মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলছে আইওএম

মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলছে আইওএম

আনছার হোসেন মহেশখালী থেকে ফিরে
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

রোমেনা আকতার আর মারুফা নাসরিন রূপা। কক্সবাজার থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর গ্রাম্য জনপদের দুই তরুণী। দু’জনই কলেজ ছাত্রী। এই দুই তরুণী শুধু পড়ালেখা নিয়েই বসে থাকেননি, পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন অনলাইন ব্যবসায়। নিজেদের গড়ে তুলেছেন উদীয়মান ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে।

এই দুই তরুণীর সাথে যুক্ত রয়েছেন আরও ৭ যুবক। তারা ৯ জন মিলে গড়ে তুলেছেন অনলাইনে বিষমুক্ত শুটকি বিকিকিনির ব্যবসা প্রতিষ্টান ‘ই-বিজনেস সেন্টার’। এখান থেকেই ওই তরুণ-তরুণীরা মাঠ পর্যায় থেকে বিষমুক্ত শুটকি মাছ সংগ্রহ করে অনলাইনে দেশের নানাপ্রান্তে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। আর তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন প্রতিষ্টান ‘দারাজ’।

আর এই ৯ তরুণকে সফল ‘উদ্যোক্তা’ হিসেবে তুলে এনেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। আইওএম এই তরুণদের আর্থিক ও কারিগরী সহযোগিতা আর প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

দেশের দ্রুততম ইন্টারনেট গতির মাধ্যমে মহেশখালীকে একটি বিচ্ছিন্ন উপদ্বীপ থেকে একটি উদীয়মান প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করতে সহায়তা করছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। সেই প্রকল্পেরই সুবিধাভোগী রোমেনা আকতার, মারুফা নাসরিন রূপা, সানাউল্লাহ, দিদারুল ইসলাম, মোহাম্মদ খায়রুল আমিন, মো. আলতাফ উদ্দিন, মাহমুদুল হক ছোটন আর তানভীর আলম।

কক্সবাজার জেলার অন্যতম দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ গড়ে তুলতে তিনবছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে আইওএম। এই প্রকল্পটি আইওএম বাংলাদেশ মিশনের প্রথম পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প। আইওএম, কোরিয়া টেলিকম, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলছে আইওএম

২০১৭ সাল থেকে এই প্রকল্পের মাধ্যমের অনুন্নত ও প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপটির পৌর এলাকা ও দুইটি ইউনিয়ন ছোট মহেশখালী ও বড় মহেশখালীতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করছে আইওএম।

আইওএম মহেশখালী দ্বীপে এই প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা সদরে বিদ্যমান বিটিসিএলের টাওয়ার সংস্কার ও গিগা মাইক্রোওয়েভ স্থাপন করে মহেশখালীর বাসিন্দাদের মাঝে ১০০ এমবিপিএসেরও বেশি গতির ইন্টারনেট সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে।

মহেশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড একটি বহুমুখী প্রকল্প, যা বাংলাদেশের অন্যতম বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীটিকে দেশের দ্রুততম গতির ইন্টারনেট মাধ্যমে বিশ্বের সাথে যুক্ত করেছে।’

মহেশখালী দ্বীপ সরেজমিন ঘুরে এসে দেখা গেছে, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা স্থানীয় জনগোষ্ঠীটিকে উন্নত স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের পরিষেবাগুলো নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্বীপটির বাসিন্দাদের শিক্ষার সরঞ্জামাদি এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য অনলাইন স্বাস্থ্য পরিষেবাও দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় শুটকি উৎপাদনকারিদের উৎপাদিত শুটকি বিক্রির জন্য ই-কমার্সের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড দ্বীপ’ উদ্যোগও বাংলাদেশের অগ্রগতির একটি অংশ হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মহেশখালী দ্বীপটিকে এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল এই কারণে যে, এটিতে বাংলাদেশের অন্যতম স্বল্প-উন্নত জনগোষ্ঠীর বসবাস। এখানে নিরক্ষরতার হার বেশি এবং মাটির লবণাক্ততা কৃষিফলনকে বাধাগ্রস্থ করে চলেছে। স্থানীয় যুবসমাজ দ্বীপ থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। ফলে এই দ্বীপের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিল। ‘ডিজিটাল দ্বীপ প্রকল্পটি’র লক্ষ্য ছিল সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বিদ্যমান জনসুবিধাদির আরও প্রসার ঘটিয়ে মহেশখালীর বাসিন্দাদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।

আইওএম ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর এই দ্বীপে আয়োজন করেছিল ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড ফেস্ট’। এই আয়োজনে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও বাসিন্দারা নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং ভিডিও-অনলাইনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ‘ডিজিটাল দ্বীপ’কে তুলে ধরেছিলেন।

‘ডিজিটাল দ্বীপে’র বাসিন্দারা কী পাচ্ছেন
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫টি স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্টান ১০০ এমবিপিএসেরও বেশি স্পিডের ইন্টারনেট পাচ্ছে।

জাগো ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্টানের মাধ্যমে দশটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দূর-শিক্ষণ পরিষেবা দেয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় রাজধানী ঢাকার শিক্ষকরা মহেশখালী দ্বীপের শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ইংরেজী কোর্সে শিক্ষা দেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি ই-টিচিং এবং ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষকদের সক্ষমতা উন্নত করছে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেয়া শিক্ষা-উপাদানগুলো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ হিসেবে গড়ে তুলছে আইওএম

কীটনাশক এবং সংরক্ষণকারী রাসায়নিক উপকরণগুলোর ব্যবহার কমিয়ে স্থানীয়দের জৈব কৃষি এবং অর্গানিক পদ্ধতিতে মাছ শুকানোতে উৎসাহিত করছে এই প্রকল্প। পাশপাশি ই-কমার্সের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মাধ্যমে আয় বাড়ানো ও মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্য দূর করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

চারটি কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক এবং একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে মোবাইল স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। এসব পরিষেবাগুলো হলো স্বয়ংক্রিয় স্বাস্থ্যগত রেকর্ড সিস্টেম, টেলিমেডিসিন পরামর্শ, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে নির্ণয়, যেমন- মূত্র পরীক্ষক, আল্ট্রাসাউন্ড ডিভাইস এবং রক্ত পরীক্ষক ইত্যাদি।

স্থানীয় এবং সরকারী কর্মকর্তাদের কম্পিউটার দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে আইওএমের গড়া ডিজিটাল সেন্টারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি কমিউনিটি ক্লাব এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কম্পিউটার এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।

কী বলছেন তাঁরা
এই প্রকল্প সম্পর্কে মহেশখালী পৌরসভার মেয়র মকছুদ মিয়া বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে মহেশখালীবাসি অনেক সুফল পাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঢাকার মতো শিক্ষা পাচ্ছে। কৃষকরাও সুফল পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, মাত্র ৩ বছরে মহেশখালীকে ডিজিটাল আইল্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এই দ্বীপকে ডিজিটাল দ্বীপ হিসেবে একশ ভাগ সফলতা পেতে হলে এই প্রকল্প চলমান রাখতে হবে।

তিনি মনে করেন, এখন পৌরসভাসহ যে ৩ ইউনিয়নে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ প্রকল্পের কাজ চলছে তা ১০০ ভাগ সফল হওয়ার পর অন্য ৭টি ইউনিয়নকে এই প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। তার আগে সব ইউনিয়নে একসাথে কাজ শুরু করলে পুরোপুরি সফলতা পাওয়া যাবে না।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্পটির মাধ্যমে দ্বীপে পজিটিভ পরিবর্তন এসেছে। সুফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, টেলিমেডিসিন, দুর-শিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কমিউনিটি ক্লাবের মাধ্যমে সেবা পাচ্ছেন জনগণ।

তাঁর মতে, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ দাপ্তরিক কাজ করছে। ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন সারাদেশের সবগুলো উপজেলার মধ্যে ১৪তম অবস্থান করে নিয়েছে।

এদিকে সোমবার (২৭ জানুয়ারি) মহেশখালী দ্বীপে একদল সাংবাদিককে মহেশখালী ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্প নিয়ে ব্রিফিং করেছেন আইওএমের টিআরডি প্রকল্পের প্রধান প্যাট্রিক ক্যারিজন, প্রকল্পের ফোকাল মো. রেজাউল আল মাসুম, পাবলিক ইনফরমেশন অফিসার জর্জ ম্যাকলিয়ড, ন্যাশনাল কমিউনিক্যাশন অফিসার তারেক মাহমুদ।

তাঁরা বলেন, ডিজিটাল আইল্যান্ড প্রকল্পটি কোরিয়ান টেলিকমের সহায়তায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মহেশখালী দ্বীপের একটি পৌর এলাকা ও দুইটি ইউনিয়ন এলাকায় দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

তাদের মতে, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি শুরু হলেও ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহেশখালীকে ‘ডিজিটাল আইল্যান্ড’ ঘোষণা দিয়েছেন। তারপর থেকে আইওএম ২৯টি লোকেশনে কাজ করছে।