নববধূকে বাসর ঘরে রেখে ফুটবল মাঠে ছুটেছিলেন যিনি

ফুটবল কতটা ধ্যানজ্ঞানে থাকলে কেউ বাসরঘর ফেলে খেলতে চলে যেতে পারেন তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ ‘অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু’।

কিছু জিনিস বদলানো যায় না। কোনো কোনো অর্জন একজনেরই থাকে। যেমন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক। তিনি দীর্ঘদিন মোহামেডানের অধিনায়কত্ব করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক। কিন্তু তার বড় গর্বের জায়গা স্বাধীন বাংলা দলের অধিনায়ক। এ খেতাব দেশের কেউ কেনো দিন অর্জন করতে পারবেন না।

এই জাকারিয়া পিন্টু মধ্য ষাটের দশকে যখন বিয়ে করেন তখন বাসররাতে নববধূকে একা রেখেই চলে গিয়েছিলেন ফুটবল খেলতে, যা ওই সময়ে তার সতীর্থদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। অবাক ও বিস্মিত হয়েছিলেন অনেকে। জাকারিয়া পিন্টু বিয়ে করেছিলেন প্রেম করে। প্রেমিকা যখন নববধূ তখন তিনি তাকে বাসায় রেখে আন্ত‍ঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলেন রাজশাহী।

তখন জাকারিয়া পিন্টু ছিলেন মোহামেডানের অধিনায়ক। থাকতেন পুরান ঢাকায়। স্ত্রী হাসিনা বেগমের সাথে তার প্রেম শুরু হয়েছিল বরিশাল বিএম কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায়। এ প্রেম নিয়েও আছে জাকারিয়া পিন্টুর মজার অনেক ঘটনা, যা গল্পের ছলে বলেন প্রায়ই।

দীর্ঘ প্রেম করে বিয়ে করলেন আর সেই নববধূর সঙ্গে বাসর না করে খেলতে গিয়েছিলেন। এটা কী করে সম্ভব? এমন প্রশ্ন অনেকবারই করা হয়েছিল জাকারিয়া পিন্টুকে। উত্তর একটাই- আমার পক্ষে একদিনও ফুটবল ছেড়ে থাকা সম্ভব ছিল না তাই বাসররাতে স্ত্রীকে ফেলে খেলতে চলে গিয়েছিলাম।

নববধূকে বাসর ঘরে রেখে ফুটবল মাঠে ছুটেছিলেন যিনি

গৌরবময় ইতিহাসে ভরা জাকারিয়া পিন্টুর ক্যারিয়ার। বাংলাদেশ নামের লাল-সবুজ দেশটির জন্মের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে দেশের সর্বকালের অন্যতম সেরা এ স্টপারের নাম। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী যখন এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে শুরু হয় দেশ স্বাধীনের লড়াই।

এমনকি খেলার মাঠেও শুরু হয় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার লড়াই। ভারতের মাটিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। জাকারিয়া পিন্টু ছিলেন সেই দলের অধিনায়ক।

তার নেতৃত্বেই ফুটবল মাঠে রচিত হয় গৌরবময় এক অধ্যায়। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে স্থানীয় দলের সঙ্গে প্রথম ফুটবল ম্যাচে অংশ নেয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। এ ম্যাচের আগে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া একটি দেশের এভাবে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা ছিল অকল্পনীয় এক ঘটনা। এর মধ্যে দিয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের মাটিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। দেশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি ফুটবল দলের এভাবে জনমত সৃষ্টি করা ছিল একটি বিরল ঘটনা। এ কারণেই ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন জাকারিয়া পিন্টু।

স্বাধীনতার পর দেশের এগিয়ে চলা ফুটবলের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টেডিয়ামে রাষ্ট্রপতি একাদশ ও মুজিবনগর একাদশের মধ্যে প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবনগর একাদশের অধিনায়ক ছিলেন তিনি।

এছাড়া একই বছর ১৩ মে ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতা মোহনবাগানের সঙ্গে প্রদর্শনী ম্যাচে তিনি বাংলাদেশ নির্বাচিত একাদশের অধিনায়ক এবং আসামের গৌহাটিতে সর্বভারতীয় লোকপ্রিয় বরদুলই ট্রফিতে ঢাকা একাদশের অধিনায়ক ছিলেন। জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ১৯তম মারদেকা ফুটবলে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেন জাকারিয়া পিন্টু।

জাকারিয়া পিন্টুর জন্ম নওগাঁয় ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি। নওগাঁ শহরের কৃষ্ণদেব হাই স্কুলের খেলার মাঠে তার ফুটবলে হাতেখড়ি হয়। এরপর তিনি চলে যান বরিশাল। ভর্তি হন মঠবাড়িয়া হাইস্কুলে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি খেলতেন রক্ষণভাগে।

১৯৫৭ সালে ইস্টএন্ডের হয়ে প্রথম বিভাগে খেলেন। ১৯৫৯ সালে যোগ দেন ঢাকা ওয়ান্ডারার্সে। ১৯৬১ সালে যোগ দেন মোহামেডানে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৫ বছর মোহামেডানে খেলে ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন। সেবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মোহামেডান।

খেলা ছেড়ে তিনি ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে কিছুদিনের জন্য মোহামেডান দলকে প্রশিক্ষণ দেন। ১৯৭৮ সালে ইংল্যান্ড থেকে ফুটবল প্রশিক্ষণের ওপর ডিপ্লোমা লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে সফরকারী দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে প্রীতি ফুটবল ম্যাচে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ, ১৯৮০ সালে কুয়েতে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেন। জাকারিয়া পিন্টু ১৯৭৮ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার এবং ১৯৯৫ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!