চকরিয়ায় জমির দখল নিতে যেভাবে চলে ৪ ঘন্টার লুটতরাজ ও ২৬ ঘরে অগ্নিসংযোগ

চকরিয়ায় জমির দখল নিতে যেভাবে চলে ৪ ঘন্টার লুটতরাজ ও ২৬ ঘরে অগ্নিসংযোগ

এ কে এম ইকবাল ফারুক, চকরিয়া
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারের চকরিয়ায় নদীর পার্শ্ববর্তী জেগে উঠা প্রায় চার একর (১০ কানি) খাস জমি দখলে নিতে রাতের আঁধারে একটি গ্রামের ২৬টি বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে আরেকদল গ্রামবাসি। ৪৫০/৫০০ জনের একদল দূর্বৃত্ত প্রায় ৫০টির মতো বিভিন্ন ধরণের অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কয়েকশত ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে প্রথমে ওই গ্রামে প্রবেশ করে। পরে চার ঘন্টা ধরে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে দেড় হাজার মণ ধান, কয়েক’শ মণ মরিচ, আলু ও শিমের বিচি, ৫০ মণের মতো চাল, ৩৫/৪০ টির মতো গবাদিপশু, তিনটি মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন এবং বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্রসহ অন্তত কয়েক কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়।

পরে ওউ গ্রামের ২৬টি বাড়ি একের পর এক আগুন ধরিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় হায়েনারা। এ সময় আগুনে পুড়ে মারা যান মনোয়ারা বেগম (৫০) নামের এক নারী। তিনি ওই এলাকার মোজাহের আহমদের স্ত্রী।

এছাড়াও হামলাকারিদের এলাপাতাড়ি গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নারী-পুরুষসহ অন্তত ১৫ ব্যক্তি আহত হন। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ভোররাত ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এলাকায় টানা চারঘন্টা ধরে উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলছাদক ডাঙ্গারচর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলছাদক ডাঙ্গারচর এলাকায় প্রবাহমান একটি খালে জেগে উঠা চর (খাস জমি) দখলে নিতে বৃহস্পতিবার ভোররাত চারটা থেকে ব্যাপক তান্ডব চালায় একদল দুর্বৃত্ত।

তাদের মতে, পার্শ্ববর্তী বরইতলী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গোবিন্দপুর এলাকার বাসিন্দা দিদার মেম্বারের নেতৃত্বে ৪৫০/৫০০ জন দূর্বৃত্ত অন্তত ৫০টি বিভিন্ন ধরণের অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কয়েকশত ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে প্রথমে ওই গ্রামে প্রবেশ করার পর এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

পরে চার ঘন্টা ধরে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে দেড় হাজার মণ ধান, কয়েক’শ মণ মরিচ, আলু ও শিমের বিচি, ৫০ মণের মতো চাল, ৩৫/৪০ টির মতো গবাদিপশু, তিনটি মোটরসাইকেল, ২৪টি টিউবওয়েল, ফ্রিজ, টেলিভিশন এবং বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্র ও নগদ টাকাসহ অন্তত কয়েক কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়।

লুটপাটের পর ২৬টি বাড়ি একের পর এক আগুন ধরিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় তারা।

এ সময় আগুনে পুড়ে মারা যান মনোয়ারা বেগম (৫০) নামে এক নারী।

চকরিয়ায় জমির দখল নিতে যেভাবে চলে ৪ ঘন্টার লুটতরাজ ও ২৬ ঘরে অগ্নিসংযোগ

দূর্বৃত্তদের আগুনে সর্বস্ব খোয়ানো বাড়ির মালিকরা হলেন কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলছাদক ডাঙ্গারচর এলাকার নুরুল হোসাইনের ছেলে কৃষক মোহাম্মদ ইসমাইল, মোক্তার আহামদের ছেলে নুরুল হোসাইন, মোজাহের আহামদের ছেলে আনোয়ার হোসাইন ও মোহাম্মদ ফোরকান, আহামদ হোসেনের ছেলে মোজাহের আহমদ, মোজাহের আহামদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম, মৃহ আহমদ হোসেনের ছেলে মোজাম্মেল হক ও মো. জাহেদ, আবুল হোসেনের ছেলে নাসির উদ্দিন, জসিম উদ্দিন ও জমির উদ্দিন, মকবুল আলীর ছেলে আবু তাহের, আবু তৈয়বের ছেলে শাহ আলম, সাহাব উদ্দিন, সালাহ উদ্দিন ও নেজাম উদ্দিন, আবু তাহেরের ছেলে আবু ছালেক ও বশির আহমদ, মৌলভী আব্দুল্লাহর ছেলে মো. মোস্তফা, আবুল হোসেনের ছেলে জয়নাল আবেদীন, এজাহার আহমদের ছেলে নবী হোসাইন, আবুল কাশেমের ছেলে আবু হানিফ ও আলী আকবর প্রমূখ।

ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন জানান, লুট করে নেয়া সহায় সম্পদসহ অগ্নিকান্ডে তাদের অন্তত ৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

দূর্বৃত্তদের আগুনে সর্বস্ব খোয়ানো বাড়ির মালিক জসিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, গত ৭ মে দূর্বৃত্তরা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে নদীর পার্শ্ববর্তী জেগে উ্ঠা চর দখলের চেষ্টা চলায়। এ সময় দূর্বৃত্তদের গুলিতে চারজন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।

এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ওসমানের বাবা নুরুল হোসাইন বাদী হয়ে দূর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করলেও পুলিশ এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করায় দূর্বৃত্তরা পুণরায় এই ধরণের বর্বর কর্মকান্ড চালানোর সাহস পেয়েছে, মনে করেন জসিম উদ্দিন।

এদিকে কৈয়ারবিল ইউনিয়নে নারকীয় তা-বের খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সাংসদ জাফর আলম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান, ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মো. সাইফুল হাছান, হারবাং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. আমিনুল ইসলাম, কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মক্কী ইকবাল হোসেন ও বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জালাল আহমদ সিকদার প্রমুখ।

এ সময় সাংসদ জাফর আলম ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে চাউল ও বাড়ি নির্মাণের জন্য টিন সহায়তার আশ্বাস দেন।

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলছাদক এলাকায় নদীর পার্শ্ববর্তী জেগে উঠা চর দখল নিয়ে দূর্বৃত্তদের নারকীয় তান্ডবের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্ঠা চলছে।

তিনি জানান, অগ্নিকান্ডে পুড়ে যাওয়া নারীর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!