নিজের ‘অবাধ্য ছেলে’র অত্যাচারে অতিষ্ট বাবা মাওলানা আতিকের আকুতি

নিজের ‘অবাধ্য ছেলে’র অত্যাচারে অতিষ্ট বাবা মাওলানা আতিকের আকুতি

আনছার হোসেন
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

তিনি নিজে একজন আলেম। টানা ২৬ বছর মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। যিনি আবার কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্যও। বয়স যার ৭৫ পেরিয়েছে। সেই বয়োবৃদ্ধ আলেম মাওলানা আতিকুল ইসলাম এখন একজন ‘অবাধ্য পুত্রে’র অত্যাচারে ঘরছাড়া! তিনি একা ঘরছাড়া নন, সাথে তাঁর বয়োবৃদ্ধা স্ত্রী শাহিদা বেগম, চার পুত্র ও নাতি-নাতনীও ঘর ছেড়ে শহরের অন্যত্র ভাড়া ঘরে বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মাওলানা আতিকুল ইসলামের মতে, অবাধ্য পুত্র হেলাল উদ্দিনের হাতে একাধিকবার মারধরের শিকার হয়েছেন তিনি নিজে ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা। সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) নিজের তৃতীয় পুত্র হেলাল উদ্দিন (৩৮), পুত্রবধূ নুসরাত জাহান ও পুত্রের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

তিনি শনিবার (২ নভেম্বর) বিকালে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের নিজের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন মাওলানা আতিকুল ইসলাম। তিনি নিজের এই দুর্দশার কথা তুলে ধরে অবাধ্য পুত্রের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহায়তা কামনা করেছেন।

কক্সবাজার শহরে মাওলানা আতিকুল ইসলামকে চেনেন না এমন মানুষের সংখ্যা বোধহয় খুবই কম। তিনি শহরের বদর মোকাম এলাকার বাসিন্দা। তিনি স্বনামধন্য পরিবারের সন্তান। কর্মজীবনে তিনি টানা ২৬ বছর নতুন বাহারছড়া জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। বর্তমানে বদর মোকাম জামে মসজিদ ও বদর মোকাম সমাজ কমিটির উপদেষ্টা। এছাড়াও সরকারি দল আওয়ামী লীগের কক্সবাজার জেলা শাখার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যও তিনি।

আতিকুল ইসলামের ৫ ছেলে ও ৬ মেয়ের মধ্যে ‘অবাধ্য পুত্র’ হেলাল উদ্দিন হলেন তৃতীয়, যিনি বাবা, মা ও ভাই-বোনদের মারধর করে এখন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। আর নিজের স্ত্রী, অবশিষ্ট ৪ ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনীদের নিয়ে ভাড়া ঘরে বসবাস করছেন। অথচ বদর মোকাম এলাকায় তার নিজের টাকায় গড়া ৫তলা ভবন রয়েছে, যেটি তার অবাধ্য পুত্র হেলাল উদ্দিন ও পুত্রের শ্বশুর বাড়ির লোকজন জবরদখল করে রেখেছেন।

কেন এই নির্যাতন
মাওলানা আতিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানান, ২০১২ সালে তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালন করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তখন শহরের বড় বাজার ও এন্ডারসন রোডের দুইটি মার্কেট এবং বদর মোকাম এলাকার নিজের বাড়িটির তত্বাবধানের জন্য তৃতীয় পুত্র হেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে দেখেন, হেলাল উদ্দিন সুকৌশলে মার্কেটের ভাড়ার মোটা অংকের টাকা আত্মসাত করেছেন। সেখানেই হেলাল উদ্দিন থেমে থাকেননি। বদর মোকাম এলাকার ৫তলা বিল্ডিংটি আত্মসাতের জন্য ভূঁয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিজের নামে বৈদ্যুতিক মিটার ও হোল্ডিং নাম্বার বানিয়ে নেন।

তাঁর মতে, ভূঁয়া কাগজপত্র তৈরির পর তাঁকে এবং নিজের মা, ভাইদের ওই ঘর থেকে বের করে দেন হেলাল উদ্দিন। বর্তমানে তারা কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকছেন প্রায় একবছর ধরে।

তাঁর দাবি, সন্তানকে তিনি বহুভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছেলে হেলাল উদ্দিন উল্টো নিজের বাবাকেই হত্যার হুমকি দেন।

এসব ঘটনায় অতিষ্ট হয়ে মাওলানা আতিকুল ইসলাম নিজের অবাধ্য পুত্রের ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে অর্থ আত্মসাতের মামলা করেন। ইতোপূর্বে জমি দখল করার চেষ্টা করলে তিনি বাধা দেন। ওই ঘটনায়ও ছেলে হেলাল উদ্দিন বাবা আতিকুল ইসলামকে মারধর করেন। এই ঘটনায় ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি কক্সবাজার সদর মডেল থানায় মামলা করেন।

সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর ছেলে হেলাল উদ্দিন তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন ও সন্ত্রাসি বাহিনী নিয়ে বাবা আতিকুল ইসলামসহ ভাই-বোনদের উপর হামলা করেন। ওই হামলায় আহত হয়ে মাওলানা আতিকুল ইসলাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হন।

নিজের ঘরে কাদের বসবাস
প্রায় একবছর আগে নিজের গড়া ৫তলা ভবন থেকে মাওলানা আতিকুল ইসলাম ও পরিবারের সদস্যদের বের করে দেন অবাধ্য ছেলে হেলাল উদ্দিন। এখন ওই ঘরে বসবাস করেন হেলাল উদ্দিন, তার স্ত্রী নুসরাত জাহান, শ্বশুর মাহমুদুল হক চৌধুরী, স্ত্রীর বড় বোন এবং শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ৩১ অক্টোবর বাবা আতিকুল ইসলামের উপর হামলার পর ওই ভবনে স্ত্রী নুসরাত জাহান অবস্থান করলেও গত শুক্রবারও সেখানে অবস্থান করেন শ্বশুর।

তাবলীগ করতো বলেই হেলালকে বিশ্বাস করেছিলেন বাবা
‘অবাধ্য পুত্র’ হেলাল উদ্দিনের মুখে দাঁড়ি ছিল, বেশ কিছুদিন তাবলীগেও গিয়েছিলেন। তাছাড়াও তিনি বদর মোকাম জামে মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার। সেই কারণেই হজ্বে যাওয়ার সময় নিজের দুই বড় সন্তানকে বাদ দিয়ে তৃতীয় ছেলে হেলাল উদ্দিনকে সহায়-সম্পত্তির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাধ্য সন্তানই নিজের বাবার বিশ্বাসের অমর্যাদা করে টাকা ও সম্পদ আত্মসাতের অপচেষ্টা করেন।

তবে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, অন্য চার সন্তানের মতো তৃতীয় ছেলে হেলাল উদ্দিনও ‘বাধ্য সন্তান’ ছিলেন। প্রায় ৪ বছর আগে যখন রামুর রশিদনগর এলাকার মাহমুদুল হক চৌধুরীর মেয়ে নুসরাত জাহানকে বিয়ে করার পর থেকেই হেলাল উদ্দিন বদলাতে শুরু করেন। এক সময় স্বামী-স্ত্রী মিলে বাবা আতিকুল ইসলাম ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নির্যাতন নিপীড়ন শুরু করেন।

কী চান মাওলানা আতিক
এক প্রশ্নের জবাবে মাওলানা আতিকুল ইসলাম জানান, তিনি নিজের পুত্রের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রশাসন ও সাংবাদিকদের দ্বারস্থ হয়েছেন।

তিনি দাবি করেন, অবাধ্য ছেলেকে কারাগারে পাঠানোর পর এখন কারাগার থেকেই নানা ধরণের হুমকি দিচ্ছেন হেলাল উদ্দিন। আর বাইরে থেকে মামলা ও হামলার হুমকি দিচ্ছেন হেলালের স্ত্রী নুসরাত জাহান ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

‘অবাধ্য পুত্র’ হেলাল উদ্দিন, শ্বশুর বাড়ির লোকজন এবং ছেলের সন্ত্রাসি বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন মাওলানা আতিকুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আতিকুল ইসলামের স্ত্রী শাহিদা বেগম, ছেলে মিজানুর রহমান, কফিল উদ্দিন, মেয়ে সায়মা সুলতানা শিমু, জসিম উদ্দিন, নাসরিন সুলতানা রুপি ও শরফউদ্দিন।

মাওলানা আতিকুল ইসলামের আকুতি দেখতে নিচের ভিডিওতে ক্লিক করুন।

https://web.facebook.com/coxvision/videos/3021129454778248/