রোহিঙ্গা শিবিরে আবারও সক্রিয় হচ্ছে মানবপাচার চক্র!

সাগরপথে মানবপাচারের মৌসুম শুরু, এবার টার্গেট নারী ও শিশুরা!

নুরুল হক, টেকনাফ
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে আবারও সক্রিয় হচ্ছে মানবপাচার চক্র। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নেয়া এই জাতিগোষ্ঠীকে সমুদ্র পথযাত্রী (মালয়েশিয়াগামি) হিসেবে বেছে নিয়েছে এই চক্রটি। সংঘবদ্ধ এই চক্রটি বেকার, নিরীহ ও দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে, প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পৌঁছে দেয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সংঘবদ্ধ এই চক্রে নারী সদস্যও রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ নজরদারির অভাবে সীমান্তে শুণ্যের কোটায় থাকা এই মানবপাচার ফের শুরু হয়েছে। এটিকে তারা অশনি সংকেত বলেও মনে করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, গত দেড়মাসে সমুদ্রপথসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত দুইশ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। যাদের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময়ে, বাকিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ বা তা সংগ্রহকালে আটক হয়েছেন। তারা সবাই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা।

তাদের মধ্যে সর্বশেষ ১৩ নভেম্বর সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ১২২ জন রোহিঙ্গাবাহী একটি ট্রলারসহ আটক করে কোস্টগার্ড। এবছর এটি বড় সংখ্যা ছিল, যা সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলেন। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১৫ জন শিশু, ৫৯ জন নারী ও ৪৮ জন পুরুষ ছিলেন।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রা কিংবা দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে রোহিঙ্গা শিবিরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার প্রস্তাব করেছিল পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এ সময়ে সমুদ্র শান্ত থাকায় পাচারকারিরা মানবপাচারের চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু মানবপাচার রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

তবে সকল শ্রেণীর মানুষকে এগিয়ে এসে সচেতনতার মাধ্যমে এই মানবপাচার রোধ করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিবাসন প্রত্যাশী রোহিঙ্গাদের পালানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্কতা বাড়িয়েছে সরকার। ফলে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা সংস্থারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’

পুলিশের তথ্য মতে, গত ১০ মাসে সাগরপথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় এ পর্যন্ত প্রায় ৬’শ জনকে উদ্ধার করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের সবাই বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এদের মধ্যে পুরুষদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা যুবতি ও শিশুরাও ছিল।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ২০১৮’র জানুয়ারি থেকে ২০১৯’র জানুয়ারির মধ্যে দেড়হাজারেরও বেশি আশ্রয়প্রার্থী বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়েছেন। যা ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে সমুদ্র পাড়ি দেয়া মানুষ থেকে প্রায় ৫০ গুণ বেশি। ২০১৫ সালে সমুদ্রযাত্রীদের বেশিরভাগই ছিলেন পুরুষ, কিন্তু ২০১৮ সালের সমুদ্রযাত্রীদের শতকরা ৫৯ ভাগই নারী ও শিশু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল।

সুত্র জানিয়েছেন, ট্রলারে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য মানবপাচারকারীরা রোহিঙ্গা জনগোষ্টী অধ্যুষিত অঞ্চল কক্সবাজার উপকূলের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করছে। তা হলো টেকনাফের শামলাপুর, শীলখালি, রাজারছড়া, জাহাজপুরা, সবারাং, শাহপরীর দ্বীপ, কাটাবনিয়া, মিঠাপানির ছড়া, জালিয়াপালং, ইনানী, হিমছড়ি, রেজুখাল, কুতুবদিয়াপাড়া, খুরুশকুল, চৌফলদন্ডি, মহেষখালী।

সুত্র মতে, সীতাকুন্ড ও মাঝিরঘাট এলাকা হয়েও ট্রলারে মানবপাচার হয়ে থাকে। এসব পয়েন্ট আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তালিকায়, এই রুট দিয়ে মানব পাচার হয়ে থাকে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন স্থানীয়সহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা।

এছাড়া মালয়েশিয়া অবস্থানকারি মানব পাচারকারি রোহিঙ্গা হামিদ, মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ হারুন, নুর নবী। এদের মধ্যে হামিদের কথা ১৩ নভেম্বর সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন।

টেকনাফের লেদা ডেভেলপমেন্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়া গমন বা ক্যাম্প থেকে পালানোর প্রবণতা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বরাবরই ছিল। প্রশাসনের কঠোরতার কারণে বেশ কিছুদিন মানবপাচার বন্ধ ছিল। তবে যাদের আত্মীয়-স্বজন বিভিন্নভাবে মালয়েশিয়ায় গেছে, তাদের সেদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।’

তার মতে, ‘এখন সমুদ্র কিছুটা শান্ত, সেই সুযোগে তারা মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছিল হয়তো।’

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা নুর কালাম বলেন, ‘সাধারণত মালয়েশিয়া নেয়ার জন্য রোহিঙ্গা নারীরা পাচারকারীদের টার্গেটে থাকে। প্রথমে ফোনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা আত্মীয় স্বজনদের কারো সাথে বিয়ে দেয়া হয়। এতে নারীদের রাজি করানো সহজ হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার শিবির থেকে অনেক রোহিঙ্গা বের হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়লেও অনেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছেন কিনা তা আমি নিশ্চিত নই।’

আরেক রোহিঙ্গা সৈয়দ আলম জানান, যে সকল রোহিঙ্গার আত্মীয়স্বজন মালয়েশিয়ায় বসবাস করছে, তারাই ওই দেশে যেতে বেশি আগ্রহী। আবার যাদের আত্মীয়স্বজন সেখানে নেই, তারাও উন্নত জীবনের আশায় এবং অবিবাহিত নারীরা বিয়ের প্রলোভনে মালয়েশিয়া যেতে চায়। এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে সেই টাকা দালালদের হাতে তুলে দিচ্ছে।’

‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ সংগঠনের সমন্বয়ক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানবপাচার শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পাচারকারিরা রোহিঙ্গাদের টার্গেট করছে। এখনই যদি সরকার মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, সেই অতীতের মতো বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশংকা রয়েছে।’

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফসার বলেন, ‘মানবপাচার বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কোন ভাবেই মানবপাচার হতে দেয়া হবে না। সেই ভাবে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রাণের ভয়ে সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তারও আগে থেকেই বাংলাদেশে আশ্রিত আরও চার লাখের মতো রোহিঙ্গা ছিল। বর্তমানে সব মিলিয়ে ১১ লাখের রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলার উখিয়া-টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। একারণে হঠাৎ করে সাগর পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা বেড়েছে।