ধর্ম চিন্তা

পবিত্র রমজানে তারাবীহ’র সালাতে তাড়াহুড়া নয়

পবিত্র রমজানে তারাবীহ’র সালাতে তাড়াহুড়া কোরআন অবমাননার শামিল

মুফতি দিলাওয়ার হোছাইন, মুফতি ও শিক্ষক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

তারাবীহ’র সালাত খুব দ্রুত ও তাড়াহুড়া করে পড়তে হবে, এটিই নিয়ম হয়ে গেছে আমাদের প্রত্যেকটি সমাজে। শৈশবে যখন থেকে তারাবীহ সালাত পড়ে আসছি, এই নামাজটিকে দ্রুততার সাথেই আদায় করতে দেখে আসছি। কোনো কোনো ইমাম সাহেব এত দ্রুতবেগে তারাবীহ পড়ান যে, পিছনের মুক্তাদিদের অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। তারা শুধু উঠতে আর বসতে থাকেন। কেউ কেউ রুকু থেকে সরাসরি সিজদায় চলে যান, দাঁড়ানোর সুযোগ পর্যন্ত পাযন না।

আমার ছোটকালে একবার এলাকার মসজিদে তারাবীহ পড়তে গিয়ে এক হাস্যকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। কোনো ভাবেই আমি ইমামের সাথে একত্র হতে পারছিলাম না। আমি সালাম ফিরিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই ইমাম রুকুতে চলে গেলেন, রুকু থেকে সিজদায়, সিজদা থেকে আরেক সিজদায়! শেষ পর্যন্ত সালামের পূর্বমুহূর্তে শেষ বৈঠকে তাঁর সাথে কোনো মতে একত্রিত হতে সক্ষম হয়েছিলাম।

সম্প্রতি ফেসবুকে তারাবীহ সালাতের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, ইমাম সেখানে এত দ্রুত গতিতে তারাবীহ পড়াচ্ছেন, মনে হচ্ছে ইমামকে জ্বিনে ধরেছে বা তিনি এ ধরণের কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। কোথাও তিনি থামছেন না, আর মুক্তাদিরা তো পুরোই দিশেহারা। আমাদের সমাজের চিত্র পুরোপুরি এরকম না হলেও অনেকাংশে এর কাছাকাছি।

পবিত্র রমজানুল মোবারকে মহান আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ নিয়ে এরকম তামশা কখনো কাম্য নয়। সারাদিনের রোজা শেষে আমরা তারাবীহ সালাত আদায় করছি; কাকে দেখানোর জন্যে? আল্লাহকেই তো খুশি করার জন্য পড়ছি। তাহলে এত তাড়াহুড়া কিসের? যদি আল্লাহ আমার ইবাদত কবুল না করেন, তাহলে সময় ও কষ্ট উভয়ই তো বৃথা।

আল্লাহ এ ধরণের সালাত কবুল করবেন না। বরং এ ধরণের সালাত আদায়কারীদের উদ্দেশ্য মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ভয়ংকর ধমক বাক্য উচ্চারণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “অতএব জাহান্নাম সেসব নামাযীর জন্যে, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন”। (সূরা মাউন) এ আয়াতের তাফসিরে মুফাস্সিরগণ বলেন, এখানে ওই সকল লোকদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যারা সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে রুকু-সেজদা সঠিক নিয়মে আদায় করেন না, শুধু উঠাবসা করেন।

মুসনাদে আহমদের একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চুরি হলো নামাজে চুরি করা।’ সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, নামাজে কীভাবে চুরি করা হয়? তিনি বললেন, যথাযথ নিয়মে রুকু-সেজদা আদায় না করা অথবা রুকু সিজদায় মেরুদন্ড স্থির না করা।

সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে তাশরীফ আনলেন, ইতোমধ্যে একজন লোক মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করলেন। তারপর এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তুমি ফিরে গিয়ে পূণরায় নামাজ আদায় কর, কারণ, তুমি নামাজ আদায় করনি, (অর্থাৎ তোমার নামাজ সঠিকভাবে আদায় হয়নি)। লোকটি আবার নামাজ আদায় করলেন এবং পুনরায় এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিলেন। তিনি বললেন, আবার গিয়ে সালাত আদায় কর, কেননা, তুমি সালাত আদায় করনি। এভাবে তিনি তিনবার করলেন। তৃতীয়বারের পরে লোকটি বললেন, সেই মহান সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি এর চেয়ে সুন্দর করে সালাত আদায় করতে জানি না। কাজেই, আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন তিনি বললেন, যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন তাকবীর বলবে। তারপর কুরআন থেকে যতটুকু তোমার পক্ষে সহজ ততটুকু পড়বে। এরপর তুমি রুকু করবে। এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি রুকুতে থাকবে যাতে রুকু অবস্থায় তোমার শরীরের অবস্থা পুরোপুরি প্রশান্ত হয়ে যায়। এরপর রুকু থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে ধীরস্থির ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। এরপর তুমি সিজদাতে যাবে, এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সিজদায় পড়ে থাকবে যে, সিজদা অবস্থায় তুমি সম্পূর্ণ ধীরস্থির ও শান্ত হয়ে যাও। এরপর সিজদা হতে মাথা তুলে স্থির ভাবে বসবে। এভাবে তুমি তোমার পুরো নামাজ আদায় করবে।

এভাবে তারাবীহ সালাতে অনেক ইমাম সাহেব এতো দ্রুত তিলাওয়াত করেন মুসল্লিরা অনেক কষ্ট করেও কিছুই বুঝতে পারেন না। এগুলো পবিত্র কোরআনের সাথে অবমাননার শামিল। কোরআন নাজিলের এই বরকতময় মাসে এসব কখনো কাম্য নয়। আল্লাহ এ ধরণের তিলাওয়াত কবুল করবেন না এবং এ ধরণের তিলাওয়াত দিয়ে নামাজ আদায় হবে না।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তারতিলের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করো। অর্থাৎ ধীরস্থিরে ও বুঝে বুঝে কুরআন তেলাওয়াত কর। (সুরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৪)

মুফতি দিলাওয়ার হোছাইন, মুফতি ও সিনিয়র শিক্ষক, আজিজুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, রাজারকুল, রামু, কক্সবাজার।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!