‘কোন স্বার্থে ছাত্রী ধর্ষণকারি লম্পট শিক্ষককে পুণঃনিয়োগ দিতে মরিয়া সাংসদ কমল?’, প্রশ্ন তুললেন ছোট ভাই রানা

‘কোন স্বার্থে ছাত্রী ধর্ষণকারি লম্পট শিক্ষককে পুণঃনিয়োগ দিতে মরিয়া সাংসদ কমল?’, প্রশ্ন তুললেন ছোট ভাই রানা

আনছার হোসেন
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল। তাঁরই আপন ছোট ভাই তানভীর সরওয়ার রানা। রামুর প্রতিথযশা রাজনীতিক ও শিক্ষাবিদ মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরীর সন্তানদের মধ্যে কমল দ্বিতীয় আর রানা সবার ছোট। সেই ছোট ভাই তানভীর সরওয়ার রানা প্রশ্œ তুলেছেন, ‘কোন স্বার্থে সাংসদ কমল গং ছাত্রী ধর্ষণ ও আর্থিক দূর্ণীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত লম্পট বহিস্কৃত শিক্ষক ছৈয়দ করিমকে রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে পূণঃনিয়োগ দেয়ার জন্য মরিয়া?’

তিনি সোমবার (২৫ নভেম্বর) দুপুরে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্ন তুলেন। ‘ছাত্রী ধর্ষণকারি লম্পট ছৈয়দ করিম কর্তৃক দায়ের করা মিথ্যা বিরুদ্ধে’ রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকরা এই সংসদ সম্মেলন ডেকেছিলেন।

ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাংসদ কমলের ছোট ভাই ও কক্সবাজার আর্ট ক্লাবের সভাপতি তানভীর সরওয়ার রানা।

তিনি বলেন, কক্সবাজার সদর-রামুর বর্তমান সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের সম্মানিত পিতা, জেলার শ্রেষ্ট সমাজসেবক মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ১৯৭৬ সালে রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্টা করেছিলেন। সেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্টার পর থেকে সুন্দর ভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে সৈয়দ করিম এই শিক্ষা প্রতিষ্টানে যোগদানের পর থেকে শুরু হয় ‘ছাত্রী ধর্ষণ’ ও ‘আর্থিক অনিয়ম’। ২০০৬ সালে স্কুলটির ছাত্রীনিবাসে থাকা এক ছাত্রীকে বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল প্রধান শিক্ষকরূপী সেই সৈয়দ করিম। ওই সময় সেই ছাত্রীর বাবা আদালতে নারী নির্যাতন মামলা করেন এবং ধর্ষিতাসহ আরও ৩ ছাত্রী সৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে আদালতে জবানবন্দি দেয়। পরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কৌশলে মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায় এবং ২০১০ সালে আবারও ছাত্রীদের এই বিদ্যালয়ে যোগদান করে আগের মতোই ধর্ষণ, অনিয়ম, ইভটিজিং ও অনৈতিক সম্পর্ক চালাতে থাকেন।

রানা দাবি করেন, পরীক্ষা অগ্রিম প্রশ্নপত্র ছাত্রীদের সরবরাহ করার অভিযোগ উঠলে ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে সেই সৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ মিলে। তাকে কারণ দর্শাণোর নোটিশও জারি করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সেই সময় পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব পদ থেকে সৈয়দ করিমকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও পরে স্থায়ী ভাবে বহিস্কার করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে তানভীর রানা দাবি করেন, সেই লম্পট শিক্ষক দীর্ঘদিন পর ‘উর্ধ্বতন মহলের সহযোগিতা’য় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া বিদ্যালয়ে যোগদান করতে যান। তখন ছাত্রীরা তার বিরুদ্ধে শ্লোগান দিয়ে মানববন্ধন করতে চাইলে সৈয়দ করিম নিজেই ঘন্টা বাজিয়ে লাঠি নিয়ে ছাত্রীদের দৌঁড়াতে থাকেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এক পর্যায়ে তাকে ঝাটাপেটা করে স্কুল থেকে বের করে দেয় এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করে।

এই ঘটনার পর সেই ধর্ষক শিক্ষক সৈয়দ করিমের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের শতভাগ ছাত্রী এবং শতভাগ শিক্ষক-শিক্ষিকা স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বাক্ষর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী, স্থানীয় সাংসদ, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের স্মারকলিপি দেন।

অথচ ওই ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে সৈয়দ করিম তার আপন ভায়রা ও উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমলের আপন ছোট বোন নাজনীন সরওয়ার কাবেরী ও ছোট তানভীর সরওয়ার রানাকেও আসামি করা হয়।

তানভীর সরওয়ার রানা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তুলেন, সমাজ, অভিভাবক, ছাত্রী, শিক্ষক সকলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে একজন ধর্ষক, লম্পট শিক্ষক সৈয়দ করিমকে রক্ষা করতে সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল কেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন?

তানভীর রানা এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যেখানে সৈয়দ করিম নামের ওই শিক্ষক ছেলেদের শিক্ষা প্রতিষ্টানের জন্যও নিরাপদ নন, সেখানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধানের দায়িত্ব কিভাবে দিতে চানা তারা!

তিনি বলেন, ৮৬-৮৮ সালের দিকে আমিও সৈয়দ করিমের ছাত্র ছিলাম। আমরা তার কোচিং সেন্টারে অংক পড়তে যেতাম। ওই সময় তার যৌন হয়রানিমূলক কর্মকান্ড আমাদের হাতে ধরা পড়ায় সেই ছোট বয়সে ‘ব্লু কালি’ সৈয়দ করিমের মাথায় ঢেলে দিয়ে আমরা পালিয়ে গিয়েছিলাম।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সাংসদ কমলের ছোট বোন ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী। তিনি বলেন, কতটুকু নির্যাতিত হলে একটি বিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারি প্রতিবাদ জানাতে আসতে পারেন (প্রেস ক্লাবে)।

তিনি সাংসদ কমলের ভূমিকা নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, এটি পারিবারিক কোন বিষয় নয়। একজন ব্যক্তির মানসিক বিকারগ্রস্থতার কারণে একটি শিক্ষা প্রতিষ্টা ধ্বংস হচ্ছে।

কাবেরী দাবি করেন, খাল দখলের পক্ষে তাঁর (সাংসদ কমল) অবস্থান। জোয়ারিয়ানালা সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ৫০ লাখ টাকা দূর্ণীতি করেছেন। সেই প্রধান শিক্ষক তাঁর (সাংসদ কমল) বন্ধু বলে সেই দূর্ণীতি কোন দূর্ণীতিই না! উল্টো তিনি ওই বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি বিলুপ্ত করে দিয়ে নতুন কমিটি দিয়েছেন। সেই বিদ্যালয়ে এখন ৫০০ টাকার ফি নেয়া হচ্ছে ৩০০০ টাকা।

নাজনীন কাবেরী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পাহাড় কাটছেন, ইয়াবা ব্যবসা করছেন। অথচ এমপি তাদের পক্ষ নিয়েছেন!

রামু উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আরেক সদস্য শামসুল আলম মন্ডলও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। তিনি দাবি করেন, শিক্ষক সৈয়দ করিম উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বলে যে কাগজ দেখাচ্ছেন তা পুরোটাই ভূঁয়া।

তিনি বলেন, হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে আমি বাদী হয়ে সৈয়দ করিমের ঘটনায় মামলা করেছিলাম। শুনানির পর আমাদের মনে হয়েছিল আমরা সঠিক বিচার পাবো না। তাই মামলার আবেদনটি ‘নট প্রেস’ করে অন্য বেঞ্চে নিয়ে গেছি। অথচ তার দুইদিন পর শুনছি, প্রথম বেঞ্চ থেকে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছে বলে একটি ভূঁয়া কাগজ নিয়ে ঘুরছে প্রতারক সৈয়দ করিম।

এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. ইউনুস রানা, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীন, সহকারি শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা আমান উল্লাহ আনছারী, শিপ্রা পাল, আঙ্গুর বালা দাশ, মিরাশ্রী দত্ত, বিজয় লক্ষী পারিয়াল, মিনাক্ষী বড়–য়া, মুজিবুর রহমান, মনোকান্তি দে, এ এম খোরশেদুল ইসলা, ছালাম উল্লাহ, পটল বড়–য়া, সুদত্ত বড়–য়া, অর্পিতা বড়–য়া, শাকিলা আকতার, লুৎফুন নেছা, মেঘনা বড়–য়া, নাছিমা আকতার, নিলুফার ইয়াসমিন, ইয়াছির আরাফাত, রনজিত কুমার দে ও সুমথ বড়–য়া।