জুমাতুল বিদা’র খুতবায় যা বললেন রিদওয়ানুল কাবীর

রিদওয়ানুল কাবীর, খতিব
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

আলহামদুলিল্লাহ, সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ, এটি মহান আল্লাহর পবিত্র অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠতম মাস রমাদানের শ্রেষ্ঠতম দিন জুমাবারের শ্রেষ্ঠতম সময় সালাতুল জুম’আর পূর্বে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম স্থান আল্লাহর ঘর মসজিদে বসার তাওফিক দিয়েছেন। শ্রেষ্ঠতম কিতাব আল কুরআন থেকে এবং শ্রেষ্ঠতম সর্বশেষ রাসুল মুহাম্মদের (সাঃ) হাদীস ও সুন্নাহ নিয়ে আলোচনা করার, শোনার তাওফিক দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

আল্লাহর ঘরের সম্মানিত মেহমানবৃন্দ,
আজ আমরা সময়ের শ্রেষ্ঠ নেয়ামত মাহে রমাদানুল মুবারকের শেষ প্রান্তে এসে উপস্থিত হয়েছি। এটি এ বছরের রমাদানের সর্বশেষ জুম্আ, যা জুমা’আতুল বিদা নামে পরিচিত।

সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ,
সময় এখন আত্মবিশ্লেষণ এবং আত্মবিচারের। রমাদানের এই সুমহান নিয়ামতকে আমরা কে কতটা ধারণ করে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযম চর্চা করতে পেরেছি। কতটা তাক্বওয়াবান হতে পেরেছি রমাদানের দেয়া সবক অনুসারে?

আল্লাহ যেখানে রমাদানের আলোচনা শুরু করেছেন সুরা বাকারার ১৮৩ নাম্বার আয়াতে এবং যেখানে রমাদানের কথা শেষ করেছেন সুরা বাকারার ১৮৭ নাম্বার আয়াতে, দু জায়গাতেই শুরু এবং শেষ প্রান্তে সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য বলা হয়েছে, তাক্বওয়া তথা আল্লাহভীতি অর্জন। আমরা কি কাংখিত তাক্বওয়া তথা আল্লাহ ভীতি অর্জন করতে পেরেছি? যেভাবে আল্লাহ তা’আলা সূরা আলে ইমরানের ১০২ নাম্বার আয়াতে বলেছেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ ﴿۱۰۲﴾
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা মুসলমান হওয়া ছাড়া মারা যেও না।

যাঁরা তাক্বওয়ার সবক নিয়েছি, তাক্বওয়া চর্চা করেছি, যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে আল্লাহভীতি ও আল্লাহর প্রেমকে সামনে রেখেছি তাঁদের পুরষ্কার সম্পর্কে আল্লাহ সূরা মারয়ামের ৬৩ নাম্বার আয়াতে বলেন,
تِلۡکَ الۡجَنَّۃُ الَّتِیۡ نُوۡرِثُ مِنۡ عِبَادِنَا مَنۡ کَانَ تَقِیًّا ﴿۶۳﴾
সেই জান্নাত, আমি যার উত্তরাধিকারী বানাব আমার বান্দাদের মধ্যে তাদের যারা মুত্তাকী।

সম্মানিত রোজাদার মুসল্লীবৃন্দ,
রামাদানের সিয়াম আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে মহান রবের দেয়া পুরষ্কার নিতে, যেভাবে হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” مَا مِنْ حَسَنَةٍ عَمِلَهَا ابْنُ آدَمَ إِلَّا كُتِبَ لَهُ عَشْرُ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ، قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي، وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِي، الصِّيَامُ جُنَّةٌ. لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ. وَلَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْكِ “

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসুলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে কোন নেক কাজ আদম সন্তান করে না কেন তার জন্য দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বর্ধিত করে সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হয়।

কিন্তু আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, সাওম (রোযা) ব্যতীত, যেহেতু সাওম (রোযা) আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দিব। সাওম (রোযা) পালনকারী আমারই কারণে স্বীয় কামভাব এবং পানাহার পরিত্যাগ করে। সাওম (রোযা) পালনকারীর জন্য সাওম (রোযা) ঢাল স্বরূপ। সাওম (রোযা) পালনকারীর জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে- তার ইফতারের সময় এবং তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। আর সাওম (রোযা) পালনকারীর (ক্ষুধাজনিত কারণে নির্গত) মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহ তা’আলার কাছে কস্তূরীর সুগন্ধি থেকেও অধিক পছন্দনীয়।
সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২২১৫

আমরা কি রমাদানের হক্ব আদায় করতে পেরেছি? আমাদের সিয়ামগুলো কি মিথ্যা, গীবত, প্রতারণা, পরনিন্দা মুক্ত ইখলাসপূর্ণ সিয়াম হিসেবে আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছি?

রমাদান এসেছে হাজার মাসের শ্রেষ্ঠতম রাত লাইলাতুল কদর নিয়ে, আমরা কি লাইলাতুল কদরকে মূল্যায়ন করে নিজেকে ইবাদাতে বিলিয়ে দিয়ে এই রাতের সুসংবাদ আর পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য করে তুলেছি নিজেকে?

রমাদান এসেছিল শ্রেষ্ঠতম নফল নামাজ, মহান রবের অতি পছন্দের তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগ নিয়ে, আমরা কি তাহাজ্জুদে সময় দিয়ে সিজদায় পড়ে শেষ রাতে অশ্রুবিগলিত নয়নে গুনাহ মাফ চেয়েছি?

পবিত্র রমাদান হচ্ছে স্পেশালি কুরআনের মাস। আল্লাহ রমাদানকে সুরা বাকারাতে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন কুরআন দিয়ে, কুরআন নাজিলের মাস বলে। কুরআন অবতরণের এই মাসে আমরা কতটা সময় দিয়েছি কুরআনকে? কতটা তিলাওয়াত করেছি, কতটা চেস্টা করেছি আমার কাছে আমার রবের দেয়া চিঠি এ মহান গ্রন্থ বুঝার?

প্রিয় মুসল্লীবৃন্দ,
আত্ম-জিজ্ঞাসার আঘাতে নিজেকে জর্জরিত করুন। অল্প দুদিন সময় বাকি আছে এ মর্যাদাপূর্ণ মাসের। তাওবায় মনোনিবেশ করুন। খাটি তাওবা করে নিজেকে জান্নাতের মেহমান বানিয়ে নিন। দুটো দিন রাতে নফল, তিলাওয়াতে, দানে, জিকিরে নিজকে ব্যস্ত রাখুন। ইফতারীর পূর্বে কিংবা তাহাজ্জুদে কাদুঁন, অশ্রু ঝরিয়ে মাফ চান, তাওবা করুন। নিজের জন্যে, পরিবার, সমাজ, রাস্ট্র সর্বোপরি সারা উম্মাহর জন্যে নিরাপত্তা চান, রহমত চান। করোনাভাইরাস জনিত বিপর্যয় থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান। আল্লাহ ফিরাবেন না আমাদের।

যথাযথভাবে সাদকাতুল ফিতর আদায় করুন। পাশের অভাবীজনের খোঁজ নিন।

যদি রমাদানের হক্ব আদায় করতে না পারি তবে ফিরিশতাদের দলনেতা হজরত জিব্রাইলের বদ দু’আ করা এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আমীন বলা অনুসারে আমরা হবো কপালপোড়া জাহান্নামের কয়েদী।

আর যদি এই মুবারক মাসে মহান রবকে ইখলাসপূর্ণ ইবাদাত দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি, যদি রমাদানের শিক্ষায় জীবন আলোকিত করতে পারি, তবে জান্নাতের আটটি দরজায় আমাদের সম্মানিত মেহমান হিসেবে স্বাগত জানানো হবে। আমরা হবো চিরস্থায়ী সফলকাম জান্নাতী।

আল্লাহ আমাদের সিয়াম ক্বিয়াম এবং আমলে সালিহাতগুলো কবুল করুন, আমাদের জন্যে রহমত, বরকত, নাজাত আর মাগফিরাতের ফয়সালা করুন। আমীন।
(সংক্ষেপিত)

রিদওয়ানুল কাবীর, কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জামে মসজিদের খতিব। একজন আইনজীবী ও ব্যবসায়ী।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!