ঘোষণা দিয়ে লবণ শিল্পই বন্ধ করে দিতে বলল বিএনপি!

আনছার হোসেন
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি লবণ শিল্পটিকে পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। তাদের দাবি, লবণ আমদানির মাধ্যমে এই শিল্পকে ধ্বংস করতে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী এমন দাবি করে বলেছেন, সরকার যদি বিদেশি লবণ আমদানি কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশের লবণ শিল্পকেই ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হোক, যাতে কোন চাষ কে আর লবণ চাষ করে সর্বস্ব হারিয়ে যেন পাওনাদারের ভয়ে মাঠ ছেড়ে পালাতে না হয়।

রোববার (পহেলা মার্চ) দুপুরে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে জেলার লবণ উৎপাদন ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ওই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

শাহজাহান চৌধুরী বলেন, একদিকে মাঠে পড়ে আছে লাখ লাখ মেট্রিক টন লবণ, অন্যদিকে শিল্প লবণের নামে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে সেই লবণকে খাদ্য লবণে প্রক্রিয়াজাত করছে আমদানিকারক নামধারি কতিপয় রক্তচোষা! আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে সকল চাষীরা মাঠে লবণ উৎপাদন করছেন সেই সকল চাষীরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মাঠ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

তাঁর মতে, যেহেতু চাষীরা ঋণ কিংবা দাদন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, সেহেতু সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যারাও মাঠে আছেন তারাও যে কোন সময় মাঠ ছেড়ে পালানোর চেষ্টায় আছেন!

তিনি লবণ শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের উদ্দেশ্যে তিনটি দাবি তুলে ধরেন। ওই তিন দাবি হলো, চাহিদা মোতাবেক শিল্প লবণ আমদানি হোক। কিন্তু চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত শিল্প লবণ আমদানি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, (২) যে সব কোম্পানি শিল্প লবণ আমদানি করে তারা যেন প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ বাজারজাত করতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে ও (৩) সরকারি উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য প্রতিকেজি ১৫ টাকা নির্ধারণ করতে হবে, নয়তো চাষীদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য প্রতিকেজি ১৫ টাকা দামে সরাসরি লবণ কিনতে হবে।

শাহজাহান চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানান, দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন অঞ্চল হলো কক্সবাজার জেলা। তারপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় লবণ উৎপাদন হয়। এছাড়া দেশের আর কোথাও লবণ উৎপাদন হয় না কিংবা উৎপাদন উপযোগী পরিবেশ নাই।

তাঁর দেয়া তথ্য মতে, কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ উপজেলাতেই মূলতঃ দেশের চাহিদার সব লবণ উৎপাদিত হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী এবং আনোয়ারা উপজেলায় মাত্র ৫০ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে লবণ চাষ হচ্ছে। এসব এলাকা ছাড়াও কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী ও ইসলামপুর ইউনিয়নে বর্তমানে প্রায় ৩৪ একর জমিতে পলিথিন ছাড়া আধুনিক পদ্ধতিতে লবণের চাষ করা হচ্ছে।

ঘোষণা দিয়ে লবণ শিল্পই বন্ধ করে দিতে বলল বিএনপি!

তিনি জানান, দেশে প্রায় ৬২ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়। বিগত ২/৩ বছরে সরকারের মেগাপ্রকল্পের কার্যক্রমের কারণে জমি অধিগ্রহণ করে নেয়ায় প্রায় ১৪ হাজার একর লবণ চাষের জমি কমে গেছে, যেখানে এখন আর চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, একদিকে সরকারের মেগাপ্রকল্পের কারণে কমে গেছে ১৪ হাজার একর, অন্যদিকে চাষীরা লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষাবাদ থেকে বাদ পড়েছে আরও ১২ হাজার একর জমি। এতো সংকটের পরও দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ লবণ চাষের সাথে জড়িয়ে আছেন। যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে লবণ চাষের সাথেই নিজেদের জীবন-জীবিকার নির্ভরশীল হয়ে আছেন। যাদের অধিকাংশই কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা।

২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে লবণের হালচাল
সংবাদ সম্মেলনে শাহজাহান চৌধুরী জানান, দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে খাদ্য লবণের চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন আর শিল্প লবণের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন। অথচ দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ।

ওই প্রতিবেদনের তথ্য মতে, এই অর্থবছরে দেশে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন শিল্প লবণ আমদানি করা হয়েছে। যার মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ মেট্রিক টন, হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন।

শাহজাহান চৌধুরী আক্ষেপ করে বলেন, অবাক হওয়ার মতো তথ্য হলো, বাংলাদেশি চাষীদের উৎপাদিত প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন লবণ মাঠেই পড়ে আছে। এতো বিপুল পরিমাণ লবণ থাকার পরও সরকারের ছত্রছায়ায় কতিপয় রক্তচোষা আমদানিকারক ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন লবণ আমদানি করেছে!

তিনি জানান, চলতি বছর লবণ উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে ১০ টাকা, অথচ মাঠে লবণের বিক্রি মূল্য মাত্র ৪ টাকা কেজি। অপরদিকে বর্তমানে বাজারে যে প্যাকেটজাত যে লবণ পাওয়া যায় তা প্রতি কেজির মূল্য ৩০ থেকে ৩৮ টাকা। উৎপাদন মাঠ ও বর্তমান খুচরা বাজারে লবণের দামের এই বিশাল পার্থক্য চাষীদের লবণ চাষে অনুৎসাহিত করে তুলছে।

শাহজাহান চৌধুরীর মতে, মাঠে লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষীদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। চাষীরা যারা বিভিন্ন ব্যবসায়ি থেকে অগ্রিম (দাদন) নিয়ে লবণ চাষে মাঠে নেমেছিলেন তারা যখন নিশ্চিত জানতে পারছেন, দাদনের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না তখন তৈরি করা মাঠ ফেলে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, আমাদের নেয়া তথ্য মতে, ইতোমধ্যে চার ভাগের এক ভাগ চাষী মাঠ ছেড়ে পালিয়েছেন। অন্য চাষীরাও পালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন।

কেন এই দূরাবস্থা
সংবাদ সম্মেলনে শাহজাহান চৌধুরী জানান, দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো, যারা শিল্প লবণ হিসেবে হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট আমদানি করেন তারা তা প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করছেন। যা দেশের লবণ শিল্পকে শতভাগ ধ্বংস করে দেয়ার আশংকায় ফেলে দিয়েছে।

তিনি জানান, মেডিকেল তথ্য মতে, শিল্প লবণ প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করার কারণে সাধারণ মানুষের কিডনী ও লিভার ড্যামেজসহ নানা ধরণের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক জামিল ইব্রাহিম চৌধুরী, দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি অধ্যাপক আজিজুর রহমান, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেজর (অব.) আব্দুল মাবুদ, মহেশখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক, কেন্দ্রীয় যুবদলের সদস্য এম. মোক্তার আহমদ, জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আমীর আলী, ঈদগাঁও সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ শফিউল আলম, জেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রাশেদুল হক রাসেল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ সরওয়ার রোমন, সাবেক ছাত্রনেতা আবছার কামাল, মহেশখালী বিএনপি নেতা আকতার হোসাইন প্রমূখ।

error: Content is protected!! অন্যের নিউজ নিয়ে আর কতদিন! এবার নিজে কিছু লিখতে চেষ্টা করুন!!