযম ছিলেন পুলিশ অফিসার, মা সামসুন্নাহার। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা প্রয়াত দারাশিকো, তৃতীয় ভাই জাহাঙ্গীর আযম, চতুর্থ ভাই ডা: আলমগীর আযম, পঞ্চম ভাই ডা: সেলিম আযম। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল ফখরুল আযম হলেন তার চাচাতো ও খালাতো ভাই। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমি, রিসালপুরে জিডি ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন এবং কৃতিত্বের সাথে প্রশিক্ষণ সমাপ্তি করে ১৯৬০ সালের ২৬ জুন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট হিসেবে কমিশন লাভ করেন।

সেসনা টি-৩৭ এয়ারক্রাফ্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে তিনি যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর আরিজোনার লুক এয়ার বেইজে এফ-৮৬ সেবর এয়ারক্রাফ্ট চালনায় প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে তার বদলি হয় ঢাকা কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে। অতঃপর তিনি টি-৩৩ ফাইটার প্লেনের প্রশিক্ষক হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের মৌরি এয়ার বেইজে বদলি হন। এখানে কর্মরত অবস্থায় ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তিনি ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কয়েকটি বিমান, বহু সাঁজোয়া যান ও কামান ধ্বংস করে অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসীকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেন। পাকিস্তান সরকার তার এ বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘সিতারা-ই-জুরাত’ খেতাবে ভূষিত করেন।

বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ফাইটার পাইলট যিনি চারটি দেশের অর্থাৎ পাকিস্তান, ইরাক, জর্দান ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তিনি একাই চারটি ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করে বিশ্বের ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেন এবং ইরাক ও জর্দান বিমানবাহিনীর সর্বোচ্চ খেতাব যথাক্রমে ‘নওয়াত আল সুজাত’ ও ‘উইসাম আল ইসতিকলাল’-এ ভূষিত হন। সর্বোচ্চ সংখ্যক যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার কৃতিত্বের জন্য তাকে অন্যতম খেতাব ‘লিভিং ঈগল’ প্রদান করা হয়। পৃথিবীর ২২ জন ‘লিভিং ঈগলের’ মধ্যে তিনি হলেন অন্যতম। শুধু বিমানবাহিনীই নয়, তিনি বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে সর্বাধিক সম্মানজনক ও বীরত্বসূচক খেতাব অর্জনকারী ব্যক্তিত্ব।

স্বাধীনতার পর ডিরেক্টর অব ফ্লাইট সেফটি অফিসার হিসেবে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। অতঃপর ‘ডিরেক্টর অব অপারেশন’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি উইং কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি পান এবং বিমানবাহিনীর ‘ঢাকা বেজ কমান্ডার’ হন। ১৯৮০ সালে তিনি গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

অবসরে আসার পর তিনি বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ ও চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে পাবনা-৩ আসনের (চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর রাজনীতি হতে অবসর গ্রহণ করে তিনি ‘নাতাশা ট্রাভেল এজেন্সি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন আগাগোড়া অত্যন্ত ভদ্র-নম্র, মার্জিত, বিনয়ী ও অমায়িক গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তিত্ব। কিন্তু রাজনৈতিক ও হিংসা-বিদ্বেষের কারণে এ দেশ ও জাতি তাকে যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মানিত করতে পারেনি।

এ মহান ব্যক্তিত্ব ১৪ জুন বেলা ১টায় ঢাকা সিএমএইচে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দেশ হারাল দেশের মুখ উজ্জ্বলকারী এক অসাধারণ বীর সেনানীকে। তিনি রেখে যান স্ত্রী নিশাত আরা আযম, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি এবং তাঁরই নিকট ফেরত যাবো। মহান ও পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে ক্ষমা করুন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সুত্র : নয়াদিগন্ত