এমপিতে ক্ষুব্ধ পেকুয়া আ.লীগ নেতারা, জাহেদ চেয়ারম্যানকে বহিষ্কার ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’!

আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে আছেন যারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, পেকুয়া
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

পেকুয়ায় আলোচিত টৈটং ইউপির চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কার ‘সঠিক’ ও ‘সময়োপযোগী’ সিদ্ধান্ত বলেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। চাল লোপাট নিয়ে পেকুয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে বিতর্ক ও তুমুল সমালোচনা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে পেকুয়ায় আওয়ামী লীগ শিবিরে নানান ধরণের বক্তব্য ও মন্তব্য দেখা দিয়েছে।

চলমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান জাহেদকে নিয়ে পড়েছে বিপাকে।

করোনায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা স্থবির হয়ে গেছে। নাজুক এই পরিস্থিতিতে মানুষ আতংকের মধ্যে পড়েছেন। তবে করোনার এ কঠিন মুহুর্তে সরকারের পাঠানো খাদ্যশস্য লোপাট হয়েছে পেকুয়ায়। সরকারী জি.আরের ১৫ টন চাল আত্মসাত হয়েছে। এই আত্মসাতের জন্য চেয়ারম্যান জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে দায়ী করা হচ্ছে। উপকারভোগীর মাঝে এসব চাল বিলি হয়নি। তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলাও রুজু হয়েছে।

সরকারি চাল আত্মসাত, কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে চেয়ারম্যান পদ থেকে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ শাখা-১ এর উপ-সচিব ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী এক প্রজ্ঞাপনে জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীকে তার পদবী থেকে অপসারণ করে।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারি চাল আত্মসাত ও দলীয় ভাবমূর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করায় তাকে আওয়ামী লীগের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান মেয়র জাহেদ চেয়ারম্যানকে টৈটং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করেন।

তবে বহিষ্কারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আওয়ামী লীগের একটি পক্ষের মধ্যে জাহেদ চেয়ারম্যানের পক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মেয়র মুজিবুর রহমান ৩০ এপ্রিল এক প্রেস নোটের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ থেকে জাহেদ চেয়ারম্যানকে সাময়িক বহিষ্কার করেন। এ খবর বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বহিষ্কার ও চাল লোপাটের ঘটনায় দু’ধরণের বক্তব্য পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগের একাংশ জাহেদ চেয়ারম্যানকে বহিষ্কার ‘গঠনতন্ত্র বিরোধী’ বলে দাবি করছেন। বড় একটি অংশ বলছে, মুজিবুর রহমান মেয়রসহ জেলা আওয়ামী লীগ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি ‘যৌক্তিক’ ও ‘সময়োপযোগী’ সিদ্ধান্ত।

অপরদিকে চকরিয়া-পেকুয়ার সাংসদ জাফর আলম তার ফেসবুক আইডি থেকে এ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সাংসদ বলেছেন, জাহেদ চেয়ারম্যানের বহিষ্কার একক ব্যক্তির দ্বারা ‘যুক্তিসঙ্গত নয়’। তাকে বহিষ্কার করতে হলে দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করতে হবে।

তবে এমপির এই বক্তব্য সরাসরি নাকচ করেছেন আওয়ামী লীগের পেকুয়ার বিশাল একটি অংশ। ক্ষমতাসীন দলটির পেকুয়ার জৈষ্ট্যনেতারা বলেছেন, জেলা আওয়ামী লীগ যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এটি দলের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ব্যক্তির একক দায়িত্ব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিতে পারে না।

দলের এই অংশটির মতে, করোনা পরিস্থিতিতে মানুষ নাকাল হয়েছে। গরীবের জন্য পাঠানো খাদ্যশস্য লুটপাট করবে। তাকে আওয়ামী লীগ সমর্থন করবে এ যুক্তি নিষ্টুর ও অমানুষিকতা। জননেত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। দুর্ণীতিবাজের কোন রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে না। সমাজ থেকে দুর্ণীতি অনাচার ও নিপীড়নের জন্য বঙ্গবন্ধু এ দেশ স্বাধীন করেছেন। কোন দুর্ণীতিবাজকে আমরা আওয়ামী লীগের পরিচয় দিতে পারি না।

জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য এস.এম গিয়াস উদ্দিন জানান, জেলা আওয়ামী লীগ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনগণ সেটিকে বাহাবা দিচ্ছে। মানুষ অপরাধীকে পছন্দ করে না। যারা গায়ের জোরে পেশীশক্তি দিয়ে মানুষকে শাসন করতে চায় তারা জনগণের আস্থা হারায়।

তিনি বলেন, জাহেদ চেয়ারম্যান অন্যায় করেছে, এর প্রায়শ্চিত্ত তাকে পেতে হবে। আমি অধিক তদন্ত আহবান করছি।

তার মতে, পেকুয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে স্লায়ুযুদ্ধ চলছে। আজকে যারা গঠনতন্ত্রের কথা বলছে, আমি প্রশ্ন করছি- রাজাখালীতে কেন টাকা নিয়ে আওয়ামী লীগের কমিটি দিয়েছে। দু’জন ডাকাতকে আওয়ামী লীগের কমিটি দিয়েছে কাউন্সিল ছাড়া। তখন গঠনতন্ত্র কোথায় ছিল।

জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য জিএম আবুল কাসেম জানান, জেলা আওয়ামী লীগ জাহেদ চেয়ারম্যানকে বহিষ্কারের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাঠে আওয়ামী লীগকে কলংকিত করবে তারা দলে পরিচয় দেয়ার এখতিয়ার হারিয়ে ফেলেছে। নেত্রী জনগণের জন্য কাজ করছেন আর গুটিকয়েক ব্যক্তি দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সরকারী ত্রাণ আত্মসাত করবে সেটি আমরা মেনে নেব না।

উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা এটিএম বখতেয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এমপি লীগের কাছে আওয়ামী লীগ বেসামাল হয়েছে পেকুয়ায়। যে ব্যক্তি এক সময় আওয়ামী লীগকে গালি দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে কটুক্তি করেছিল, তিনি আজকে আওয়ামী লীগের এমপি। দল এই ব্যক্তির হাতে নিরাপদ হবে কিভাবে।

তিনি মনে করেন, জাহেদকে চিরতরে বহিষ্কার করতে হবে। কেউ যেন এই অপরাধ করতে সাহস না পায়।

উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রাজাখালীর সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সিকদার বাবুল বলেন, অপরাধী ও লুটেরাদের নিয়ে এমপি আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও নিষ্টাবানদের দমন করছেন। এর রহস্য বের করতে হবে।

তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত এমপির মিশন আওয়ামী লীগকে মাঠ থেকে দেউলিয়া করা। রাজাখালীতে আওয়ামী লীগের ভাবমুর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। গঠনতন্ত্র এমপি নিজেই মানেন না।

আওয়ামী লীগ নেতা মফিজুর রহমান জানান, জেলা আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এ সিদ্ধান্ত সঠিক।

রাজাখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি বর্ষিয়ান নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসি জানান, এমপি জাফর আমাদের এখন তিরষ্কার করছেন। এমপি হয়েছে নৌকার। কাজ করছেন বিএনপি-জামায়াতের।

তিনি বলেন, নেত্রীর কাছে যাব।

মগনামা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি নাজিম উদ্দিন জানান, লুটেরাদের নিয়ে এমপির ভয়ানক দুর্ণীতির অবসান ঘটাতে হবে। মানুষ সম্মানের জন্য রাজনীতি করেন। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করছেন এমপি নিজেই।

সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির নেতা তৌহিদুল ইসলাম তোহা বলেন, আমরা পেকুয়ার এই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছি। ত্রাণ কমিটিতে বিএনপির যুগ্ম সম্পাদককে রাখা হয়েছে। লুটেরাদের আমরা আওয়ামী লীগ করব কিভাবে।

মগনামা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্যানেল চেয়ারম্যান আলমগীর বলেন, রাজাকারের ছেলে আবু হেনা সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির পেকুয়ার আহবায়ক। রেড ক্রিসেন্টকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এখন টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগের কমিটি বিক্রি করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাসেম আজাদ বলেন, আমি আনন্দিত হয়েছি। যারা ডাকাতদের নিয়ে আওয়ামী লীগ শাসন করাতে চায় তারা কা-পুরুষ। এদের বিপর্যয় অবশ্যই আসবে একদিন।

আওয়ামী লীগ নেতা বশির মালিক বলেন, মগনামায় একজন নির্বাচিত সভাপতিকে কিভাবে অপমান করছেন, এর চাক্ষুষ স্বাক্ষী আমরা। খাইরুল এনামকে কেন অব্যাহতি দিয়েছেন, এ অধিকার আবু হেনা ও কাসেমকে কে দিয়েছে। তারা তো গঠনতন্ত্র মানেন না। আর আজকে বলছেন, গঠনতন্ত্রের কথা।

তিনি বলেন, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এস.এম গিয়াস উদ্দিনকে একটি হত্যা মামলায় আসামী করা হয়েছে। এটি কার ইন্ধনে হয়েছে দিবালোকের মত স্পষ্ট। সম্পুরক চার্জশিটে এ নিরীহ নেতাকে টাকা দিয়ে আসামি করেছে আমাদের দলের আত্মঘাতী নেতারা। বাদীকে ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি দিয়ে পুরষ্কৃত করেছে।

তদন্ত করলে এ সব বেরিয়ে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!