করোনায় হেরে যাওয়া তারেকের শেষ স্ট্যাটাস

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

সৌদিতে এবার মারা গেলেন ভারুয়াখালীর ‘অতিথিপরায়ন’ যুবক তারেক

আনছার হোসেন
সম্পাদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী যুবক তারেক সিকদার। টানা ১৯ দিন নিজের জীবনের সাথে ‘যুদ্ধ’ করে অবশেষে হেরে গেছেন। তার ভাষায়, ‘এই নোংরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন!’ তিনি গত ৩ এপ্রিল (রোববার) বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে পবিত্র মক্কা শহরের কিং আবদুল আজিজ হাসপাতালে নিজের শেষ নিঃশ^াসটি ছাড়েন।

এই যুবক যেদিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যান সেদিনের মাত্র একদিন আগে নিজের ফেসবুকে পর পর দুইটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। কী ছিল সেই স্ট্যাটাসে? সেই স্ট্যাটাস গুলোও ছিল মৃত্যুর মতোই মর্মান্তিক।

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

১৪ এপ্রিল রাত ৩টা ৪১ মিনিট। তিনি স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘অহ আল্লাহ! দিনে যেমন তেমন, রাতে আসল তুফান।।’

তার ঠিক তিন মিনিট পর আরও একটি স্ট্যাটাস দেন, ‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও।’

এই স্ট্যাটাস দু’টো দিয়ে যুবক তারেক সিকদার রাত পার করেন। পরদিন তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে যান। হাসপাতালে যাওয়ার পরই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তার শরীরে করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। এই যে অসুস্থ নিয়ে তিনি হাসপাতালে গেলেন, আর ফিরে আসতে পারলেন না।

 

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

সেই দু’টো ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি কী নিজের শারিরিক যন্ত্রণা আর মৃত্যুর স্বাদ পাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন! কেউ তা জানেন না। তিনি তো আরেকটি স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য হাসপাতাল থেকে মুক্ত আলোয় ফিরে আসতে পারেননি!

তার চাচাতো ভাই এডভোকেট মোহাম্মদ নেজামুল হক জানিয়েছেন, তারেক সিকদার তার আপন চাচাতো ভাই। চাচাতো ভাই হলেও কখনও তিনি পরিচয় দেয়ার সময় চাচাতো ভাই বলতেন না। তাদের পারিবারিক বন্ধনটা এমনই ছিল যে, সব সময় তারেককে নিজের ভাই-ই পরিচয় দিতেন।

তিনি জানান, তার এই ভাইটি টানা ১৯ দিন হাসপাতালে ছিলেন। মাঝখানে কিছুটা সুস্থ হলেও শেষটা আর ভালো হয়নি। তারেক তাদের ছেড়ে চলে গেছেন পরপারে।

দুই সন্তানের বাবা তারেক সিকদার নিজের দুই মাস বয়সী শেষ সন্তানটির মুখও দেখতে পারেনি। নিজের স্ত্রীকে গেলবার হজ¦ করিয়েছেন। সেই হজ¦ যাত্রায় স্ত্রী টানা ৭ মাস মক্কায় ছিলেন। ওখান থেকে ডিসেম্বরে ফেরার পর দেশেই তার শেষ সন্তানটির জন্ম হয়।

এই হাসপাতালে থাকাকালেই নিজের বোনজামাইকে হারিয়েছেন মক্কার বুকে। তিনিও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। নিজের দুলাভাইকে যেভাবে সেবা দিয়েছেন তারেক, সেটি তার কাছের জনরা এখনও ভুলতে পারেন না।

তবে কী তারেকের মনে মৃত্যু ভাবনা এসে গিয়েছিল! সবাইকে ছেড়ে পরপারে যাবার সময় যে এসে গেছে সেটিও কী বুঝে গিয়েছিলেন যুবক তারেক! মহান আল্লাহই সব জানেন।

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

কিন্তু হাসপাতালে ভর্তির আগে কোন এক বাংলাদেশি প্রবাসির মৃত্যুর ছবি দিয়ে ফেসবুকে আরেক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তারেক। ৮ এপ্রিল সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে তিনি লিখেন, ‘একে একে রেমিট্যান্স যোদ্ধার বিদায়, কেউ রুমে, কেউ ঘুমে কেউ বা স্ট্রোকে এই নোংরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন। হে রাব্বুল আ’লামিন! কিন্তু অকাল বা এইরকম প্রবাসে মৃত্যু যেনো কারোর না হয়। আমিন’

ওই স্ট্যাটাসটিতেই তিনি লিখেছিলেন, ‘এই নোংরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন’! আবার একই স্ট্যাটাসে কামনা করেছিলেন, ‘এইরকম প্রবাসে মৃত্যু যেনো কারোর না হয়’!

কিন্তু সেই তারেক সিকদারও প্রবাসের তেমন মৃত্যু থেকে রেহাই পাননি। মক্কার অচেনা হাসপাতালে একাকি তাকে এই পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় নিতে হয়েছে।

তাহলে হাসপাতালে যাওয়ার অনেকদিন আগে ২ এপ্রিল কেন এমন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তারেক সিকদার! যে স্ট্যাটাস শুধু মৃত্যুর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

২ এপ্রিল সকাল ৯টা ২২ মিনিটে তিনি লিখেন,

‘কখনো যদি বেলা শেষ হয় আমার,
অদৃষ্টের আড়ালে লুকিয়ে রইবো,
হে আপন! হে পর!! সত্যি বলতে নয় কেউ আপমর,
গোধুলির পাশে দাড়িয়ে মোহের লীলা দেখিবো।

আকাশচুম্বী কল্পনার রাজ্যে যার ছিলো বাস,
সহসাই কেমনে হইলো বিধির্ণ আকাশ-বাতাস!!
আজিকার আয়োজন প্রয়োজন সবই শূন্য মরু,
তিনিই মাত্র আপন, হে দয়াময় রহম করো।’

সত্যিই অল্পতেই ‘বেলা’ শেষ হয়ে গেল প্রবাসি ব্যবসায়ী তারেক সিকদারের! এখন তার স্ট্যাটাসের শেষ লাইনটিই কেবল সত্যি, ‘তিনিই মাত্র আপন, হে দয়াময় রহম করো’!

‘কেউ কিছু করতে না পারলেও ক্ষমা টুকু করে দিও’!

প্রসঙ্গত, তারেক সিকদার (৩০) কক্সবাজার সদর উপজেলাধীন ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৬ নাম্বার ওয়ার্ডের হাজী পাড়ার রমজান আলী সিকদারের ছেলে। তিনি দুই সন্তানের বাবা। ছোট সন্তানটির বয়স মাত্র ৩ মাস।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার মো. ফজলুল হকের মতে, তারেক সিকদারের দেশে বিদেশে নম্র, ভদ্র এবং অতিথিপরায়ন হিসেবে ঈর্ষণীয় সুনাম ছিল। বিশেষ করে প্রবাসে এলাকার কোন মানুষকে পেলে মেহমানদারি না করে ছাড়তেন না। তার সাথে যে-ই মিশেছে সে-ই তার কথা ভুলতে পারেন না।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!