‘সেনাবাজারে’ বিনামূল্যেই মিলল সবধরণের খাদ্য, খুশি হাজারো অসহায় মানুষ

‘সেনাবাজারে’ বিনামূল্যেই মিলল সবধরণের খাদ্য, খুশি হাজারো অসহায় মানুষ

মহিউদ্দিন মাহী, প্রধান প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

একটি বাজার, যে বাজারে কাঁচা তরকারি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ধরণের নিত্যপণ্য রাখা আছে। যে যার মতো করে প্রতিটি পণ্য ঢুকিয়ে নিচ্ছেন বাজার ব্যাগে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ ও কাঁচা তরকারি নিলেও কারও কোন টাকা-পয়সা দিতে হচ্ছে না তাদের।

করোনাভাইরাসের এই কঠিন সময়ে এ যেন কর্মহীন অসহায় মানুষদের মিলন মেলা বসেছে সেখানে।

খোলা আকাশের নিচে কক্সবাজার শহরের শেখ কামাল ষ্টেডিয়ামে এই বাজার বসিয়েছিলো ১০ পদাতিক ডিভিশনের রামু ক্যান্টেনমেন্টের সেনাবাহিনী। এই বাজারটির নাম দেয়া হয়েছে ‘সেনাবাজার’। শুধু বাজার নয়, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাও দিয়েছে সেনাবাহিনী।

শুক্রবার (২২ মে) কক্সবাজার শেখ কামাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে করোনাভাইরাসের কঠিন সময়ে সামাজিক দূরুত্ব নিশ্চিত করে বিশেষ ধরণের জীবাণুনাশক টানেল স্থাপন করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে এই বাজার শুরু হয়ে দুপুর পর্যন্ত চলে এই ‘সেনাবাজার’।

সংক্রামক রোগ করোনাভাইরাসের কারণে একদিকে লকডাউন, অন্যদিকে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাতের কারণে কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা তাদের উৎপাদিত সবজি বাজারে বিক্রি করতে পারেননি, সেনাসদস্যরা সরাসরি সে সকল কৃষকদের কাছ থেকে সবজি কিনে এই বাজারে নিয়ে আসেন।

একদিকে অসহায় মানুষদের পাশাপাশি কৃষকরাও তাদের সবজির ন্যায্যমূল্য পেয়ে উপকৃত হয়েছেন। এছাড়াও ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে এ ধরণের ব্যতিক্রমি কাজের উদ্যোগ অসহায় মানুষের জন্য যেমন ঈদের বোনাসের মতো তেমনি কৃষকদের জন্যও ঈদের উপহার বলে মনে করছেন অনেকেই।

এই সেনাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী, যেমন- চাউল, আটা, তেল, লবণ, ডাল এবং বিভিন্ন ধরণের সবজি পেয়েছেন কক্সবাজার শহরের এক হাজার পরিবার। এছাড়াও ওই সময় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ সামগ্রী দেয়া হয় প্রায় ২০০ জন মানুষকে।

যারা অভাবি মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় বাজার কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সংগ্রহ করেছেন এই বাজারে।

বাজার করতে আসা কলাতলীর একটি হোটেল কর্মচারী লিয়াকত কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে জানান, করোনার কারণে সব ধরণের কাজ বন্ধ থাকায় নিজের জমানো যে অর্থ ছিল তা অনেক আগেই শেষ, বর্তমানে ধার দেনা করে সংসার চলছে। আজ সেনা বাজার থেকে চাল, আলু, বরবটি, কচুর লতি, কাঁচামরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।

আবার কানের ব্যথায় গত এক সপ্তাহ যাবৎ তিনি কষ্ট পাচ্ছিলেন, আজ এখানে সেনা মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখিয়ে ফ্রী ওষুধও পেয়েছেন।

তিনি জানান, ঈদের আগে সেনাবাহিনীর এ ধরণের কার্যক্রম তাদের মতো অসহায়দের ঈদের আনন্দকে উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে।

কথা হয় কক্সবাজার সৈকতের ফটোগ্রাফার হাসান আলীর সাথে। ৩৫ হাজার টাকায় কেনা একটি ক্যানন ব্র্যান্ডের সেমি ডিএসএলআর ক্যামেরাই তার ৫ জনের পরিবারের আয়ের একমাত্র মাধ্যম।

‘সেনাবাজারে’ বিনামূল্যেই মিলল সবধরণের খাদ্য, খুশি হাজারো অসহায় মানুষ

তিনি কক্সবাজার ভিশন ডটকমকে জানান, পর্যটন নগরী কক্সবাজারে সারাবছরই পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকতো। ঈদের সময় পর্যটকদের আনাগোনা আরো বেড়ে যায়। বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে কোন টুরিস্ট গত প্রায় তিনমাস যাবত কক্সবাজারে না আসায় তার মতো স্বল্পআয়ের মানুষদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। ঈদের সময় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আয়োজিত এই সেনা বাজার তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।

পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখন সেও ঈদের উৎসবে শামিল হতে পারবে বলেও জানান এই ফটোগ্রাফার।

রামু সেনানিবাসে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক দিকনির্দেশনায় সেনাবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে অসহায় এবং প্রান্তিক আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রাকে সহজ করার জন্য রামু সেনানিবাসের তত্ত্বাবধানে এই ধরণের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অদূর ভবিষ্যতে উপজেলা পর্যায়েও এ ধরণের বাজারের আয়োজন করা হবে।

সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজন উপলক্ষে রামু সেনানিবাসের কর্মকর্তাবৃন্দ ও সেনাসদস্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, কক্সবাজার জেলা ও চট্টগ্রাম জেলার ৪টি উপজেলায় গত ২৪ মার্চ থেকেই মাঠে আছে সেনাবাহিনী। টহল কার্যক্রমসহ করোনার ভয়াবহতার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং মাস্ক বিতরণ করছেন তারা। এছাড়া নিজেদের রেশন বাঁচিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল, তেল, আলু, পেঁয়াজ ও সাবানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী কর্মহীন অসহায় পরিবারের মানুষগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছেন।

বর্তমানে তারা ঘূর্ণিঝড় আম্ফান উপদ্রুত এলাকাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বাঁধ পুনঃনির্মাণে স্থানীয়দের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জনসাধারণকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার জন্য সেনাবাহিনীর ১০টি মেডিক্যাল টিম বৃহস্পতিবার (২১ মে) থেকে একযোগে কাজ করছে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!