১৫ টন চাল লোপাটের ‘মূলহোতা’ তিনিই!

পেকুয়ার ইউএনও সাঈকা’র বিরুদ্ধে উঠল যে সব অভিযোগ

পেকুয়ার ইউএনও সাঈকা’র বিরুদ্ধে উঠল যে সব অভিযোগ

ডেস্ক রিপোর্ট
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার ১৫ মে. টন চাল এখন দেশজুড়ে আলোচিত। এ ঘটনায় পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) বদলির পর স্থগিত করা হয়। বরখাস্তের পর মামলা হয় স্থানীয় চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। তিনি এখন পলাতক।

তবে কেউ জানে না কোথায় আছে ১৫ মে. টন চাল।

১৫ মে. টন জিআরের চাল কেলেংকারি নিয়ে সমালোচনা হলে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈকা সাহাদাতকে বদলির আদেশ হয়। এরপর শুক্রবার বিকালে তা স্থগিত করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়।

বৃহস্পতিবার রাতেই চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার শংকর রঞ্জন সাহা স্বাক্ষরিত আদেশের মাধ্যমে নাজমা সিদ্দিকা বেগমকে কক্সবাজারে পেকুয়ার নতুন ইউএনও হিসাবে নিয়োগ দিয়ে ৩ মে’র মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনা দেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. ফরিদুল আলম জানান, শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা কর্তৃক স্বাক্ষরিত আদেশের মাধ্যমে পেকুয়া ইউএনওর বৃহস্পতিবারের বদলী আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ১৫ মে. টন জিআরের চাল আত্মসাৎ নিয়ে পেকুয়ার ইউএনও সাঈকা সাহাদাত ও টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন স্থানীয়রা।

চাল লোপাটের ঘটনায় মঙ্গলবার সরেজমিনে তদন্ত করেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার।

তদন্ত করে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরই প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণলায়ে টৈটং ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

এরপর বুধবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণলায় ত্রাণের চাল আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় টৈটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

ইতোপূর্বে মঙ্গলবার রাতে পেকুয়া উপজেলায় নবাগত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আমিনুল ইসলাম বাদি হয়ে ত্রাণের ১৫ মে. টন জিআর চাল আত্মসাতের অভিযোগে এনে টৈটং ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে একমাত্র আসামী করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার বিষয়ে পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল আজম জানান, পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাদী হয়ে জাহেদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি ত্রাণের ১৫ মে. টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ এনে এজাহার দায়ের করায় সেটি বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রেকর্ড করা হয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মামলা দায়েরের পর থেকে ১৫ মে. টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তিনি কোথায় আত্মগোপনে রয়েছেন সে বিষয়ে তার এলাকার কেউ জানে না।

তবে চেয়ারম্যান জাহেদকে গ্রেপ্তারে পেকুয়া থানা পুলিশ সম্ভাব্য জায়গায় খোঁজ নিচ্ছে বলেও থানা সূত্র জানিয়েছেন।

পেকুয়ার উজানটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা মো. নাছির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, করোনার এই পরিস্থিতিতে ১৫ মে. টন জিআরের চাল পেকুয়ার সাত ইউনিয়নে সমানভাবে না দিয়ে ইউএনও সাঈকা সাহাদাত টৈটং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নামে উপ-বরাদ্দ দেয়ার বিষয়টি ইউএনওর ‘বড় ধরণের দুর্নীতি ও কেলেংকারি’।

তিনি বলেন, ইউএনওই ত্রাণের ১৫ মে. টন চাল লোপাটের ঘটনার ‘মূলহোতা’।

এখন চেয়ারম্যানকে ‘বলির পাঠা’ বানিয়ে ইউএনও উল্টো নবাগত পিআইও আমিনুলকে বাদী সাজিয়ে মামলার আসামী করে চেয়ারম্যান জাহেদকে এলাকা ছাড়া করেছেন বলে ওই আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে গেছে, ঘূর্নিঝড় বুলবুলের সময় ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ত্রাণ শাখা থেকে পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের দরিদ্রদের জন্য ৪০ মে. টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এসব চাল থেকে ২৫ টন চাল ঘূর্ণিঝড়ের সময় পেকুয়ার সাত ইউনিয়নে উপ-বরাদ্দ করেছিলেন সাবেক ইউএনও মাহাবুবউল করিম ও সাবেক পিআইও সৌভ্রাত দাশ। ৪০ মে. টন চাল থেকে ১৫ টন চাল খাদ্যগুদামে নিময়বহির্ভূতভাবে রেখে দেয়ার অভিযোগ ছিল সাবেক ইউএনও মাহাবুবউল করিম ও সাবেক পিআইও সৌভ্রাত দাশের বিরুদ্ধে।

জানা যায়, দীর্ঘ এক বছরের কাছাকাছি সময় ধরে এসব চাল বিতরণ না করে খাদ্যগুদামে রেখে দেয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসক কার্যালয়কে লিখিতভাবেও অবহিত করেনি সাবেক ইউএনও মাহাবুবউল করিম ও সাবেক পিআইও সৌভ্রাত দাশ। এরই মধ্যে ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইউএনও মাহাবুবউল করিম সাঈকা সাহাদাতকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে পেকুয়া থেকে বদলী হয়ে অন্যত্র যোগ দেন।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, চলতি বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে কর্মহীন হয়ে পড়া হতদরিদ্র ও সাধারণদের জন্য পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের জন্য জেলা প্রশসক কার্যালয়ের ত্রাণ শাখা থেকে চার দফায় প্রায় ৯০ মে. টন জিআর চাল ও ৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা নগদ টাকা (জিআর ক্যাশ) বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সময় জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে বরাদ্দের ওই ১৫ টন চাল সাত ইউনিয়নে না দিয়ে শুধু টৈটং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহেদের নামে বরাদ্দ দেয়ার ঘটনায় ইউএনও সাঈকা সাহাদাত ও সাবেক পিআইও সৌভ্রাত দাশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্র মতে, ৩১ মার্চ টৈটং ইউপি চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর অনুকূলে ১৫ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দপত্রে স্বাক্ষর রয়েছে ইউএনও সাঈকা ও পিআইও সৌভ্রাতের। এরপর এপ্রিলের শুরুতে পিআইও সৌভ্রাত পেকুয়া থেকে বদলী হয়ে যান। ৬ এপ্রিল চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী চকরিয়া খাদ্যগুদাম থেকে ১৫ টন জিআরের চাল উত্তোলন করলেও বিতরণের জন্য টৈটংয়ে নিয়ে যাননি। চালগুলো খাদ্যগুদামেই চকরিয়ার এক ডিলারকে পানির দরে বিক্রি করে দেন বলে জানা যায়।

তবে এ ঘটনা রোববার পর্যন্ত গোপন ছিল। ওইদিন ১৫ মে. টন চাল লোপাটের ঘটনাটি এলাকাবাসী ও উর্ধ্বতন প্রশাসনসহ গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসে। এরপর শুরু হয় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের তৎপরতায় সোমবার পেকুয়ার নতুন পিআইও আমিনুল ইসলাম ১৫ টন চাল উত্তোলন করে বিতরণের মাস্টাররোল জমা না দেয়ায় লিখিতভাবে চেয়ারম্যানকে শোকজ করেন।

টৈটং ইউনিয়নে চাল বিতরণের ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বে থাকা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সালামত উল্লাহ খাঁন জানান, চাল বিতরণ করা হয়েছে কিনা তিনি জানেন না। তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈকা সাহাদাত এ প্রসঙ্গে জানান, চেয়ারম্যান জাহেদের নামে ১৫ মে. টন চালের ডিও দেয়া হয়েছে। তিনি চালগুলো বিতরণ না করে আত্মসাৎ করার প্রমাণ পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

তিনি জানান, চেয়ারম্যানকর্তৃক চাল আত্মসাতের ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে স্থানীয় একটি চক্র তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!