নাটকীয় জয়ে সিরিজ ঘরে তুললো বাংলাদেশ

মাশরাফিদের রীতিমত ভয় পাইয়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে যে দলটি শুরুতে রান তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল, সেই দলই শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে দারুণ রোমাঞ্চ উপহার দিল। তবে শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি সফরকারীরা। বরং ৪ রানের জয় নিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ ঘরে তুলেছে টাইগাররা।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার তামিম ইকবালের রেকর্ডময় ইনিংস আর মুশফিকুর রহিমের ফিফটির ইনিংসে ভর করে ৮ উইকেটে হারিয়ে জিম্বাবুয়ের সামনে ৩২৩ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ। জবাবে ৮ উইকেট হারিয়ে ৩১৮ রান তুলতে পারে জিম্বাবুয়ে।

লক্ষ্য তাড়ায় ব্যাট করতে নেমে শুরুটা ভালো হয়নি জিম্বাবুয়ের। সফরকারী দলের ওপেনার রেগিস চাকাভাকে লিটনের ক্যাচ বানিয়ে বিদায় করেন টাইগার পেসার শফিউল ইসলাম। এরপর অবিশ্বাস্য এক থ্রোয়ে জিম্বাবুয়ের ব্রেন্ডন টেইলরকে রান আউট করেন মিরাজ। দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের পর বল হাতে শন উইলিয়ামসের (১৪) উইকেট তুলে নেন মিরাজ।

৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা জিম্বাবুয়ের হয়ে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন টিনাশে কামুনহুকামউই। তুলে নেন দারুণ এক ফিফটি। তবে সফরকারী দলের এই ওপেনারকে বেশিক্ষণ টিকতে দেননি তাইজুল। এই বাঁহাতি স্পিনারের বলে মিডল স্ট্যাম্পের বেল ভেঙে গেলে শেষ হয় তার ৭০ বলে ৫১ রানের ইনিংস।

এরপর ৮১ রানের জুটি গড়েন ওয়েসলে মাধেভেরে ও সিকান্দার রাজা। জুটি গড়ার পথে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি তুলে নেন যুব বিশ্বকাপের তারকা মাধেভেরে। তাইজুলের শিকার হয়ে মাধেভেরে (৫২) বিদায় নেওয়ার পর ফিফটি তুলে নেন রাজাও। তবে ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা রাজাকে (৫৭ বলে ৬৬) ফিরিয়ে ব্রেক থ্রো এনে দেন মাশরাফি। এর আগে রিচমন্ড মুতুম্বামিকে (১৯) দ্রুত বিদায় করেন তাইজুল।

২২৫ রানে ৭ উইকেট হারিয়েও লড়াই থেকে ছিটকে যায়নি জিম্বাবুয়ে। বরং টিনোটেন্ডা মুতুম্বোদজি আর ডোনাল্ড তিরিপানো মিলে টাইগার বোলারদের কঠিন সময় উপহার দিয়েছেন। এই দুজনের ঝড়ে ১৮ বলে ৪১ রান থেকে শেষ দুই ওভারে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৪ রান। নিজের নবম ও ইনিংসের ৪৯তম ওভারে শফিউল খরচ করলেন ১৪ রান।

শেষ ওভারে দরকার ছিল ২০ রান। আল-আমিনের করা ওই ওভারের দ্বিতীয় বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ তুলে দেন ২১ বলে ৩৪ রান করা মুতুম্বোদজি। এর আগে দুজনের জুটিতে আসে ৪৩ বলে ৭৮ রান। কিন্তু তিরিপানো থামার পাত্র নন। স্ট্রাইকিং প্রান্তে গিয়েই পরপর দুই ছক্কা মারেন তিনি। তবে পঞ্চম বলে ডট আর শেষ বলে ১ রান খরচ করেন আল-আমিন। ২৮ বলে ৫৫ রানের ঝড় তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত দলে নাম লেখান তিরিপানো।

বল হাতে বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল তাইজুল। ৩ উইকেট তুলে নিয়েছেন এই স্পিনার। ১টি করে উইকেট তুলে নিয়েছেন মাশরাফি, শফিউল, মিরাজ ও আল-আমিন। এর মধ্যে আল-আমিন ছিলেন সবচেয়ে খরুচে (১০ ওভারে ৮৫ রান)। কম যাননি শফিউলও (৯ ওভারে ৭৬)।

এর আগে টসে জিতে ব্যাটিং করতে নেমে শুরু থেকেই দুর্দান্ত ব্যাটিং প্রদর্শনীতে ১০৬ বলে ১২তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন তামিম। এরপর ২৩ ইনিংস ও প্রায় দুই বছর পর পাওয়া সেঞ্চুরিকে দেড়শ’তেও পরিণত করেছেন তিনি। এজন্য এই বাঁহাতি ওপেনার খেলেছেন ১৩২ বল। এরপরও অবশ্য থামেননি তিনি। ছক্কা হাঁকিয়ে নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙেছেন।

ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড তামিমের দখলেই ছিল। এবার সেই রেকর্ড তিনি নিজেই ভেঙেছেন। এর আগে ২০০৯ সালে বুলাওয়েতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ১৫৪ রান করেছিলেন তিনি। ১০ বছরের বেশি সময় অক্ষত ছিল এই রেকর্ড। তবে এবার রেকর্ড স্পর্শ করে ৪ রান যোগ হতেই বিদায় নিয়েছেন তামিম। ১৩৬ বলে তার ১৫৮ রানের ইনিংসটি ২০টি চার ও ৩টি ছক্কায় সাজানো।

বিদায় নেওয়ার আগে একটি অসাধারণ রেকর্ড গড়েছেন তামিম। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের মালিক এতদিন ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল (১৫৪৯)। তাকে পেছনে ফেলে এখন শীর্ষে তামিম (১৫৫৬)। ১৪০৪ রান নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছেন সাকিব আল হাসান।

রানে ফেরার দিনে আরও একটি অনন্য কীর্তি গড়েছেন তামিম। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে ৭ হাজার রানের মাইলফলক গড়েছেন তিনি। ৫০ ওভারের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ৪৮তম ফিফটিকে ১২তম সেঞ্চুরির দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে এই মাইলফলকের চূড়ায় ওঠেন ৩০ বছর ব্যাটসম্যান। তাকে ৭ হাজারি ক্লাবে নাম লেখাতে খেলতে হয়েছে ২০৬ ম্যাচ ও ২০৪ ইনিংস। গড় ৩৫.৮৭।

বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৩ হাজার রানের চূড়াও স্পর্শ করেন তামিম। অবশ্য এই কীর্তি তিনি আগেই গড়েছিলেন। তবে তার আগের ১৩০১৪ রানের মধ্যে আইসিসি বিশ্ব একাদশের হয়ে ছিল ৫৭ রান।

ব্যাটিং করতে নেমে জিম্বাবুয়ের পেসার কার্ল মুম্বার করা ইনিংসের ৭ম ওভারে তামিমের শটে বল বোলারের হাতে লেগে নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তের স্ট্যাম্প ভেঙে দেয়। ফলে রানের জন্য ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া লিটন দুর্ভাগ্যজনক রান আউটের শিকার হয়ে ফেরেন। আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান লিটন এই ম্যাচে করলেন ১৪ বলে ৯ রান।

লিটনের পর দুর্ভাগ্যের শিকার হন নাজমুল হোসেন শান্তও। এবার রান নিতে না চাইলেও তামিমের ‘ইয়েস’, ‘নো’, ‘ইয়েস’র বিভ্রান্তিতে পড়ে বিদায় নেন শান্ত। এরপর ব্যাটিংয়ে নেমে ৪৭ বলে ঝড়ো ফিফটি তুলে নেন মুশফিকুর রহিম। ২৬তম ওভারে ওয়েসলি মাধেভেরের চতুর্থ বলে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে ৫০ বলে ৬টি চারে ৫৫ রান আসে তার ব্যাট থেকে।

মুশির বিদায়ের পর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে ১০৬ রানের জুটি গড়েন তামিম। মাহমুদউল্লাহও দারুণ ব্যাট করছিলেন। কিন্তু তুলে মারতে গিয়ে জিম্বাবুয়ের মাধেভেরের অসাধারণ এক ক্যাচে পরিণত হন ৫৭ বলে ৪১ রান করা এই ব্যাটসম্যান। এরপর মোহাম্মদ মিঠুনের সঙ্গে ৩৪ রান যোগ করে বিদায় নেন তামিম।

তামিম বিদায় নেওয়ার পর মুম্বার বলে বোল্ড হয়ে বিদায় নেন মেহেদি হাসান মিরাজ (৫)। টিকতে পারেননি মাশরাফিও (১)। তিরিপানোর করা ইনিংসের ৪৯তম ওভারে মাশরাফির পর কোনো রান না করেই বিদায় নেন তাইজুল। শেষ ওভারে মিঠুন আর শফিউল মিলে যোগ করেন ৯ রান। মিঠুন অপরাজিত থাকেন ১৮ বলে ৩২ রান নিয়ে।

ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হয়েছেন টাইগার ওপেনার তামিম ইকবাল।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!