‘আকাশের ঈগল’ সাইফুল আজম

সৈয়দ আবদাল আহমাদ
জ্যেষ্ঠ্য সাংবাদিক

আকাশ কাঁপানো এক যোদ্ধা তিনি। ঈগল পাখির মতোই ক্ষীপ্র ও সাহসী। ঈগলের মতোই ছিল তাঁর চোখের দৃষ্টি। ঝড় এলে ঈগল যেমন ঝড়ের বেগকে কাজে লাগিয়ে উপরে উঠে যায়, তেমনি তিনিও বিপদ এড়িয়ে যেতেন না। একে মোকাবেলা করেই জয় ছিনিয়ে আনতেন। তিনি আমাদের কিংবদন্তি আকাশ যোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম।

এতদিন তিনি ‘লিভিং ঈগল’ হিসেবে বেঁচে ছিলেন।রোববার সিএমএইচ-এ ৭৯ বছর বয়সে লড়াকু এ আকাশ যোদ্ধার জীবন প্রদীপ নিভে যায়। তিনি এখন ঘুমিয়ে আছেন বি এফ শাহীন কবরস্থানে। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই আমার এ লেখা।

সরকারি দায়িত্ব পালনকালে প্রধানমন্ত্রীর অফিস ও সংসদ ভবনে কয়েকবারই তাঁকে দেখেছি এবং তাঁর সাথে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। চমৎকার মানুষ। খুবই অমায়িক ও বিনয়ী। কতটা চৌকস, চেহারাই বলে দেয়। শৌর্য আর বীরত্বের কথা তাঁর মুখেই শুনেছি। কী অপূর্ব নৈপুণ্যতায় ইসরায়েলি চার চারটা বিমান তিনি ঘায়েল করেন, সেটা ছিল এক কিংবদন্তির যুদ্ধগাথা। আমার সহকর্মী ও বন্ধু লে. আবু রুশদের কাছ থেকেও তাঁর জীবনের অনেক গল্প শুনেছি। লে. রুশদ-এর Defence Journal এ তাঁকে নিয়ে পড়েছি। পাকিস্তানের বিখ্যাত ডন পত্রিকা তাঁকে ‘কিংবদন্তি যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ডনের আরেক নিবন্ধে বলা হয়েছে, তিনি ‘মাস্টার অব স্কাই’। বন্ধুদের সাথে সে গল্পই আজ শেয়ার করতে চাই।

১৯৪১ সালে পাবনার খগবাড়িয়ায় জন্ম। বাবার চাকরির সুবাদে কলকাতায় কাটে তাঁর শৈশব। মাধ্যমিক স্তর শিক্ষা শেষ করে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানে উচ্চতর শিক্ষার জন্য যান। আকাশে উড়ার টান থেকে বিমান বাহিনীতে যোগ দেয়া। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬০ সালে পাইলট অফিসার হিসেবে শিক্ষা শেষ করে কমিশনপ্রাপ্ত হন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রে এবং পরে করাচির মৌরিপুর, যা এখন মাশরুর এয়ারবেস, সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।

তারও আগে ১৯৬১ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার লুক এয়ারফোর্স থেকে সেসনা-৩৭ বিমান নিয়ে প্রশিক্ষণ নেন এবং সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় তাকে সেখানে ‘টপ গান’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

'আকাশের ঈগল' সাইফুল আজম

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ বাঁধলে তাকে ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রনে নিয়োজিত করা হয়। যুদ্ধে অংশ নিয়েই ভারতীয় বিমান বাহিনীর চৌকস ফাইটার বিজয় মহাদেবের জঙ্গি বিমান পাকড়াও করে ভূপাতিত করেন এবং বিজয় মহাদেবকে আটক করেন। এ সাহসিকতার জন্য তিনি ভূষিত হন পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব সিতারাই জুরাতে। ১৯৬৬ সালে রয়্যাল জর্দানিয়ান বিমান বাহিনীতে দুজন পাকিস্তানি অফিসারকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়। এর একজন ছিলেন সাইফল আজম। ১৯৬৭ সালে তৃতীয় আরব-ইসরায়েল ৬ দিনের এক যুদ্ধ বাঁধে। ইসরায়েলিরা বোমাবর্ষণ করে এ সময় মিশরীয় সব যুদ্ধ বিমান অচল করে দেয়। তখন জর্দানের মূল এয়ারবেস মাফরাকের প্রতিরক্ষায় সাইফুল আজমকে ডাকা হয়। তিনি হকার হান্টার বিমান নিয়ে আকাশে উড়েন। ইসরায়েলের আক্রমণের আগেই অসামান্য দক্ষতায় উন্নত প্রযুক্তির ইসরায়েলি দুটি মিরাজ ফাইটারকে ভূপাতিত করেন।

এর দুদিন পরেই জরুরিভাবে তাকে ইরাকে বদলি করা হয়। তিনি ইরাকের বিমান বাহিনীর হয়ে আকাশে উড়েন এবং ডগ ফাইট করে ইসরায়েলি বিমান ঘায়েল করেন। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন জায়গায় চারটি ইসরায়েলি বিমান ধ্বংস করে বীরত্বের বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করেন। এখন পর্যন্ত একক ব্যক্তি হিসেবে এটা বিশ্বে রেকর্ড। এজন্য তাঁকে জর্দানের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব হুসাম-ই-ইস্তিকলাল এবং ইরাকি সাহসিকতা পদক নুত আল সুজাতে ভূষিত করা হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্য সব অর্জনের জন্য ২০০১ সালে মার্কিন বিমান বাহিনী বিশ্বের ২২ জন লিভিং ঈগলের একজন হিসেবে তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। তিনি একমাত্র সামরিক পাইলট, যিনি চারটি বিমান বাহিনী বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্দান ও ইরাকে কাজ করেছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর সময় তিনি পাকিস্তানে কর্তব্যরত ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই তিনি বাঙালি সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল করাচি থেকে জেট বিমান ছিনতাই করে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবেন। এর অংশ হিসেবে পরিবার পরিজন ঢাকায় পাঠিয়ে দেন আগেই। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা টের পেয়ে যায়। তাঁর ওপর উড্ডয়ন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর টি-৩৩ জঙ্গি বিমান নিয়ে পালিয়ে গেলে এবং শহীদ হলে পাকিস্তানিরা তাঁকে রিমান্ডে এবং ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বন্দী করে রাখে। এরপর তিনি দেশে ফিরতে সক্ষম হন।

১৯৭৭ সালে তাঁকে উইং কমান্ডার এবং ঢাকা বিমান ঘাঁটির অধিনায়ক করা হয়। ১৯৭৯ সালে গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে তিনি অবসর নেন।

১৯৯১ সালে পাবনা-৩ আসন থেকে বিএনপির টিকেটে এমপি নির্বাচিত হন।

ফিলিস্তিনিদের কাছে সাইফুল আজম একজন হিরো। মৃত্যুর পর তাদের প্রতিক্রিয়ায় সেটা আবার প্রমানিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ওসামা আল আসকামা বলেন, তিনি ছিলেন একজন মহান বৈমানিক। সেদেশের অধ্যাপক নাজি শৌকরির টুইটে বলা হয়, সাইফুল আজম ফিলিস্তিনকে ভালোবাসতেন এবং জেরুজালেমের জন্য লড়াই করেছেন। এটা আল আকসা মসজিদ রক্ষায় অংশীদার ছিল।

সেখানকার সাংবাদিক তামির আল মিশালের ভাষায় তিনি ‘আকাশের ঈগল’।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমাদের এই লেখাটি তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া।