স্মৃতিকথা

স্মরণে পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন (রঃ)

বায়তুশ শরফের পীর কুতুব উদ্দিন আর নেই

মুহাম্মদ শামসুল হক শারেক, সাংবাদিক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

‘মওতুল আলেমে মওতুল আলম’ একজন আলেমের মৃত্যু যেন গোটা দুনিয়ার মৃত্যু। দেশবরেণ্য আলেমে দ্বীন, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির-মুজাদ্দিদ পীর সাহেব বায়তুশ শরফ, বাহারুল উলুম আল্লামা কুতুবউদ্দিন হুজুর মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পীর সাহেব হুজুর নেই, তা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু মেনে নিতে হচ্ছে মহান রবের বিধান। ‘কুল্লু নফসিন যায়িকাতুল মওত’- প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হুজুরকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন, আমিন।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের কথা। তখন জানুয়ারী মাসব্যাপী চলেছে বিরোধী জোটের টানা অবরোধ। আবার কোন সময় দেশব্যাপী হরতাল এবং কোন সময় চলেছে স্থানীয়ভাবে হরতাল। এর মাঝেও থেমে যায়নি বায়তুশ শরফের দু’দিন ব্যাপী মাহফিলে ইসালে ছওয়াবের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যেই ৩০ জানুয়ারী পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন মুদ্দাজিল্লাহুল আলী কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সে এসে পৌঁছান।

কক্সবাজার অঞ্চলের বৃহত্তর এই ইসলামী মাহফিল শুরু হয় ৩০ জানুয়ারী বিকেল থেকে। প্রতিবছর এই সময়ে কক্সবাজার বায়তুশ শরফের দু’দিন ব্যাপী এই মাহফিলকে ঘিরে কক্সবাজারের সর্বত্র পড়ে যায় সাজ সাজ রব। কক্সবাজার এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই মাহফিলে যোগদান করেন হাজার হাজার দ্বীনদার মুসলমান। মাহফিলের শেষের দিন লক্ষাধিক মানুষ এই মাহফিলে অংশ গ্রহণ করে থাকেন।

কবি কতই না সুন্দর করে বলেছেন, ‘আগর গিতি সরাসর বাদ গি-রদ, চেরাগে মুকবিলাঁ হারগিজ নমি-রদ’ আল্লাহর অলীরা আন্তরিকতা ও খুলুসিয়াতের সাথে কোন আলো জ্বালালে যত ঝড় তুফানই আসুক তা কক্ষনো নিবে না। বায়তুশ শরফের প্রাণপুরুষ মরহুম পীর সাহেব আল্লাহর অলী আল্লামা আব্দুল জব্বার হুজুর (রঃ) ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে কক্সবাজার বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠা করেন। আজ এই প্রতিষ্ঠান ফুলে-ফলে সু-শোভিত। আল্লাহর অলী আল্লামা আব্দুল জব্বার হুজুরের জ্বালানো (কক্সবাজারসহ) বায়তুশ শরফের এই মশাল দীপ্তিময় থাকবে, আলো ছড়াবে অনন্তকাল।

৩০ জানুয়ারী সরেজমিনে বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স ঘুরে দেখতে গিয়ে দেখা গেছে, মাহফিলের প্রস্তুতি চলছিল রাতদিন। মসজিদ কম্পাউন্ড ও হাইস্কুল মাঠে আলাদা দু’টি প্যান্ডেল ও মাহফিলে অংশ গ্রহণকারীদের বসা ও থাকা খাওয়াসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ এগিয়ে চলছে। আশপাশের কয়েকটি বিল্ডিংয়ের ছাদে মহিলাদের জন্য করা হয়েছে আলাদা আলাদা প্যান্ডেল। দেখা গেছে, ঘুরে ঘুরে মাহফিলের প্রস্তুতি তদারক করছেন কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক সিরাজুল ইসলাম। তিনি আমাকেও তাঁর সাথে নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত মাহফিলের বিভিন্ন প্রস্তুতি দেখাশুনা করেন। সিরাজ স্যারের বিচক্ষণতার প্রশংসা করতে হয়। এত বড় মাহফিল সুন্দর-সুশৃঙ্খল এবং নিখুঁত করার ব্যাপারে খুব ছোট কোন বিষয়ও তাঁর নজর এড়াতে দেখা যায়নি।

স্মরণে পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন (রঃ)

সিরাজ স্যার জানান, ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ক্বাদেরিয়া ত্বরিকার প্রাণপুরুষ হযরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর (রঃ) স্মরণে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজ দাহুম’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে কক্সবাজার বায়তুশ শরফে। হুজুরের রূহানী ফুয়োজে আজ কক্সবাজার বায়তুশ শরফ দৃশ্যমান উন্নয়ন ছাড়াও রূহানী তায়ালিমের এক পাদপীঠ। শিরক, বেদায়াত মুক্ত বায়তুশ শরফের পরিবেশ। এখানে মসজিদ, এতিমখানা, হেফ্জখানা, চক্ষু হাসপাতাল, পাঠাগার ও একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং কুতুবউদ্দিন আদর্শ মাদরাসা মিলে এখন এক বিশাল কমপ্লেক্স কক্সবাজার বায়তুশ শরফ।

তিনি আরও জানান, প্রতিবছর হাজার হাজার আল্লাহর বান্দা এখানে এসে ত্বরিকতের সবক নিয়ে ঈমান পরিশুদ্ধ করে থাকেন। তাই এখানে মহান আল্লাহর রহমত ও বরকত নাযিল হয়। হরতাল অবরোধ সত্ত্বেও এবারো লাখো ঈমানদার মুসলমান এই মাহফিলে অংশ গ্রহণ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, আলেম ছাড়া পীর-মুর্শিদ হওয়ার কোন যুক্তি নাই। বায়তুশ শরফের পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন। তিনি কুরআন-হাদিস এবং ইসলামী শরিয়াহ ও আধুনিক পরিবেশ জ্ঞানসমৃদ্ধ বলেই বাহারুল উলুম খ্যাতি লাভ করেন। তাই নিজে আধুনিক শিক্ষিত হয়েও তাঁকে পীর-মুর্শিদ মানতে তিনি গর্ববোধ করেন। তখন আমার মনে পড়ে যায়, ‘ফকিহুন ওয়াহিদুন আশদ্দু আলাশ শায়তানে মিন আলফি আবেদী’ শয়তানের মোকাবেলায় একজন ইসলামী শরিয়াহ বা ফিক্হ জানা আলেম ইসলামী শরিয়াহ না জানা হাজারো ইবাদত গুজার পীর/ব্যক্তির চেয়ে অধিক শক্তিশালী’।

এর পাশাপাশি চলছিল পীর সাহেব হুজুরকে স্বাগত জানানোরও প্রস্তুতি। হরতালের মাঝেও দুপুর ১টার দিকে বায়তুশ শরফের বর্তমান প্রাণপুরুষ পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন মুদ্দাজিল্লাহুল আলী বায়তুশ শরফ ক্যাম্পাসে এসে পৌছাঁলে কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ও স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক মিলে হুজুরের শত শত ভক্তরা তাঁকে স্বাগত জানান। এসময় দেখা গেল, গাড়ি থেকে নামতেই কয়েকজন হুজুরের পায়ে পড়ে সালাম করছিল। দেখা গেল, সিরাজুল ইসলাম সাহেব হুজুরকে ভক্তি শ্রদ্ধাভরে সালাম করতে গিয়ে হুজুর ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। অন্য একজন পায়ে পড়ে সলাম করতে গিয়ে হুজুর তার পেটে সজোরে ঘুষি দিলেন। একইভাবে সালাম করতে গিয়ে অন্য একজনকে থাপ্পড় দিয়ে সরিয়ে দিলেন তিনি। অন্য একজন পায়ে পড়ে সালাম করতে যাবে এসময় এগুলো ফালতু কাজ বলে তাকে সরিয়ে দিয়ে হুজুর তাঁর নির্দিষ্ট কক্ষে (দু’তলায়) উঠে গেলেন।

তখন আমি হুজুরের পাশেই ছিলাম। এই বিষয় গুলো দেখে পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন মুদ্দাজিল্লাহুল আলীর প্রতি আমার ভক্তি শ্রদ্ধা অনেক গুণ বেড়ে যায়। আমার আস্থা আরো দৃঢ় হল, সত্যিই তিনি পারবেন কুফরি, শিরক-বেদায়াতসহ সব ধরণের অজ্ঞতা ও ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ড প্রতিরোধ করতে। পারবেন তিনি বায়তুশ শরফকে শিরক-বেদায়াত মুক্ত রাখতে। বর্তমান যুগের এই কঠিন পরিবেশে মহান আল্লাহ তাঁকে একজন খাটি মুজাদ্দিদের ভূমিকা পালন করার তৌফিক দিন। আমীন।

বায়তুশ শরফ একটি অরাজনৈতিক সেবামূলক ও ইসলাম প্রচারের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান মানবতার সেবায় নিয়োজিত। রাসুল পাকের (সঃ) যোগ্য ওয়ারেছ আল্লামা মীর মুহাম্মদ আখতর (রঃ) ও আল্লামা শাহ আব্দুল জব্বারের (রঃ) রূহানী তওয়াজ্জুতে আল্লাহর আরেক অলী আল্লামা কুতুব উদ্দিন দামাত বরকাতুহু আজ এই বাগানের হাল ধরেছেন। এখানে সকল মত ও চিন্তা চেতনার দ্বীনদার মুসলমান ছাড়াও হিন্দু-বৌদ্ধ, রাখাইনসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমাগম দেখা যায়। তাই প্রতিবছর ৩০/৩১ জানুয়ারীর এই মাহফিলে হয় লাখো মানুষের মিলন মেলা।

মাহফিলের শেষের দিন বাদ মাগরিব ছিল পীর সাহেব হুজুরের বয়ান। হাজার হাজার ভক্ত-অনুরক্ত দ্বীনদার মুসলমান অধীর আগ্রহে তাঁর বয়ান শুনছিলেন। আমিও বসে পড়লাম তাঁদের সাথে এক কোণায়। কিন্তু এত হাজার হাজার মানুষের মাঝেও সিরাজ স্যার এবং ফরিদ সাহেবের নজর এড়ায়নি। তাঁরা ঠিকই আমাকে দেখে ফেলেন। সিরাজ স্যার আমাকে তাঁর পাশে চেয়ার দিয়ে বসাতে চাইলে আমি না করে দিয়ে আমার মত করে বসে হুজুরের বয়ানের প্রতি মনযোগ দিলাম। দৈনিক কালের কণ্ঠের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার আমার অত্যন্ত আস্থাভাজন সাংবাদিক তোফায়েল আহমেদ ছিলেন মাহফিলের মিডিয়া সেলের দায়িত্বে। তিনি এসে আমাকে বললেন, কিছু নোট করার জন্যে। তখন বায়তুশ শরফ দরবারের খাদেম ছোট ভাই শহিদু একসিট কাগজসহ একটি বোর্ড দিয়ে আমাকে বলে- আপনার কষ্ট হচ্ছে এখানে লিখেন। পরে জানতে পারলাম, তোফায়েল সাহেব বিকল্প হিসেবে আরো একজনকে হুজুরের বক্তব্য নোট করার দায়িত্ব দেন। তাঁর কয়েকটি পয়েন্ট একসাথে বসে নিউজ করার সময় কাজে লেগেছে।

পীর সাহেব আল্লামা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (ম.জি.আ) তাঁর বক্তব্যে বলেন, পৃথিবীতে সকল ইসলামী কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে রাসুল পাকের (সঃ) সোনার মদিনা। বায়তুশ শরফের এই ইসলামী খেদমত রাসুল পাকের (সঃ) সোনার মদিনার সাথে সম্পৃক্ত। তাই আজকে বায়তুশ শরফ সিলসিলার এই বিশাল কর্মকান্ড ফুলে ফলে সু-শোভিত। তিনি একটি ফার্সী কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আগর ফেরদাউস বর রুয়ে জমিন আস্ত, হামিন আস্ত হামিন আস্ত হামিন আস্ত’ ভূ-পৃষ্টে যদি কোন ফেরদৌস থেকে থাকে তা এই বায়তুশ শরফকে বললে অত্যুক্তি হবে না।

স্মরণে পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন (রঃ)

একটি হাদিসে কুদসির উদ্ধৃতি দিয়ে বায়তুশ শরফের পীর হযরত আল্লামা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (ম.জি.আ) সেদিন বলেছিলেন, ‘আল্লাহ পাক বলেন, ইযা যকরনি আবদুন ফি নফসিহি যকরতুহু ফি নফ্সি, অইযা যকরনি ফি মলইন যকরতুহু ফি মলইন খাইরুম মিনহু’ কোন বান্দা যদি আল্লাহকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও (আল্লাহ নিজে) তাকে গোপনে স্মরণ করি। আর যদি কোন বান্দা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে-মজলিশে আমাকে (আল্লাহকে) স্মরণ করে (আল্লাহ নিজে) আমিও সেই বান্দাকে তার চেয়ে ভাল করে স্মরণ করি’।

প্রসঙ্গত বায়তুশ শরফসহ দেশের অন্যান্য ইসলামী প্রতিষ্ঠান মসজিদ-মাদ্রাসা-খানাকাহ গুলোতে এভাবেই আল্লাহর জিকির বা আল্লাহকে স্মরণের কাজ হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পীর সাহেব আল্লামা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (ম.জি.আ) আরও বলেন, হুজুর পাকের (সঃ) হুজুরা শরিফ হতে মসজিদে নববির মেহেরাবের মধ্যবর্তী জায়গাটি ‘রিয়াজুল জান্নাত’। আল্লাহ পাক হুজুরের (সঃ) সম্মানার্থে এই জায়গাটিকে বেহেশতের টুকরা ঘোষণা করেন। রিয়াজুল জান্নাত সমস্ত উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য বিশেষ নিয়ামত সমৃদ্ধ একটি উৎকৃষ্টতম স্থান- যেথায় প্রিয় নবী (সঃ) সবচেয়ে বেশী চলাচল করায় মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এই বিশেষ সম্মান দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য স্বচক্ষে দর্শনীয় এবং বিশেষ আকর্ষনীয় হচ্ছে ওই প্রসিদ্ধ স্থান।

তিনি বলেন, রাসুলের (সঃ) নিকট জিজ্ঞাসা করা হয় ‘অমা হিয়া রিয়াজুল জন্নাহ ফি আরদ’ পৃথিবীর মানুষের জন্য রিয়াজুল জান্নাহ কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘অহিয়া হাফলাতুজ জিকির’ বা জিকির মাহফিল গুলো হচ্ছে বিশ্ববাসীর জন্য রিয়াজুল জান্নাহ। বায়তুশ শরফের মাহফিল গুলোতে ওয়াজ নসিহতের পাশাপাশি জিকির মাহফিলকে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।

বায়তুশ শরফের পীর বলেন, আউলিয়ায়ে কেরাম সর্বদা সমগ্র বিশ্বমানবতার কল্যাণে চিন্তা করেন- কাজ করেন এবং শান্তি কামনা করেন। তাই বিশ্ব শান্তি ও মানব কল্যাণের জন্য প্রতিটি মানব সম্প্রদায়ের খোদাভীরুতা ও নবী প্রেম অর্জনের জন্য আউলিয়ায়ে কেরামের সান্নিধ্য লাভের বিকল্প নেই। আউলিয়ায়ে কেরাম মানবাত্মা পরিশুদ্ধির সর্বোৎকৃষ্ট পথপ্রদর্শক। তিনি সকল মানুষকে আলেম ওলামা ও পীর আউলিয়াদের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শনমূলক আচরণ করারও পরামর্শ দেন।

ওই মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন মাহফিল উদযাপন কমিটির আহবায়ক এবং কক্সবাজার বায়তুশ শরফের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। মাওলানা নাছির উদ্দিন, মাওলানা তাহেরুল ইসলাম, মাওলানা সিদ্দিক আহমদ ফারুকি, মাওলানা মামুনুর রশিদ নূরী, মাওলানা নূরুল আলম ফারুকি, ক্বাজী শিহাব উদ্দিন, অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম, মাওলানা শফিক আহমদ ও মাওলানা নুরুল হুদাসহ অর্ধশতাধিক আলেম-ওলামা ও পীর মাশায়েখ মাহফিলে বক্তব্য রাখেন।

কুরআন শরীফে আল্লাহ পাক বলেন, ‘যারা জানে বা জ্ঞানী আর যারা জানে না তারা কি সমান?’ কক্ষনো নয়। তাই পীর সাহেবকে দেখা গেছে ইসলামী শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ আলেম ওলামাদের প্রতি বিশেষভাবে ভক্তি-শ্রদ্ধা পোষণ করতে। আমি লক্ষ্য করলাম, মাহফিলে আগত সব শ্রেণীর মানুষের প্রতি আদর ও মমতাপূর্ণ ব্যবহারের পাশাপাশি আলেম ওলামাদের প্রতি পীর সাহেব হুজুরের অপরিসীম ভক্তি শ্রদ্ধা। তাঁর ওয়াজের মাঝেও দেখা গেছে তাঁর বক্তব্যের পক্ষে আলেম ওলামাদের সমর্থন আদায় করতে। এত বড় মাহফিলেও ওলামাদের মেহমানদারীর প্রতি তাঁর দেখা গেছে তীক্ষ্ণ নজর।

আমি কুমিরা ঘোনাতেও তাঁকে দেখেছি আলেমদের প্রতি বিশেষভাবে সম্বোধন করতে এবং তাঁদের তাঁর আশপাশে রাখতে। কক্সবাজার বায়তুশ শরফেও দেখা গেছে স্টেজে তাঁর চারপাশে অসংখ্য ওলামায়ে কেরামকে।

বায়তুশ শরফের বর্তমান কর্ণধার পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিনের পান্ডিত্ব অবাক হওয়ার মতো। তিনি একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস। স্বভাবজাত কবি-শায়ের। তাঁর রচিত ‘গুলহায়ে আক্বিতদ’ পড়লে বুঝা যায় আরবী, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় তাঁর পান্ডিত্ব ও জ্ঞানের গভীরতা। এ ছাড়াও তাঁর অনেক রচনা আছে যেগুলো তাঁর জ্ঞান গরিমা ও পান্ডিত্বের পরিচায়ক। এজন্য তাঁর আল্লামা এবং বাহারুল উলুম খ্যাতি যথাযথ।

ইতোপূর্বেও পীর সাহেব হুজুরের সাথে আমার আরো একটি স্মৃতির কথা। বায়তুশ শরফে একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন জেলা প্রশাসক গিয়াস উদ্দিন আহমদ ও পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেনসহ অনেক সাংবাদিক এবং সূধীজন উপস্থিত ছিলেন। পীর সাহেব আল্লামা কুতুব উদ্দিন ছিলেন সভার মধ্যমনি। অনেকের বক্তব্যের পর সিরাজ স্যারের অনুরোধে আমি কিছু বলতে দাঁড়িয়েছি। আমি ছিলাম শার্ট প্যান্ট পরা। দাঁড়িয়েই ফার্সি কবিতার একটি চরণ ‘শুনিদম কে দর রোজে উম্মিদ অ বীম, বদাঁরা বনেকাঁ ববখশ্দ করিম’ এই কবিতায় শেখ সাদি বলেন, আমি শুনেছি কিয়ামতের কঠিন সময়ে ভাল মানুষ গুলোর উছিলায় কিছু খারাপ মানুষকেও নাজাত দেয়া হবে’। ভাল মানুষের সংষ্পর্শে গেলে অনেক খারাপ লোকও তাদের উছিলায় মুক্তি পেতে পারে। অর্থাৎ আমি বুঝাতে চাইলাম পীর সাহেব হুজুরের সাথে ভালো কাজে আমার এই সময়টুকু কাল কেয়ামতের ময়দানের কঠিন সময়ে আমার নাজাতের উছিলা হতে পারে।

কবিতার লাইনটি উচ্চারণের সাথে সাথে হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে ‘চোর চোর’ বলে আওয়াজ দিলেন। উপস্থিত সবাই স্তম্বিত হয়ে তাকালেন হুজুরের দিকে। হুজুর হেসে হেসে বললেন, ‘বেশ বদলে শার্ট প্যান্ট পরলে কি হবে বুঝা গেছে শারেক আসলে একজন বড় আলেম’।

দেশ, জাতি ও ইসলামের পক্ষে অবিচল দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র দৈনিক নিয়মিত পড়তেন মরহুম পীর সাহেব বায়তুশ শরফ আল্লামা কুতুবউদ্দিন। দৈনিক ইনকিলাবের সাংবাদিক হিসেবে তিনি খুবই স্নেহ করতেন আমাকে।

সম্ভবত গতবছর কক্সবাজার বায়তুশ শরফ মাহফিলের সময় হুজুরের বক্তব্যের একটা আগাম ড্রাফ্ট করে হুজুরের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানতে চান ওটা কে করেছে। আমি করেছি বলার পরে তিনি বলেন, ‘যথাযথ’।

কয়েক বছর আগে কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সে প্রতিষ্ঠা করা হয় আল্লামা কুতুবউদ্দিন আদর্শ মাদরাসা। ওই মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও ক্লাস উদ্বোধনের শুভ সময়ে হুজুরের সাথে আমারও থাকার সুযোগ হয়েছিল সেদিন।

আমাদের প্রতিষ্ঠিত উখিয়া গয়ালমারা দাখিল মাদ্রাসায় সিরাজ স্যারের মাধ্যমে হুজুরকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার কোন সিডিউল না থাকলেও উখিয়ার কোন একটি কর্মসূচী শেষে হুজুর ঠিকই গয়ালমারা মাদ্রাসায় গিয়ে হাজির হয়ে যান। আমি ছিলাম কক্সবাজারে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অনেকেই কাছে ছিলেন না। এমনকি হুজুরকে আমরা মেহমানদারীও করতে পারিনি। কিন্তু তিনি মাদ্রাসার জন্য দোয়া করেছেন। সেই দোয়ার ফল আমরা পাচ্ছি। আমাদের মাদ্রাসাটি এখন ফলাফলের দিক থেকে উখিয়ার সেরা মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি ছিল বেড়া এবং বাঁশের খুটির, ছাউনী ছিল ছনের। পরবর্তী বছর এক আল্লাহর বান্দা মাদ্রাসাটি সেমিপাকা করে টিনের ছাউনী দিয়ে প্রাথমিক সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন। সর্বশেষ গতবছর মাদরাসাটি এমপিওভূক্ত হয়েছে।

কুরআন হাদিসের উপর কিছুটা পড়ালেখা থাকলেও ত্বরিকতের বিষয়ে আমি ছিলাম বরাবরই উদাসীন। একটি হাদিসে আছে ‘ইত্তাক্বু ফিরাসাতুল মোমেনীন’। আকাইদের কিতাবে আছে, ‘কিরামাতুল অওলিয়ায়ে হাক্বুন’। এই কারণে আলেম ওলামা, পীর দরবেশের কাছে যেতে আমার কেন যেন ভয় লাগে। তাই আমি কোন পীর দরবেশের সামনে, বড় আলেম ওলামাদের সামনে এবং গুণিজনদের সামনে কথা বলতে আড়স্থ হয়ে যাই।

ছাত্র জীবনে একদিন বায়তুশ শরফের মরহুম পীর সাহেব আল্লামা আব্দুল জাব্বার (রঃ) কদমবুছি করতে গিয়ে বিব্রত বোধ করি। তখন আমরা কক্সবাজার বায়তুশ শরফের পুরাতন মসজিদের ২য় তলায় থাকতাম। একদিন হুজুর সফরে আসলে আমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে যাই। হুজুরকে দেখেই আমি আড়স্থ হয়ে পায়ে ধরে সালাম করতে গেলে হুজুর আমাকে হাত দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন। এতে আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। তাই আমি আর কোন আলেম ওলামা এবং পীর সাহেবদের কদমবুছি করি না। অন্য একদিন একইভাবে মরহুম হুজুরের জন্য ওজুর পানি নিয়ে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াই। ওজু করার সময় আমি পানি ঢেলে দিতে চাইলে হুজুর আমাকে নিষেধ করেন। আমি দাঁড়িয়েই থাকলাম। দেখলাম পা ধুতে হুজুরের কষ্ট হচ্ছে তখন পানি ঢেলে দিতে চাইলে তিনি অনুমতি দেন।

দু’দিনের মাহফিলে ক্লান্তির পরও শেষ দিনের শেষ রাতে জিকির মাহফিল বায়তুশ শরফ মাহফিলের বিশেষ আকর্ষণ। শেষ রাতের জিকির এবং জামায়াতে ফজরের নামাজ ও একসাথে মোনাজাতে গগনবিদারী কান্না আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে যাবারই লক্ষণ।

মাহফিলে উপস্থিত লাখো ঈমানদার মুসলমান কেউ কারো মায়ের পেটের আত্মীয় নয়। কিন্তু বায়তুশ শরফের এই পরিবেশ সবাইকে যেন ভাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেয়। বিভিন্ন কাজে দেখা গেছে, একে অপরকে অগ্রাধিকার দিতে। দেখা গেছে, পরষ্পরের মাঝে পরম ভাতৃত্ববোধ।

বায়তুশ শরফের এতবড় আয়োজন কিভাবে সামাল দেয়া সম্ভব। কোথা থেকে আসে এর বিশাল খরচ? এই প্রশ্নের সোজা উত্তর আল্লাহর রহমত এবং বায়তুশ শরফ দরবারের ভক্ত অনুরক্ত ও দ্বীনদান ঈমানদার মুসলমানদের দানশীলতা, পীর মুর্শিদের রূহানী ফুয়োজ বায়তুশ শরফের এই বিশাল অয়োজনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দু’দিনের এতবড় মাহফিলে কোথাও দেখা যায়নি কোন অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা।
আসলে আল্লাহর অলী-আওলিয়াদের দরবারে দুনিয়ার কোন হিসাব মেলানোই কঠিন এটাই সত্য।

আমার এই লেখাটি ওই মাহফিলের পরেই লিখেছিলাম। পীর সাহেব হুজুরের ইন্তেকালের দিনে তাঁর সাথে স্মৃতি বহুল লেখাটি আবার প্রচার করা হল।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!