৩ দিনেও রিপোর্ট মেলেনি, মৃত্যুর পর লাশ পেতেও সংগ্রাম

৩ দিনেও রিপোর্ট মেলেনি, মৃত্যুর পর লাশ পেতেও সংগ্রাম

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

বিষন্ন, বিবর্ণ চেহারা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা, আবার কখনো ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে থাকেন সিঁড়ির মধ্যে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। এ এক কঠিন অপেক্ষা। লাশের জন্য বসে আছেন সেই ভোর রাত থেকে। ভাতিজার লাশ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আনিসুর রহমান। বারবার ছুটছিলেন করোনা ইউনিট থেকে মর্গ অফিসে।

কর্তব্যরতরা জানিয়েছেন, নিয়মানুসারেই লাশ নিতে হবে। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার পরিচিতজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন।

বলছিলেন, মৃত্যুর পরও ঝামেলা শেষ হয়নি। এখন লাশ নিতেও ঝামেলা। ওরা বলছে, এখন কিছু কাজ আছে। কাজ শেষে লাশ দেবে। এভাবে প্রায় পাঁচঘন্টা পরে লাশ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের নিকট।

করোনা ইউনিটে মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ নিয়ে সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ত্যাগ করেন তার স্বজনরা। ঢামেক’র করোনা ইউনিটে মারা যাওয়া ওই ব্যক্তির নাম কাজী রুমান (৩৩)।

কাজী রুমানের মতোই প্রতিদিন রোগী ভর্তি, চিকিৎসা নিয়ে নানা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এমনকি মৃত্যর পর লাশ নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার প্রহর গুনতে হচ্ছে।

গত ১৩ দিনের এক হিসেবে ১৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। খবর মানবজমিনের।

শুক্রবার ভোরে মারা যাওয়া কাজী রুমানের স্বজন ব্যাংক কর্মকর্তা মাসুম মিজান জানান, করোনার উপসর্গ দেখা দেয়ার এক পর্যায়ে টেস্টের জন্য নমুনা দিয়েছিলেন রোগী। কিন্তু তিনদিন গত হয়েছে, করোনা পরীক্ষার ফলাফল জানা যায়নি। এরমধ্যেই মৃত্যু হলো রুমানের।

রাত সাড়ে ১২টার পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তার। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে নিয়ে কোনোভাবে ঠাই হয় করোনা ইউনিটে। কিন্তু আশপাশে তখন ডাক্তার, নার্স কেউ নেই। স্বজনরা ডাকাডাকি করেও কাউকে পাচ্ছিলেন না। শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। পাশে এক রোগীর স্বজনের সহযোগিতায় নিজেরাই অক্সিজেনের মাস্কটি রুমানের মুখে লাগিয়েছিলেন। তার অনেক পর একজন ওয়ার্ড বয় গিয়ে সহযোগিতা করেন। খোঁজ নেন ডাক্তার।

দূর থেকে দেখে, বিস্তারিত শুনে ডাক্তার জানান, শেষ সময়ে নিয়ে এসেছেন। এতদিন হাসপাতালে আনেননি কেন।

রোগীর পরিবারের সদস্যরা জানান, উপসর্গ দেখা দেয়ার পর বারবার বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সবাই বলেছেন, বাসায় রেখে চিকিৎসা দেন। এখন তারাই বলছেন, আরও আগে হাসপাতালে নিয়ে আসেননি কেন।

ভোর পৌনে ৫টার দিকে রুমানের মৃত্যু হয়। দুই সন্তানের জনক কাজী রুমান রাজধানীর যাত্রাবাড়ী সামাদ সুপার মার্কেটে জুয়েলারি ব্যবসা করতেন। তার বাড়ি ঝালকাঠির সেরাল গ্রামে।

স্বজনরা জানান, প্রথমে রুমানের ভগ্নিপতির করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয়। তাকে ওষুধ দিতে বেশ কিছুদিন আগে ভগ্নিপতির বাসায় যান তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই আক্রান্ত হন তিনি।

চিকিৎসা সেবা পেতে, মৃত্যুর পর লাশ পেতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন মানুষ। হাসপাতালে-হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা পাচ্ছেন না অনেকে। অসহায় হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন জিয়াসমিন বেগম। বৃহস্পতিবার সকালে জ্বর ও হালকা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় তার। যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ার কাঠেরপুলের বাসা থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

জিয়াসমিন বেগমের স্বজনরা জানান, ঢামেকে সিট নেই। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে না দেখেই মুগদা হাসপাতালে যেতে বলেন। উপায় না দেখে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে ছুটে যান মুগদা হাসপাতালে। গেটের সামনে থামতে বলেন হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী। রোগী নিয়ে এভাবে ভেতরে যাওয়া যাবে না। সিএনজি অটোরিকশা গেটের বাইরে রেখে স্বজনরা হাসপাতালে প্রবেশ করেন। আর রোগী ছটফট করতে থাকে অটোরিকশার ভেতরে। তাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন আরেক নারী স্বজন।

দীর্ঘ সময় পর হাসপাতালের ভবন থেকে হতাশ হয়ে ফিরেন তারা। এখন রোগী দেখা যাবে না। আগে করোনা টেস্ট করাতে হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রায় দেড়ঘন্টা মুগদা হাসাতালের গেটের সামনে সিএনজি অটোরিকশায় ছিলেন তারা। তারপর বাসায় ফিরে যান।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, করোনা উপসর্গ নিয়ে গত ১৩ দিনে ১৪২ জনের মৃত্যু ঘটেছে এই হাসপাতালে। এরমধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২৪ জন।

গত ২রা মে ঢামেকের বার্ণ ইউনিটে করোনা রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিন মারা যান একজন। শুক্রবার হাসপাতালে করোনা ইউনিটে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ঢামেকের করোনা ইউনিট সুত্রে জানা যায়, হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি রয়েছেন দুই শতাধিক। শুরু থেকে রোগী ভর্তি হয়েছেন ১২ শতাধিক। অনেকেই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। আবার অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখে বাসায় চলে গেছেন। বাসায় থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করছেন।

এসব বিষয়ে ঢামেক পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, যথাসম্ভব রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শনিবার থেকে সিট সঙ্কটও থাকবে না। নতুন ভবনে করোনা রোগীদের একটি ইউনিট শুরু করা হচ্ছে। ডাক্তার, নার্স সবাই প্রস্তুত।

রোগীরা এখন থেকে যথাযথ সেবা পাবেন বলেও জানান তিনি।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!