মাশরাফিই প্রথম দেখিয়েছেন বড় দলকে হারানো যায়!

ক্রিকেটে একটি কথা প্রায়ই উচ্চারিত হয়, তাহলো সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া। এতকাল জানা ছিল, সাফল্য তাকে আবেগতাড়িত করতে পারে না। তিনি কখনই জয়ে বা সাফল্যে উদ্বেলিত হন না। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকেন।

কিন্তু সেই মাশরাফি বিন মর্তুজা যে বিদায় বেলাতেও নির্লিপ্ত থাকতে পারেন, এমনটা ভাবেননি কেউই। মানুষ নাকি বেদনা-যন্ত্রণায় ‘নীল’ হয়। ক্রিকেট যার ধ্যান-জ্ঞান, ভাল লাগা-ভালবাসা সেই মাশরাফি বুঝি অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিতে গিয়ে বেদনায় ‘নীল’ হয়ে পড়বেন?

কোটি ভক্ত ও সমর্থকের তেমন ধারনাই ছিল। তারা ভেবে বসেছিলেন, জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব ছাড়ার মত বিরাট সিদ্ধান্ত নেয়া এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সময় বুঝি যন্ত্রনাকাতর মাশরাফি কান্নায় ভেঙ্গে পড়বেন। না হয় অশ্রুসজল চোখে বিদায়ের ঘোষণা দেবেন।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। মাশরাফি যতটা সম্ভব আবেগ সম্বরণ করে একজন সাহসী সেনাপতির মতই অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ৫ মার্চ (গতকাল) বৃহস্পতিবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের কনফারেন্স রুমে ৩৫ মিনিটের সুদীর্ঘ প্রেস কনফারেন্সে অধিনায়ক মাশরাফির সংবাদ সন্মেলনে কথা বলতে গিয়ে একবারের জন্য ঠোট কাঁপেনি। গলা ধরে আসেনি।

এই যে অধিনায়ক ক্যারিয়ারের অন্তিম মুহূর্তেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারা, সেটাই আসল বৈশিষ্ট্য মাশরাফির। আজ অধিনায়কত্বের বিদায়ের ঘোষণা দিতে এসেও মাশরাফি দেখিয়ে দিলেন আমি সাহসী সেনাপতি। নির্ভিক যোদ্ধা। ক্যারিয়ারের এমন এক মুহূর্তেও তাই স্বাভাবিক।

এটাই আসলে অধিনায়ক মাশরাফির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তিনি জানেন, জন্মালে মৃত্যু নিশ্চিত। ক্রিকেটারের জীবন অধিনায়কের ক্যারিয়ারেরও তেমনি শেষ আছে। একদিন বিদায় নিতে হবে, সরে যাওয়ার ঘোষণা দিতেই হবে। তাতে ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক।

তবে বিদায়ের বেদনায় নীল না হলেও বিদায়ের ঘোষণার মুহূর্তে ঠিকই ‘নীল’ ছিলেন মাশরাফি। জাতীয় দলের বর্তমান টিম স্পন্সর ‘আকাশের’ দেয়া প্র্যাকটিস জার্সির রংও যে নীল!

সেই নীল রংয়ের টি-শার্ট পরেই সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন বাংলাদেশের সব সময়ের সফল ওয়ানডে অধিনায়ক। বিশ্বকাপের পর মনে হচ্ছিল, খুব শিগগিরই ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে পারেন মাশরাফি। যে কোনোদিন, যে কোন মুহূর্তে আসতে পারে তার অবসরের ঘোষণা। সেটা শুধু অধিনায়ক পদে থেকে নয়, ভাবা হচ্ছিল ক্রিকেটার মাশরাফিও হয়তোবা তার বোলিং বুট খুলে রাখবেন।

কিন্তু যতই দিন গড়িয়েছে, ততই বদলেছে ধারনা। অধিনায়ক মাশরাফির অবসর নেয়ার বিষয়টি ক্রমেই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। এক সময় মাশরাফি নিজেই বলে বসেন, ‘আমি খেলাটা এনজয় করি। খেলতে চাই যতদিন পারি ততদিন।’

তবে অধিনায়কত্ব ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে কোনোরকম আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি। তারপরও প্রথমে মনে হচ্ছিল দেশের মাটিতে যেহেতু খুব সহসাই ওয়ানডে নেই, তাই জিম্বাবুয়ের প্রসঙ্গই বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল। জিম্বাবুয়েকে এনে হয়তো তাকে বিদায় দেয়ার একটা উপলক্ষ্য তৈরি করা হবে।

মাশরাফিই প্রথম দেখিয়েছেন বড় দলকে হারানো যায়!

তার অতি কাছের মানুষটিও ঘুর্ণাক্ষরে টের পাননি, তিনি গতকাল (৫ মার্চ) বৃহস্পতিবার সিলেট স্টেডিয়ামের কনফারেন্স হলে বসে হুট করে অধিনায়ক থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন। ২৪ ঘণ্টা আগেও বোঝা যায়নি, ৬ মার্চ শুক্রবার জিম্বাবুয়ের সাথে ম্যাচে শেষবার টস করতে নামবেন মাশরাফি। ওই ম্যাচই হবে ক্যাপ্টেন মাশরাফির শেষ!

বলা হয়- তিনিই বাংলাদেশের সব সময়ের সফলতম অধিনায়ক। আরও বলা হয়, মাশরাফি সত্যিকারের একজন ভাল মানুষ। অনেক বড় ক্রিকেটার। তার চেয়েও বড় অধিনায়ক, নেতা, অভিভাবক। সহযোগীদের অনুপ্রেরণা জোগানো আর ভাল খেলায় উদ্বুদ্ধ করায় যার জুড়ি মেলা ভার।

কিন্তু একটি বিষয় উহ্য থেকে যাচ্ছে, তাহলো মাশরাফি দেখিয়েছেন কিভাবে শত প্রতিকুলতা আর বাঁধা-বিপত্তিকে জয় করা যায়? প্রতিকুল অবস্থায়ও কিভাবে স্বাভাবিক থাকা যায়। আর তাই তো সাত-আটবার ইনজুরিতে পড়ে অপারেশন টেবিলে গিয়েও সে ধকল সামলে বারবার মাঠে ফিরে এসেছেন।

অধিনায়কত্ব পাবার পর প্রথম বিদেশ সফরে গিয়ে ইনজুরির শিকার হয়ে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিটকে পড়া। ৫ বছর পর নেতৃত্ব ফিরে পেয়েই দলকে টেনে তুলতে শুরু করেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঘরের মাঠে আবার দল পরিচালনার দায়িত্ব লাভ। তাতেই বীরের মত ফেরা। ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়েকে হোয়াইটওয়াশ করা দিয়েই শুরু হয়েছিল অধিনায়ক মাশরাফির দ্বিতীয় ও আসল ইনিংস। আর তা রহাত ধরেই ধীরে ধীরে ওয়ানডেতে ভাল দলের তকমা গায়ে মাখে বাংলাদেশ।

তারপর একে একে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মত বিশ্ব শক্তির বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ বিজয়ের কৃতিত্বও অর্জিত হয়। ক্রিকেটে একটি কথা প্রায়ই উচ্চারিত হয়, ‘সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া।’

তার নেতৃত্ব ক্ষমতা, দল পরিচালনা গুণের কথাই বেশিবেশি উচ্চারিত হয়। অধিনায়ক মাশরাফি টাইগারদের শিখিয়েছেন কিভাবে বড় দলকে হারাতে হয়?

বড় দল বধে সবার আগে প্রয়োজন সাহস, উদ্যম আর দৃঢ় সংকল্প- সেটাও মাশরাফিই দেখিয়েছেন। কিন্তু অনেকেই হয়ত ভুলেই গেছেন যে, পারফরমার মাশরাফি অধিনায়ক হবার আগে পারফরমেন্স দিয়েই দেখিয়েছেন কিভাবে ম্যাচ জেতাতে হয়?

বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৪ সালের নভেম্বরে অধিনায়কত্ব ফিরে পাবার পর ক্যাপ্টেন মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ একের পর এক বড় বড় দলকে হারাতে শুরু করেছে।

আর তার আগে বাংলাদেশের দু দুটি অবিস্মরণীয় জয়ের ম্যাচ সেরা ছিলেন পারফরমার মাশরাফি। দুটিই ভারতের বিপক্ষে। একটি ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার ক্রীড়াকেন্দ্র বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। ভারতকে ১৫ রানে হারানোর মিশনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পারফরমার মাশরাফি (৩৯ বলে ৩১ নট আউট ৩৬ রানে দুই মেডেন সহ ২ উইকেট)। এমন অলরাউন্ড পারফরমেন্সে জয়ের রূপকার ও ম্যাচ সেরার পুরষ্কারও জিতেছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওয়ানডেতে সেটাই ছিল ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়।

আর ঠিক তিন বছর পর ২০০৭ সালে আবার ভারত বধ মিশনের হিরো মাশরাফি। সেটা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মাটিতে বিশ্বকাপে। ভারতের বিপক্ষে তামিম , সাকিব আর মুশফিকের ‘ফিফটিতে’ ৫ উইকেটের অবিস্মণীয় ও ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে ৩৮ রানে ৪ উইকেট দখল করে আসল রূপকার কিন্তু ‘পেসার মাশরাফি।

তার মানে হলো অধিনায়ক মাশরাফি সফল ও দক্ষ অধিনায়ক হবার আগে থেকেই সাহসী যোদ্ধা। বড় দলের বিপক্ষে খেলতে নেমে ডর ভয়ের বালাই ছিল না তার। বরং অনেক বেশি সাহসী, নির্ভীক আর অকুতোভয় যোদ্ধা ছিলেন পারফরমার মাশরাফি।

এই যে পারফরমার হিসেবে বড় ও তুলনামুলক শ্রেয়তর দলের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো পারফরমেন্স করার সাহস , উদ্যম ও দৃঢ় সংকল্প- সেটাই পরবর্তীতে সফল, স্বার্থক আর সাহসী অধিনায়ক হিসেবে পরিণত করেছে মাশরাফিকে।

আর সেটাই পরবর্তীতে বাকিদের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। অধিনায়ক, বড়ভাই মাশরাফি সহযোগিদের সাহস জুগিয়েছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন, কিভাবে বিশ্ব শক্তির বিপক্ষে বীরের মত লড়ে দল জেতানো যায়? তাতেই দিনকে দিন পাল্টেছে টিম বাংলাদেশের চেহারা।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!