করোনা পরীক্ষার চাপ বাড়ছে সারাদেশে, কবর দিতেও বাধা আসছে

বাংলাদেশে কর্মকর্তারা বলেছেন, সাধারণ সর্দি কাশিসহ যে কোনো অসুস্থতার কারণে কারও মৃত্যু হলেই স্থানীয়ভাবে করোনাভাইরাসের পরীক্ষার দাবি তুলে কবর দিতে পর্যন্ত বাধা দেয়া হচ্ছে যা বড় রকমের চাপে ফেলেছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের।

গত ২৪ ঘন্টায় সর্দি কাশি এবং শ্বাসকষ্টজনিত কারণে দেশটির তিনটি জেলায় তিনজনের মৃত্যুর পর তাদের করোনাভাইসের পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগহ করে বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন করা হয়েছে। খবর বিবিসি বাংলার।

এরআগে গত সোমবার শ্বাসকষ্ট, জ্বর এবং শর্দি কাশিতে ১২ জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, নমুনা সংগ্রহ এবং করোনাভাইরাসের পরীক্ষাসহ এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের আস্থার অভাবের কারণে যেকোনো রোগেই পরীক্ষার দাবি আসছে।

কুষ্টিয়া, শেরপুর এবং দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা—এই তিনটি জায়গায় গত ২৪ ঘন্টায় জ্বর, কাশি এবং শ্বাসকষ্টে যে তিনজনের মৃত্যু হয়, এই জেলাগুলোর সিভিল সার্জনরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পর তাদের শরীরে করোনাইরাসের উপসর্গ ছিল বলে তাদের আত্নীয়-স্বজন এবং স্থানীয় লোকজন সন্দেহ করেন।

ফলে মৃত্যুর পর তাদের নমুনা সংগ্রহ করে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের মৃতদেহের মতো বিশেষ ব্যবস্থায় দাফন করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলছিলেন, তাদের জেলায় মৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ১০টি পরিবারকেও লকডাউনের মধ্যে রাখা হয়েছে।

গত রোববার দেশের বিভিন্ন জায়গায় শ্বাসকষ্ট, জ্বর বা সর্দিকাশি নিয়ে যে ১২ জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, তাদেরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল পরীক্ষার জন্য।

গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এনিয়ে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে। এই তথ্য জানিয়েছেন আইইডিসিআর এর পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর বলছিলেন, এখন যে কোনো অসুস্থতা এবং তাতে কারও মৃত্যু হলেই করোনাভারাসের পরীক্ষা করানোর জন্য তাদের কার্যক্রমের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

“এখন যেখানেই মানুষ মারা যাচ্ছে। কেউ একজন যদি বলে দেয় যে তার হাঁচি কাশি, সর্দি ছিল, তখনই সবাই মনে করছে, এটা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। গত রোববার ফেনীতে ১১৩ বছর বয়সের একজন মারা গেছেন বার্ধক্যজনিত কারণে। তারপরও তাকে কবর দিতে এলাকাবাসীতে বোঝাতে আমাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।”

“যেমন ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় গত শনিবার একজন মারা গেছেন। এরপর আমাদের কাছে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, আমরা বাড়িটা লকডাউন করে রেখেছি। আপনারা নমুনা না নিলে কবর দিতে দিব না। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেখা গেলো, পরীক্ষা নেগেটিভ এলো, মানে ঐ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না।”

আলমগীর আরও বলেছেন, “এরকম ক্ষেত্রে আমরা যেগুলো পরীক্ষা করেছি, কোনটাই করোনা পজিটিভ পাইনি। কিন্তু এটা এক ধরণের বাড়তি চাপ পড়ছে আমাদের ওপর।”

তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সময়টাতে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে সাধারণ সর্দি কাশি বা জ্বর হয়ে থাকে।

তাদের হিসাবে এ বছর জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি দুই মাসে প্রায় ৪০ জন এমন অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। গত বছর এই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৮ জনে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলেছেন, যেহেতু করোনাভাইরাসেরর পরীক্ষা এবং নমুনা সংগ্রহের তৎপরতায় এতদিন অনেক ধীর গতি ছিল। সেকারণে এই ব্যবস্থাপনা নিয়েই আস্থার সংকটের কারণে যে কোনো রোগ দেখা দিলেই মানুষ আতংকিত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলছিলেন, “রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেছে, তাদের হট্লাইনে একদিনে ৭০ হাজার ফোন এসেছিল। আমি হিসাব মিলাতে পারছি না। কারণ এর প্রতিটি কলে শুধু হ্যালো বললেই ২৪ ঘন্টা পার হয়ে যাওয়ার কথা। তাহলে মৌখিকভাবেই উপসর্গ বোঝার সময় কোথায়? ফলে অনেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন পরীক্ষা থেকে। এমন সব দূর্বলতাও মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

ঢালাও পরীক্ষার সুযোগ নেই
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, করোনাভাইরাসের পরীক্ষা ঢালাওভাবে করার সুযোগ নাই। এ ব্যাপারে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ নিয়ে একটা গাইডলাইন তৈরি করে তা মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের দেয়া হচ্ছে।

“এটা কেবল বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীর সংকট। আমরা মানুষকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তারা যেনো নমুনা দেয়ার জন্য হাসপাতালে না আসে। আমাদের ফোন করলে আমরা তার বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করবো। কিন্তু এটা সত্য যে সব মানুষের পরীক্ষা করা হবে না। কারণ এই পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক এখন সারাবিশ্বেই দুষ্প্রাপ্য। ফলে এ ব্যাপারে যুক্তির আশ্রয় নিতে হবে।”

সরকারি হিসাবে গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এনিয়ে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে।