টেকনাফ পুলিশের ‘হাকিম ডাকাত’ অভিযান, যেভাবে লাশ পড়ল তিনজনের

টেকনাফ পুলিশের ‘হাকিম ডাকাত’ অভিযান, যেভাবে লাশ পড়ল তিনজনের

আনছার হোসেন, সম্পাদক
নুরুল হকহেলাল উদ্দিন, টেকনাফ
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে একটি গোপন খবর আসলো, আলোচিত শীর্ষ ডাকাত আবদুল হাকিম হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী এলাকার গহীন পাহাড়ে অবস্থান করছেন। ওই খবর পেয়েই প্রস্তুতি শুরু করলেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওই মানুষটিকে ধরার অপেক্ষায় আছেন। শুরু হলো ভোর রাতের যাত্রা। তাঁর নেতৃত্বে পুলিশ দলটি খবর মতো জায়গাতেই পৌঁছায়। তারা ডাকাত দলের আস্তানা ঘেরাও-ও করে ফেলেন। কিন্তু ততক্ষণে ডাকাত দলের সদস্যরা টের পেয়ে যায়। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে শুরু করে এলোপাতাড়ি গুলি।

এভাবেই শুরু হয় পুলিশের একটি বৃহৎ অভিযানের গল্প। এই গল্পে মারা পড়ে তিনজন শীর্ষ ডাকাত। উদ্ধার হয় ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২২৪ রাউন্ড গুলি, ৭২ রাউন্ড কার্তূজের খোসা, ৫৬ হাজার পিস ইয়াবা আর বিজিবি ও পুলিশ বাহিনীর মতো ১৩ সেট পোষাক।

ওসি প্রদীপ কুমারের মতে, বুধবার (৬ মে) ভোর রাত থেকে সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলে এই অভিযান।

টেকনাফ পুলিশের ‘হাকিম ডাকাত’ অভিযান, যেভাবে লাশ পড়ল তিনজনের

তিনি বলেন, ডাকাত দল এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করলে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই গোলাগুলি শেষে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় তিনজনের লাশ আর ৫ পুলিশ সদস্যের আহত দেহ। সাথে ডাকাত দলের আস্তানায় মিলে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলা-বারুদ।

পুলিশের ভাষায়, হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী এলাকার গাজী পাহাড়ে এটি ছিল অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়কারি চক্রের কেন্দ্রস্থল।

যারা মারা গেলেন
অভিযানের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ করে। এরা হলেন রঙ্গীখালী মাদ্রাসা পাড়ার মৃত আব্দুল মজিদ ওরফে ভুলাইয়্যা বইদ্যের ছেলে নুরুল আলম (৪০), ছৈয়দ আলম (৩৫) ও শব্বির আহমদের ছেলে আব্দুল মোনাফ (২০)। এদের মধ্যে সৈয়দ আলম ও নুরুল আলম আপন দুই ভাই।

পুলিশের ভাষায়, এই তিনজনই শীর্ষ ডাকাত। এরা রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিম ওরফে হাকিমের ডাকাতের সহযোগী। তবে এরা কেউ রোহিঙ্গা নন। তারা তিনজনই বাংলাদেশি নাগরিক।

যখন তাদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হচ্ছিল তখনও তারা বেঁচে ছিলেন। দ্রুত তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছার আগেই তারা মারা যান। হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

আহত হলেন যারা
অভিযানকালে ডাকাত দলের সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করলে পুলিশের ইন্সপেক্টর লিয়াকত, মশিউর রহমান, সনজিব দত্ত, সৈকত বড়ুয়াসহ ৫ জন সদস্য আহত হন। পুলিশ সু-কৌশলে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করলে সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা পালিয়ে যায়।

অভিযান শেষে আহত পুলিশ সদস্যদেরও হাসপাতালে আনা হয়। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

টেকনাফ পুলিশের ‘হাকিম ডাকাত’ অভিযান, যেভাবে লাশ পড়ল তিনজনের

অভিযান যা পাওয়া গেল
টেকনাফ পুলিশের বিশেষ এই অভিযানে পাওয়া যায় ১৮টি দেশি-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র, বিভিন্ন ধরণের অস্ত্রের ২২৪ রাউন্ড গুলি, ৭২ রাউন্ড ব্যবহৃত কার্তূজের খোসা আর ৫৬ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। তবে এই অভিযানে বিশেষ যে জিনিষ উদ্ধার হয় তা হলো ডাকাত দলের আস্তানায় বিজিবি ও পুলিশের পোষাক। এ রকম ১৩ সেট পোষাক উদ্ধার করা হয়।

ধারণা করা হচ্ছে, ডাকাত দলের সদস্যরা বিজিবি ও পুলিশের পোষাক পরে ডাকাতিতে অংশ নিতো।

কেন এই অভিযান
হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী এলাকার ধানক্ষেত থেকে গত ২৯ এপ্রিল স্থানীয় তিনজন কৃষককে অপহরণ করে নিয়ে যায় রোহিঙ্গা ডাকাতরা। এদের মধ্যে মুক্তিপণ না পেয়ে আক্তার উল্লাহ নামের এক কৃষককে হত্যা করা হয়। তার সাথে একই এলাকার শাহ মো. শাহেদ, মো: ইদ্রিস নামের আরও দুই কৃষককে তুলে নিয়ে যায় ডাকাত দল।

নিহত কৃষক আক্তার উল্লাহ স্থানীয় মিনাবাজারের মৌলভী আবুল কাছিমের ছেলে।

তার পরিবারের দাবি, সম্প্রতি আক্তার উল্লাহকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে রোহিঙ্গা ডাকাতরা। পরে মুক্তিপণের টাকা চেয়ে না পাওয়ায় শুক্রবার আক্তার উল্লাহকে হত্যার পর তার লাশ হোয়াইক্যং উনছিপ্রাং পুটিবনিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পশ্চিমে রাখা হয় বলে পরিবারের কাছে এমন খবরও পৌঁছে দেয় তারা। দাবি করা টাকা না দেয়ায় অপহৃত আরও দুইজনকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে তাদের পরিবারসহ স্থানীয়রা ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

তাদের উদ্ধারে একের পর এক অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। বুধবার ভোর রাতের পুলিশী অভিযানটিও অপহৃত দুই কৃষককে উদ্ধার অভিযানের অংশ। তবে এটি বিশেষ অভিযান। পুলিশের টার্গেট ছিল টেকনাফে অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা, মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়কারি চক্রের মূলহোতা আবদুল হাকিম ওরফে হাকিম ডাকাতকে ধরা। তবে প্রতিবারের মতো এবারও হাকিম ডাকাতকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কারা ছিলেন অভিযানের নেতৃত্বে
রঙ্গীখালী পাহাড়ের এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন টেকনাফ থানার আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ। তার সাথে ছিলেন এসআই মশিউরসহ একদল বিশেষ পুলিশ।

ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান, হাকিম ডাকাত ধরা না পড়লেও ডাকাত দলের একটি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিনজন ডাকাত মারা গেছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র।

তিনি জানান, নিহত তিন ডাকাতের মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!