মাটির তৈরি জরাজীর্ণ কক্ষ, শিক্ষার্থী শুণ্য

মাদ্রাসা ও হেফজখানা দেখিয়ে বিদেশ থেকে লাখ লাখ টাকা আয়!

মাদ্রাসা ও হেফজখানা দেখিয়ে বিদেশ থেকে লাখ লাখ টাকা আয়!

মহিউদ্দিন মাহী
প্রধান প্রতিবেদক
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

একটি মাদ্রাসা, যেখানে হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী ছাড়া আর কারও দেখা নেই! জরাজীর্ণ মাটির তৈরি একটি ঘরকে বছরের পর বছর ‘মাদ্রাসা দেখিয়ে’ সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করে যাচ্ছেন মাদ্রাসাটির কথিত পরিচালক মৌলভী নেজামউর রহমান। শুধু তাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী না থাকলেও প্রতিবছর বাৎসরিক সভা করে মোটা অংকের টাকাও কামিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

এছাড়াও এলাকার বাড়িতে বাড়িতে ধান ও চাঁদা উত্তোলন ও মৌসুমে কোরবানীর পশুর চামড়া হেফজখানার নামে তুলে নিয়ে প্রতিবছর চলছে আরেক বাণিজ্য।

এমন সব অভিযোগের সত্যতা যাছাইয়ে সরেজমিনে কক্সবাজার সদর উপজেলাধীন পিএমখালী ইউনিয়নের নুরুল উলুম মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায় অভিযোগের সব ঘটনাই বাস্তব।

সরেজমিনে দেখা যায়, মাটির তৈরি জরাজীর্ণ ঘরে কয়েকটি কক্ষ ভাগ করে সাজানো হয়েছে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণী কক্ষ। যদিও হাফেজখানার কক্ষটি ছাড়া বাকি কক্ষগুলো তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।

মাদ্রাসার দেয়া তথ্য মতে, ১৯৭৬ সালে মরহুম শেখ মোঃ সোলাইমান ‘পিএমখালী নুরুল উলুম মাদ্রাসা’ নামে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই থেকে এখানে সক্রিয়ভাবে ছাত্র-ছাত্রী ভরপুর ছিল। এরই মাঝে বাবা জীবিত থাকতে তাঁর বড় ছেলে মাওলানা নেজামউর রহমান ‘পিতাকে বাধ্য করে’ মুহতামিমের দায়িত্ব নেন। তারও আগে থেকেই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষক হিসেবে মাদ্রাসাটি পরিচালনা করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে গিয়ে প্রতিবছর মাদ্রাসার নামে লাখ লাখ টাকা চাঁদা এনেছেন তিনি। যদিও এই টাকার বেশির ভাগ অংশ নানা হিসাব দেখিয়ে নিজেই আত্মাসাৎ করতেন বলে অভিযোগ শত শত স্থানীয় জনতার।

সূত্র মতে, কয়েকবছর আগে ঘন ঘন সৌদি আরবে চাঁদা সংগ্রহ করার জন্য যাওয়ায় সেই দেশে মাওলানা নেজামউর রহমানের ভিসা ব্লক করে দেয় সৌদি সরকার। তারপর থেকে তিনি আর সৌদি আরবে ঢুকতে পারেননি। নিজে ঢুকতে না পারলেও বিভিন্ন উপায়ে বাইরের মাদ্রাসা থেকে শিক্ষক নিয়োগ করে সৌদি আরবে পাঠানো হতো, সেখান থেকে লাখ লাখ টাকা এনে মাদ্রাসার মুহতামিম (পরিচালক) মাওলানা নেজামউর রহমানের কাছে দেয়া হতো।

বিদেশে চাঁদা তুলতে যাওয়া এমন একজন শিক্ষকের নাম মৌলভী আজগর। তিনি সম্প্রতি সৌদি আরবে গিয়ে বর্তমান মাদ্রাসা পরিচালকের টার্গেট অনুযায়ী টাকা উত্তোলন করে দিতে পারেননি। যার কারণে ওই ব্যক্তির সাথে সম্পর্কেও দুরত্ব তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মাওলানা নেজামউর রহমানের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁর কাছে কতজন শিক্ষার্থী আছে- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, মাদ্রাসার নূরানীতে ১২০ জন, হেফজখানায় ১৮ জন। কয়েক ভাবে বিভক্ত করে শ্রেণী কক্ষে পাঠদান করা হয়। এছাড়াও মাদ্রাসার মুতাফাররাকা (সদ্য হাফেজ হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য শর্টকোর্স) নামে একটি বিষয়ে ১৭ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

যদিও বাস্তবে শিক্ষার্থী থাকা দূরে থাক, এই ধরণের কোন বিষয়েই পাঠদান নেই মাদ্রাসাটিতে। পরিচালকের দেয়া তথ্যের সাথে কোন ধরণের মিল নেই ওই মাদ্রাসায় কর্মরত হাফেজ মোঃ সোহাইল ও মৌলভী আবুল কালামের তথ্যে।

মাদ্রাসা ও হেফজখানা দেখিয়ে বিদেশ থেকে লাখ লাখ টাকা আয়!

অন্যদিকে মাদ্রাসাটি চালাতে প্রতিবছর ৬ লাখ টাকা খরচ হয় বলে জানালেও সৌদি আরব থেকে মাদ্রাসার নামে চাঁদা উত্তোলন, ধান উত্তোলন ও প্রতি ঈদুল আযহাতে পশুর চামড়া থেকে কতো টাকা আয় হয়, এই হিসাব তিনি জানাতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতা ও শিক্ষকদের উপস্থিতির কোন খাতাও দেখাতে পানেনি মাওলানা নেজামউর রহমান।

তবে কয়েকটি খাতা বের করে বিভিন্ন সালের আয়-ব্যয়ের হিসেবে অডিটকারী হিসেবে সদরের ধাওনখালী মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আতাউল্লাহ বোকারীর স্বাক্ষর দেখা গেলেও কোন সিল নেই।

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন পরিচালনা কমিটি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে একজন ব্যক্তি ও এলাকার বাইরে থেকে কয়েকজনকে নিয়ে কমিটি রয়েছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের কোন পরিচালনা কমিটি নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে অনেক মানুষ জড়ো হন। ওই সময় মাদ্রাসার নিচে মৌলভী কলিম উল্লাহ, স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ তৈয়ব, জলিল ও রফিক সওদাগরসহ একাধিক মানুষ অভিযোগ করে বলেন, মাদ্রাসাটি প্রথমে ভালো ভাবে চললেও পরবর্তীতে খুব খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়। একজন মাদ্রাসার পরিচালক হয়েও তিনি সকাল-বিকাল চায়ের দোকানে রাজনৈতিক কথা-বার্তায় ব্যস্ত থাকেন।

তাদের মতে, একটি মাদ্রাসা হলেও এলাকার কোন মানুষ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র পড়াতে চান না। কয়েক মাস পরপর শিক্ষক বদলাতে থাকেন মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা নেজামউর রহমান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসায় দান করা জায়গার উপর দীর্ঘ বছর ধরে জানাযার নামাজ পড়ে আসছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি এই জানাযার মাঠটিও দখল করে নিজের রেষ্টের জন্য একটি কক্ষ তৈরি করেছেন মাদ্রাসা পরিচালক। যার কারণে জানাযা পড়াতে গেলে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় স্থানীয়দের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

তবে এসব অভিযোগকে ‘সব ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করছেন মাদ্রাসার পরিচালক (মুহতামিম) মাওলানা নেজামউর রহমান।