চট্টগ্রামে মাঠে শুধুই নাছির, এমপি-মন্ত্রীরা ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’!

 

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দেশব্যাপী চলছে ১০ দিনের ছুটি। অঘোষিত এই লকডাউনে ঘরবন্দি বন্দরনগরীর ৭০ লক্ষ মানুষ। নগরবাসীর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দিনরাত কাজ করছেন পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু ক’দিন আগেও সিটি নির্বাচন নিয়ে মাঠ কাঁপানো রাজনৈতিক নেতা আর এমপি-মন্ত্রীদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! এ নিয়ে ব্যঙ্গ করে অনেকে বলছেন, এমপি-মন্ত্রীরা ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ আছেন।

তবে সবকিছু পেছনে ফেলে নগরবাসীর সেবায় মাঠে আছেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে ওই রোগীর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন সিটি মেয়র। এছাড়া নিজেই মাইক হাতে অলি-গলিতে টহল দেওয়া ছাড়াও সচেতনতামূলক মাইকিং করছেন তিনি। হাসপাতাল-মসজিদসহ বিভিন্ন এলাকায় নিজে গিয়েই ছিটাচ্ছেন জীবাণুনাশক।

এদিকে চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতিতে এমপি-মন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদদের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলেছেন, ক’দিন আগেও যারা ভোটের জন্য দুয়ারে দুয়ারে ধর্ণা দিয়েছেন, মানুষের এই দুর্দিনে তাদের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সময়ে অসময়ে অনেকেই লোকদেখানো সামাজিকতা নিয়ে হাজির হয়েছেন আগে। সাধারণ মানুষ চাইছে, নিয়ম মেনেই অন্তত খেঁটে খাওয়া মানুষগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সহ-সভাপতি ও কবি অনিন্দ্য টিটো নিজের ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘আ জ ম নাছির উদ্দীন ছাড়া আর কোনো নেতা নেই চট্টগ্রামে! হায়রে রাজনীতি…হায়রে হালুয়া রুটি…’

সেই পোস্টের কমেন্টে সেলিম চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, চট্টগ্রামে অনেক শিল্পপতি আছে কাউকেই তো দেখি না এগিয়ে আসতে। এই বেচারা একাই তো কষ্ট করতেছে দেখতেছি …।

সুজন আচার্য নামে আরেক ফেসবুক ইউজার লিখেছেন, হাইব্রিড নেতাদের দেশের এবং দলের দুঃসময়ে দেখা যায় না।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) যুগ্ম-মহাসচিব মহসীন কাজী লিখেছেন, ‘হালুয়া রুটি না, অনেকে অনেক বড় প্রকল্পের কমিশন খেয়ে লাল। তারা মনে হয় ফকিরকে ভিক্ষাও দেয় না। আবার বড় বড় গাল পারে। তার বিপরীতে নাছির ভাই অনেক অনেক মানবিক। তিনি যতক্ষণ পকেটে থাকে ততক্ষণ দেন।’

সাংবাদিক রাশেদ মাহমুদ নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, ‘করোনা দুর্যোগে নন্দিত চট্টগ্রামের নন্দিত মেয়র আ জ ম নাছির ছাড়া কাউকে এগিয়ে আসতে দেখছি না।’

বার্তাসংস্থা ইউএনবি’র চট্টগ্রাম প্রধান সাইফুল ইসলাম শিল্পী লিখেছেন, ‘চট্টগ্রামে সরকার দলীয় সব এমপি মন্ত্রীরা লকডাউনে! শুধু নগর পিতা নগর পরিষ্কারে ব্যস্ত। হবু মেয়রকেও দেখা যায় না এ দুর্দিনে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সমাজকর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে চার মন্ত্রী-উপমন্ত্রী আর হুইপ আছেন, সঙ্গে ১৪ এমপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত করোনা নিয়ে কারো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখলাম না। সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ১৯ জন। কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন ১৫০ এর উপরে। কিন্তু নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পরে কারো টিকিটিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না! সবাই একেবারে হোম কোয়ারেন্টাইন মেইন্টেইন করছেন! বিএনপির মেয়র প্রার্থী একজন চিকিৎসক হয়েও এই দুঃসময়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নিলেন না! সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ খুব কষ্টে আছেন, অন্তত রাজনীবিদ-সমাজপতিরা তাদের পাশে এসে দাঁড়াক।’

অঘোষিত লকডাউন শুরুর প্রথম দিন ২৬ মার্চ ফেসবুক লাইভে এসে নগরবাসীর উদ্দেশে সিটি মেয়র নাছির বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে আজকের স্বাধীনতা দিবস যেভাবে উদযাপন করার কথা ছিল সেভাবে উদযাপন করতে পারছি না। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক একটি বিষয়। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আহ্বান করেছেন সম্মিলিতভাবে করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করার জন্য। তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন, সবাই যেন বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত বাসা থেকে বের না হন। আর যারা সম্প্রতি বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন, তারা যেন অবশ্যই অবশ্যই ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে সকল নগরবাসীর কাছে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করবো আপনারা ধৈর্য ধারণ করুন। জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত কোনো অবস্থাতেই বাসার বাইরে আপনারা যাবেন না, ঘোরাফেরা করবেন না, কোনো জায়গায় আড্ডা দেবেন না। এবং আপনার এলাকায় কেউ বিদেশ থেকে এসেছেন এ সংবাদ যদি আপনি জানেন, তাহলে উনি হোম কোয়ারেন্টাইন করছেন কিনা তা অবশ্যই নিশ্চিত হবেন। না করলে উনাকে হোম কোয়ারেন্টাইন করার জন্য বাধ্য করবেন। আর উনি যদি সেটা মেনে না চলে তাহলে নিকটস্থ থানা বা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে অবহিত করুন।’

খেঁটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে মেয়র আজম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করবো, সমাজের বিত্তবান যারা আছেন, যাদের নিজস্ব প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ আছে, আমি সবার কাছে অনুরোধ জানাবো এই বিশেষ সময়ে একজন মানুষ হিসেবে মানবিকতার পরিচায় দেব। যার যার আশপাশে কর্মহীন যারা আছে , যারা দিনমজুর খেঁটে খাওয়া মানুষ আছে তাদের খাদ্য দিয়ে সহায়তা করবেন।’

রাজনীতিবিদদের এমন আচরণ কাঙ্ক্ষিত নয় মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মনে করি জনকল্যাণের জন্য রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। জনগণের দুঃসময়ে যদি রাজনীতিবিদরা তাদের পাশে না দাঁড়ায় – এটা কাঙ্ক্ষিত আচরণ হতে পারে না। এমন হতে পারে যে, নতুন ধরনের দুর্যোগ হওয়ায় তারা আতঙ্কিত। কিন্তু তারাতো চাইলেই প্রয়োজনীয় সেফটি মেজার অবলম্বন করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। বিধি-বিধান মেনেই মানুষকে সহায়তা করা যায়, এমনটাতো অনেকে করে দেখাচ্ছেন।’

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি জাতীয় দুর্যোগ। জনপ্রতিনিধিরা মাঠে থাকবেন এটাইতো প্রত্যাশা ছিল। জনগণের কাছে তাদের কমিটমেন্ট আছে। নগরের দায়িত্বে মেয়র আছেন, কিন্তু সংসদীয় আসনের এমপিদের কাজ কী? তারা যদি এই সময়ে মানুষের পাশে না আসেন তবে তো তাদের রাজনীতি মানুষের জন্য হবে না।’

এদিকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় রাজনীতিবিদ ও তাদের অনুসারীদের দৌড়ঝাঁপ কমে গেলেও নগরবাসীকে বাঁচাতে ঠিকই ছুটছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির। নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন মাস্ক, জীবাণুনাশক। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে নিজেই করছেন মাইকিং। সিটি কর্পোরেশন কর্মীদের শহরকে জীবাণুমুক্ত করতে ছিটাচ্ছেন জীবাণুনাশক।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, করোনা প্রদুর্ভাবের পর উদ্যোগে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যেগে গত ১৯ মার্চ জনসচেতনতার সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের সকল স্থানীয় পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে। ২০ মার্চ নগরের মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ প্রার্থনার আহ্বান ছিল সিটি মেয়রের। ২১ মার্চ নগরীর বিভিন্ন মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেন মেয়র। ২৩ মার্চ জনসমাগম এড়িয়ে চলতে নাগরিকদের সচেতন করতে মাইক হাতে রাস্তায় নামেন সিটি মেয়র। ওইদিন নগরের লালখান বাজার, ওয়াসা মোড়, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেইট, ষোলশহর রেল স্টেশন, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, জামালখান, কাজীর দেউড়ি, আন্দরকিল্লা, বকসির হাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ঘুরে ঘুরে মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালান। শনিবার (২৮ মার্চ) শ্রমজীবী জনসাধারণ কর্মহীনদের মাঝে নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন সিটি মেয়র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি মেয়র আজম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এ নগরের অবিভাবক। নগরবাসীকে সুস্থ রাখা এবং নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা। আমরা মাস্ক বিতরণ করেছি, নগরে জীবণুনাশক ছেটাচ্ছি। এছাড়া করোনা রোগী শনাক্ত হলে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালকে তৈরি রেখেছি। যতক্ষণ বেঁচে আছি, নগরবাসীর নিরাপত্তায় কাজ করে যাবো।’

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!