কক্সবাজারে নবজাতকের প্রথম ‘বিরল’ অস্ত্রোপচার, ১৪ দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াই!

কক্সবাজারে প্রথম নবজাতকের ‘বিরল’ অস্ত্রোপচার, ১৪ দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে মায়ের কোলে ফিরল শিশুটি

মহিউদ্দিন মাহী
প্রধান প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র তিন কেজি ওজন নিয়ে জন্মেছিল হাফেজ মোঃ আলম ও সানজিদা দম্পতির ৫ম সন্তান। জন্মের দিন ভালো থাকলেও একদিন পরই অস্বাভাবিকতা দেখা গেল নবজাতকের। পেট ফুলে একাকার। প্রথমেই টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলো। সেখানেও নবজাতকের অবস্থা বেগতিক দেখে পাঠিয়ে দেয়া হল জেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। ২৪ এপ্রিল (শুক্রবার) পৌঁছেই ভর্তি দেয়া হল শিশু বিভাগের বিশেষায়িত স্ক্যানোতে। এই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিশু বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান বাবর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে জানতে পারলেন ওই নবজাতকের জন্মগতভাবে মলদ্বার না থাকায় পায়খানা করতে পারছিল না। ফলে সে বারবার বমি করছিল এবং তার পেট ফুলে যাচ্ছিল। খুব কঠিন অবস্থা।

এই ধরণের নবজাতকের জন্মের পরপরই অপারেশনের মাধমে বিকল্প মলদ্বার তৈরি করা না গেলে নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব নয়। কিন্তু কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ইতোপুর্বে এই ধরণের নবজাতকের অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। কারণ এতো ছোট বাচ্চাকে অজ্ঞান করা এবং অপারেশন পরবর্তীতে কৃত্রিম শ্বাসের জন্য ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা সদর হাসপাতালে নেই। এছাড়া অপারেশন পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরণের জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও এখানে অপ্রতুল।

কক্সবাজারে প্রথম নবজাতকের ‘বিরল’ অস্ত্রোপচার, ১৪ দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে মায়ের কোলে ফিরল শিশুটি

আবার করোনাকালীন লকডাউনের এই সময় গরীব পরিবারের এই বাচ্চাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম বা ঢাকাতে নেয়াও সম্ভব নয়। এই কঠিন মুহুর্তে একটি জীবনের কথা চিন্তা করে কক্সবাজার সদর হাস্পাতালের শিশু বিভাগ সকল জটিলতা মাথায় রেখে এই রোগীর অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

অবশেষে গত ২৬ এপ্রিল সদর হাসপাতালেই পেডিয়াট্রিক সার্জনের পরামর্শে এই নবজাতকের অপারেশন হয়। সার্জনরা যখন অপারেশন করছিলেন ঠিক ওই সময়েই আবার পড়তে হয় বিপাকে। অপারেশনকালিন দেখা যায়, তার অন্ননালীর অধিকাংশই জন্মগতভাবে অপরিপূর্ণ থাকায় তা কেটে ফেলতে হবে। অপারেশন পরবর্তী সময় এই নবজাতকের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্র্ণ হয়ে যাওয়া সত্বেও অবশেষে তা-ও কেটে ফেলা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রথমবারের মতো নবজাতকের এই জটিল অস্ত্রোপচারে ছিলেন একটি দক্ষ চিকিৎসক টিম। তাদের মধ্যে ছিলেন পেডিয়েট্রিক সার্জন ডাঃ মাহফুজুল কবির, ডাঃ রুপম তালুকদার ও ডাঃ রিদওয়ান তারিন। আর ছোট দেহটিকে পুরো অজ্ঞান করার দায়িত্বে ছিলেন জেলার প্রখ্যাত এনেস্থিসিওলজিষ্ট ডাঃ বিধান পাল ও ডাঃ শরিফ। এছাড়াও স্ক্যানো ও শিশু বিভাগের সকল চিকিৎসক, নার্সদের আপ্রাণ চেষ্টার কারণেই ফুটন্ত গোলাপটি বাঁচতে পেরেছে।

বিষয়টি জানিয়েছেন জেলার জনপ্রিয় শিশু বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান বাবর।

তিনি বলেন, সদর হাসপাতালে অপারেশন করার অনেক সরঞ্জাম না থাকা সত্বেও করোনার এই কঠিন সময়ে রিস্ক নিয়ে অপারেশন করাতে উদ্যোগ গ্রহণ করি। আল্লাহতায়ালা সফলও করিয়েছেন।

তিনি জানান, কক্সবাজার সদর হাস্পাতালের নবজাতক (স্ক্যানু) বিভাগে ১৪ দিন জীবন-মৃত্যুর সাথে লড়াই শেষে, চিকিৎসক ও সেবিকাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সৃষ্টিকর্তার কৃপায় ‘বেবি অফ সাঞ্জিদা’ ক্রমেই সুস্থ হয়ে উঠে। প্রথমে নলের মাধ্যমে একটু একটু খাবার হজম করতে পারে। বর্তমানে সে সরাসরি মায়ের দুধ পান করতে পারছে।

ডা. এমএস জামান জানান, আজ সোমবার (১১ মে) নবজাতটিকে স্ক্যানু থেকে ছুটি দেয়া সম্ভব হয়েছে।

তিনি মনে করেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এই ধরণের নবজাতকের অপারেশন এটাই প্রথম। এই হাসপাতালের বিশেষত নবজাতক (স্ক্যানু) বিভাগের সাফল্যগাথার অন্যতম উদাহরণ এবং স্ক্যানো ও শিশু বিভাগের সকল চিকিৎসক।

কক্সবাজারে প্রথম নবজাতকের ‘বিরল’ অস্ত্রোপচার, ১৪ দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে মায়ের কোলে ফিরল শিশুটি

এদিকে নবজাতকের বাবা কোরআনে হাফেজ মোঃ আলমের সাথে মোবাইলে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

তিনি জানান, তাদের বাড়ি টেকনাফের সেন্টমার্টিন হলেও তারা টেকনাফের নাজির পাড়ায় ভাড়া থাকেন। শিশুটি ভূমিষ্ট হওয়ার পরেই তারা এতো বড় সমস্যা হবে তা বুঝতে পারেননি। হাসপাতালে নেয়ার পরেই সব জানতে পেরেছেন।

মোঃ আলম বলেন, ‘কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ডা. এমএস জামানের আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই আমার বাচ্চার জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ঢাকা-চট্টগ্রামে যে উন্নত অপারেশন হবে কক্সবাজার সদর হাসপাতালেও একই রকম অপারেশন হবে। যদি এই বাচ্চার হায়াত থাকে তাহলেই নবজাতক শিশুটি বাঁচবে। সবসময় আশ্বাস দিয়েছিলেন। আলহামদু লিল্লাহ আল্লাহর কাছে লাখো-কোটি শুকরিয়া জানাচ্ছি, আমার বাচ্চাটি সুস্থ হয়েছেন। মায়ের দুধ খাচ্ছেন। এই খুশি কিভাবে প্রকাশ করবো তা ভাষাতেই বুঝাতে পারবো না।

নবজাতকের মা সানজিদা জানান, তার নরমাল ডেলিভারিতেই এই বাবুটি হয়েছে। তাদের ঘরে ৫ম সন্তান হলেও এই বাবুকে নিয়ে অনেক চিন্তাতেই দিন কাটাতে হয়েছে। জন্মের পর থেকে ১৭ দিন কাটিয়ে আজ বাড়িতে পৌঁছতে পেরেছি। আত্মীয়-স্বজন পুরো এলাকাবাসী বিষয়টি শুনে ডাক্তারদের জন্য মন ভরে দোয়া করছেন।

এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপ-পরিচালক ডা. মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, এই নবজাতকের জটিল অপারেশনের ক্ষেত্রে অনেক সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়। তারপরও সফলভাবে অপারেশন হয়েছে। এই নবজাতক সুস্থ হয়ে উঠেছে এটাতেই অনেক খুশি পুরো সদর হাসপাতাল।

তিনি আশা করেন, যেহেতু প্রথম নবজাতকের ক্ষেত্রে জটিল অপারেশন হয়েছে আগামিতেও এই ধরণের অপারেশন হবে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!