চালের দামের নিয়ন্ত্রক এখন ৫০ চালকল

বেড়েই চলেছে চালের দাম, চরম দুর্ভোগে নিম্ন আয়ের মানুষ

এক বছর পর আবার চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে সরু চালের দাম এক মাসের ব্যবধানে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দাম যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাজারে খোঁজখবর নেওয়ার কাজ চলছে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) পক্ষ থেকে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কাছে দেশের চালের বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতার অবস্থা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বিআইডিএস বলছে, দেশে সারা বছরে যত চাল কেনাবেচা হয়, এককভাবে তার সবচেয়ে বড় অংশ এখন ৫০টি বড় চালকল প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের অনুরোধে করা ওই গবেষণা প্রতিবেদনের প্রাথমিক ফলাফল গতকাল সোমবার চূড়ান্ত করে জমা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, চালের বাজারে অটো চালকলগুলো সবচেয়ে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে। এগুলোর মোট সংখ্যা ৯৪৯। ধান কেনা ও মজুত থেকে শুরু করে তা ভাঙিয়ে চালে পরিণত করা পর্যন্ত তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাজারে কত দামে চাল বিক্রি হবে, তা–ও বড় চালকলমালিকেরা নির্ধারণ করছেন। এমনকি চাল আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও তাঁদের ভূমিকা প্রধান।

প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সাধারণ মানুষের কাছে পণ্য ও সেবা পৌঁছানো নিশ্চিত করা হচ্ছে এই কমিশনের প্রধান কাজ। দেশের চালের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দাম নির্ধারণে কার কী ভূমিকা এবং কোনো প্রতিযোগিতার সমস্যা হচ্ছে কি না, তা জানতেই বিআইডিএস থেকে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

চালের প্রধান পাইকারি বাজার নওগাঁ, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও দিনাজপুর এবং খুচরা বাজার হিসেবে বাদামতলী, কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও কচুক্ষেত বাজারে গবেষণাটি করা হয়েছে। এ জন্য ৩২ জন পাইকারি ব্যবসায়ী, ১৬ জন অটো চালকলের মালিক, ১৭ জন আড়তদার, ১৩ জন ফড়িয়া বা ব্যাপারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। এ ছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও খাদ্য অধিদপ্তর এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন গবেষকেরা। বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো নাজনীন আহমেদের নেতৃত্বে মূল গবেষণাটি করা হয়।

সরু চালের দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ১২%
চালের বাজারে অটো চালকলগুলো ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে
চালকলগুলো গড়ে প্রতিদিন চাল উৎপাদন করে ১,৫৭৪ টন
চালকলগুলোর মজুত তদারকি করতে সুপারিশ

নাজনীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে ৫০টি বড় অটো রাইস মিল বাজারে সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠছে, তারা যে কোনো অপরাধ করছে, তা আমরা বলছি না। মালিকেরা সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে ও নিয়মিত কর দিয়ে ব্যবসা করছেন। বিশাল বিনিয়োগ করে বড় আকারে অটো চালকল প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু গবেষণায় আমরা দেখেছি, তাঁরা চাইলে বাজারে চালের দাম বাড়াতে বা কমাতে পারেন। সেই সক্ষমতা তাঁদের আছে। এখন তাঁরা আদৌ সে রকম কিছু করছেন কি না, তা বোঝার মতো তথ্য–উপাত্ত সরকারের কাছে থাকা উচিত। তাঁরা কোনো আইন ভাঙছেন কি না বা ইচ্ছে করে বাজারে চালের সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করছেন কি না, তা নিয়মিত তদারক করা সরকারের কাজ।’

দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় নেই সরকার

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় ৫০টি অটো রাইস মিলের প্রতিটি গড়ে প্রতিদিন ১ হাজার ৫৭৪ টন চাল উৎপাদন করে। মূলত তাদের নিজস্ব গুদামে থাকা ধান ভাঙিয়ে তারা ওই চাল উৎপাদন করে থাকে। প্রভাবশালী চালকলগুলো দেশের কয়েকটি জেলা যেমন কুষ্টিয়া, নওগাঁ, বগুড়া ও দিনাজপুরে অবস্থিত। একই এলাকায় এত প্রভাবশালী চালকল গড়ে ওঠায় তারা সহজেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কিনে ওই সব জেলার চালকল মালিকেরা গুদামজাত করেন। পরে তা ভাঙিয়ে কমিশন এজেন্টদের কাছে বাজারজাত করা হয়।

তবে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘চালের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে সরকার চিন্তিত নয়। এত দিন চালের দাম আসলে অতিরিক্ত কম ছিল। এখন দাম বাড়ায় কৃষক লাভবান হচ্ছে। তবে দাম বেশি বেড়ে গেলে সরকার আরও বেশি পরিমাণে মানুষের কাছে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বেচা শুরু করবে। আর চালকলমালিকদের কাছে বেশি ধান-চাল আছে কি না, তা আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব।’

বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সাড়ে ১২ শতাংশ চালকলের গুদামে ধান রাখার ক্ষমতা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ মাসে যে পরিমাণে ধান ভাঙানো হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ধান মজুত রাখার মতো ক্ষমতা আছে। এসব চালকলমালিক বেশি পরিমাণে ধান মজুত করে বাজারে ধান-চালের দাম ওঠানামায় প্রভাব ফেলতে পারবেন বলে গবেষণায় ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদ প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা এক বছর ধরে চাল বিক্রি করে লোকসান গুনতে গুনতে শেষ হয়ে গেছি। এখন দাম কিছুটা ভালো পাচ্ছি, এতে কৃষকও ভালো দাম পাবে।’

আইন কাগজে-কলমে

১৯৫৬ সালে প্রণয়ন করা ‘কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’ আইনটি ২০১১ সালে সংশোধন করা হয়। ওই আইনে আমদানিকারক, পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসায়ী ও চালকলমালিকদের খাদ্যশস্য মজুতের সর্বোচ্চ পরিমাণ ও মেয়াদ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী এক টনের বেশি খাদ্যশস্য মজুত করতে পারবেন না। চাল বা ধান পাইকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০০ টন ৩০ দিনের জন্য মজুত করা যাবে। খুচরা পর্যায়ে ১৫ টন ধান বা চাল ১৫ দিন রাখা যাবে। ব্যবসায়ীরা আমদানি করা পণ্যের শতভাগ ৩০ দিন ধরে রাখতে পারবেন। তাঁরা ৫০ শতাংশ পণ্য ৪০ দিন এবং ২৫ শতাংশ ৫০ দিন মজুত করতে পারবেন।

প্রতিযোগিতা কমিশনের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে এত বড় চালকলগুলো থেকে নিয়মিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন। তা ছাড়া বেশির ভাগ চালকলমালিক স্থানীয়ভাবে খুবই প্রভাবশালী।

বিআইডিএসের গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, আমন ও বোরো মৌসুমে সরকার কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেওয়া এবং সরকারি গুদামে মজুত বাড়ানোর কথা বলে সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের সংগ্রহ অভিযান থেকে কৃষক লাভবান হন না। কারণ, বাজারে ধানের দাম নির্ভর করে বড় চালকলগুলোর সংগ্রহ অভিযানের ওপর। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ধানের দাম যখন কম থাকবে, তখন কৃষককে ধান ধরে রাখার জন্য স্বল্পকালীন সময়ের জন্য ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আর সরকারের চাল সংগ্রহের কাজটি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অন্যান্য পণ্য কেনার ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা করা উচিত। অর্থাৎ চালকলমালিকদের কাছে দরপত্র আহ্বান করে সর্বনিম্ন দরদাতার কাছ থেকে চাল কেনা যেতে পারে। খাদ্য অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল ও গম কেনার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। খাদ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত তদারক করা ছাড়াও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিআইডিএসের প্রতিবেদনটি পেয়েছি। সেখানে যেসব সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে, তার সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেব।’