ইতালীয় ডাক্তারের হৃদয়বিদারক চিঠি

আমরা কাঁদছি, কাঁদছে নার্সরা! সবাইকে বাঁচানোর সামর্থ্য আমাদের নেই!

আমরা কাঁদছি, কাঁদছে নার্সরা! সবাইকে বাঁচানোর সামর্থ্য আমাদের নেই!

আনছার হোসেন
বিশ্ব ডেস্ক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে ইউরোপের দেশ ইতালি। উন্নত এই দেশটির উন্নত এক হাসপাতালের চিকিৎসক ড্যানিয়েল ম্যাসিনি। এই চিকিৎসক তাঁর দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতালিবাসির উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে। ইতালির মানুষ কাঁদছে, কাঁদছে মানবতা আর আত্মীয়তা। চোখের সামনেই মারা পড়ছেন স্বজন, অথচ কাছের গিয়ে দেখার সুযোগও হচ্ছে না পরিবারের সদস্যদের। ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে ‍দূর থেকে আপনজনদের শেষ বিদায় দিচ্ছেন ইতালিবাসি। সেই মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরেছেন ডা. ড্যানিয়েল ম্যাসিনি।

কক্সবাজার ভিশন ডটকম পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় জড়িত থাকা সেই চিকিৎসকের হৃদয় নিংড়ানো ভাষায় লেখা চিঠির কথা গুলো।

পড়ুন ডা. ড্যানিয়েল ম্যাসিনি’র লেখনিতে —

আমাদের দেশে এখন ঘটে চলছে ভয়াবহ এক ট্রাজেডি। বৃদ্ধ রোগীরা মারা যাবার আগে চোখের পানি ফেলছেন। কাছের মানুষদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাবার সৌভাগ্যও তাদের নেই। তারা একা একা মরতে চাননি, কিন্তু তাদের বিদায় জানাতে হচ্ছে ক্যামেরাকে। তারা সজ্ঞানে, সমস্ত কষ্টকে সহ্য করতে করতে মরে যাচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী ও স্ত্রী একইদিনে মারা যাচ্ছেন। বৃদ্ধ দাদা-দাদি, নানা-নানী তাদের নাতিদের মুখ শেষবারের মতোও দেখতে পাচ্ছেন না।

এই রোগ ফ্ল্যুর চাইতেও ভয়াবহ। বিশ্বাস করুন, ফ্ল্যুর চাইতে অনেক ভিন্নরকমের অসুখ এটি। এই রোগকে দয়া করে তাই ফ্ল্যু বলবেন না। জ্বর অসম্ভব বেশি। রোগীর দম এমনভাবে বন্ধ হয়ে আসতে চায়, যেন সে ডুবে যাচ্ছে। রোগীরা হাসপাতালে আসতে চায় না। শুধু একটু অক্সিজেন পাবার জন্য তারা বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এই রোগের বিরুদ্ধে খুব সামান্য কিছু ওষুধ কাজ করে। আমরা সাহায্য করার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু সবকিছুই নির্ভর করছে রোগীর অবস্থার উপর। বৃদ্ধ রোগীরা এই রোগের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছেন না।

আমরা কাঁদছি। আমাদের নার্সরা কাঁদছে। সবাইকে বাঁচিয়ে তুলবার সামর্থ্য আমাদের নেই। চোখের সামনে মেশিনে তাদের জীবন থেমে যেতে দেখছি প্রতিদিন। প্রচুর রোগী আসছে। অতি দ্রুত আমাদের আরও বেড প্রয়োজন হবে। সবার একই সমস্যা। সাধারণ নিউমোনিয়া। প্রচন্ড শক্তিশালী নিউমোনিয়া। আমাকে বলুন কোন ফ্ল্যু এই ট্রাজেডির জন্ম দেয়?

এই ফ্ল্যু অত্যন্ত সংক্রামক। এই ভাইরাসটি একেবারেই অন্যরকম। কোন কোন মানুষের জন্য ভয়ংকর। আমাদের দেশে ৬৫ উর্ধ্ব বৃদ্ধদের প্রায় প্রত্যেকের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিংবা কোন না কোন রোগ রয়েছে। কোন কোন তরুণদের জন্যও এই রোগ ভয়ংকর। এইসব তরুণ রোগীদের দেখলে কোন তরুণই নিজেকে নিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করতে পারবেন না।

আমাদের হাসপাতালে কোনো সার্জারি আর হচ্ছে না। বাচ্চাদের জন্ম, চোখের অপারেশন কিংবা ত্বকের চিকিৎসা। সার্জারি রুমগুলো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রূপান্তর করা হয়েছে। সবাই যুদ্ধ করছি কোরোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। প্রতি ঘন্টায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। ক্রমাগত হাতে আসছে টেস্ট রেজাল্ট। সব পজিটিভ। পজিটিভ! পজিটিভ!

সব রোগীর একরকমের কমপ্লেইন:
অসম্ভব জ্বর।
শ্বাস কষ্ট।
কাঁশি।
ডুবে যাবার মতো দমবন্ধ অনুভূতি।

প্রায় সবাই ইনটেনসিভ কেয়ারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ অক্সিজেন মাস্কের নিচেও শ্বাস নিতে পারছেন না। অক্সিজেন মেশিন এখন সোনার চাইতেও দামি।

বিশ্বাস করতে পারছি না, কি দ্রুত এসব ঘটে গেল! আমরা সবাই ক্লান্ত। কিন্তু কেউ থামতে চাইছি না। সবাই মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করে চলেছি। ডাক্তাররা নার্সদের মতো অবিরাম কাজ করে চলছেন।

দুই সপ্তাহ ধরে আমি বাসায় যাই না। আমার পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য আমি শংকিত। সন্তানদের সঙ্গে ক্যামেরা ব্যবহার করে কথা বলছি। মাঝে মাঝে আমি স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদি। আমাদের কারো কোন দোষ নেই। যারা আমাদের বলেছিল- এই রোগটি তেমন ভয়ংকর নয়, সমস্ত দোষ তাদের। তারা বলেছিল- এটি সাধারণ এক ধরণের ফ্ল্যু। কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর এখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে।

দয়া করে ঘরের বাইরে বের হবেন না। আমাদের কথা শুনুন। শুধুমাত্র ইমার্জেন্সি কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না।

সাধারণ মাস্ক ব্যবহার করুন। প্রফেশনাল মাস্কগুলো আমাদের ব্যবহার করতে দিন। মাস্কের অভাবে আমাদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে। কোন কোন ডাক্তার এখন আক্রান্ত। তাদের পরিবারের অনেকেই জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাই নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করুন। বয়স্ক পরিবার পরিজনকে ঘরে থেকে বের হতে দেবেন না। আমাদের পেশার কারণে আমরা ঘরে থাকতে পারছি না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা আমাদের রোগীদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নিজেদের শরীরে অসুখ ও ভগ্নহৃদয় নিয়ে ঘরে ফিরছি। যাদের বাঁচাতে পারছি না তাদের শরীরের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করছি।

কাল সব ঠিক হয়ে গেলে আমাদের কথা সবাই ভুলে যাবে। আমরা ডাক্তারদের এইটাই পেশা। তাই মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।

এই রোগ আপনাকে না ছুঁলেও সাবধানে থাকুন। জনসমাগম থেকে দূরে থাকুন। সিনেমায় যাবেন না, মিউজিয়ামে যাবেন না, খেলার মাঠে যাবেন না। দয়া করে বৃদ্ধ মানুষগুলোর দুঃখ অনুভব করার চেষ্টা করুন। তাদের জীবন আপনাদের হাতে। এবং আপনারা আমাদের চাইতে বেশি মানুষের জীবন বাঁচাতে সক্ষম। আপনিই তাদের রক্ষা করতে পারেন।

লেখাটি শেয়ার করুন। শেয়ার করুন যেন সমস্ত ইতালি এই চিঠিটি পড়তে পারে। সমস্ত কিছু শেষ হবার আগেই যেন পড়তে পারে।

Italy
Be Gavatseni hospital
Dr. Daniele Machini

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!