শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আকাশে আফগান তরুণী

শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আকাশে আফগান তরুণী

শায়েস্তা ওয়াইজ (shaesta waiz)। একটি নারীর নাম নয় আজ। একটি ইতিহাস যেন। ঘুরে দাঁড়ানোর। জন্ম আফগানিস্তানে। এখন স্থায়ী বসবাস আমেরিকায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই কাটান আকাশে। আকাশেই যেন তার ঘরসংসার। ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব উইমেন্স এয়ারলাইন্স পাইলট’-এর পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে এক লাখ ৩০ হাজার এয়ারলাইন্স পাইলটের মধ্যে মহিলা পাইলটের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। আর তাদের মধ্যে অন্যতম বিমানচালক এই আফগান তরুণী, শায়েস্তা ওয়াইজ। হোঁচট খেলেও থামতে নেই। এবং তাঁর সময় কাটে আকাশেই। আকাশে বিচরণই যেন তাঁর নেশা।

লড়াই থেকে এগিয়ে যাওয়ার দিনগুলো
সালটা ১৯৮৭। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে ধুন্ধুমার দশা আফগানিস্তান জুড়ে। শয়ে শয়ে মানুষ ঘরহারা হচ্ছেন রোজ। দারিদ্র্য ও অনাচারের দ্বৈরথে দেশে প্রায় দুর্ভিক্ষের দশা। খাবার নেই, পানীয় জল নেই রোগ-অসুখের বাড়বাড়ন্ত। দলে দলে মানুষ গিয়ে উঠছে আফগান শরণার্থী শিবিরে। এরকমই একটি অস্থিরতম সময়ে মায়ের কোলে এসেছিল ফুটফুটে এক মেয়ে, শায়েস্তা। আর পাঁচটা শিশুর জন্মের মতো আনন্দের হয়ে ওঠেনি শায়েস্তার ভূমিষ্ঠ হওয়া। কী করেই বা হবে। শরণার্থী শিবিরে যার জন্ম, তার ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কি থাকে কিছু? বরং চারপাশের যুদ্ধের বিভীষিকা যেন বলে দিয়েছিল, জীবন-মৃত্যুর নানা ঝুঁকির দড়ির ওপর দিয়ে জীবন এগোবে শায়েস্তার। যুদ্ধের আতঙ্ক এড়াতে, ছোট্ট শায়েস্তাকে নিয়ে আমেরিকা চলে যায় ওয়াইজ পরিবার।

 

কিন্তু কে জানত, ঠিক তিন দশক পরে শায়েস্তা ওয়াইজ আবারও ফিরবেন তাঁর জন্মভূমি আফগানিস্তানে! তা-ও আবার একজন সফল পাইলট হিসেবে, বিমানে করে উড়ে এসে নামবেন তিনি নিজের দেশের মাটিতে! অভাব কি আর কখনো স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে! বহু মানুষেরই জীবনে নানা বিপর্যয় আসে। ওলটপালট হয়ে যায় সমস্ত চিন্তাভাবনা। কিন্তু জন্মের পরেপরেই ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ে কোনো হাত থাকে না মানুষের। শায়েস্তা ওয়াইজেরও ছিল না। জ্ঞান হওয়ার আগেই ভিন্ দেশের মাটিতে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু তাঁর। কিন্তু নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমের জোরে যে কোথায় পৌঁছনো যায়, তার উদাহরণ বোধ হয় আফগান পাইলট শায়েস্তা ওয়াইজ।

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার পরে, ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রিচমন্ড এলাকায় থাকতে শুরু করে ওয়াইজ পরিবার। অভাবের সংসার। বিদেশের মাটিতে হাজারো অসুবিধা। তার মধ্যেই বেড়ে উঠতে থাকে শায়েস্তা। কিন্তু অভাব কি কখনো স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? পারে না। তাই সমস্ত বাধা-বিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে শায়েস্তা স্বপ্ন দেখলেন, পাইলট হওয়ার। তবে কাঁচা বয়সে সকলেই যেমন নানা অ্যাডভেঞ্চারাস স্বপ্ন দেখে, তেমন নয়। পেশাদার পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। একলা বিমানে ১৮টি দেশ, ২৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিলেন নিজের স্বপ্ন পূরণে। সফলও হলেন। বিদেশের মাটিতে পাইলট হিসেবে অনুমোদন পেলেন তিনি। তাঁর নিজের দেশ আফগানিস্তান তখনও জানতেও পারেনি, প্রথম আফগান মহিলা পাইট হিসেবে বিমান নিয়ে উড়ান দিয়েছেন শায়েস্তা ওয়াইজ! তবে শুধু নিজে পাইলট হয়েই থামেননি শায়েস্তা ওয়াইজ।

শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আকাশে আফগান তরুণী

‘ড্রিমস সোয়ার’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়ার এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি তরুণীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিত শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করতে শুরু করেন। এখানেই হয়তো শেষ হতে পারত, একটি অনুপ্রেরণার গল্প। কিন্তু না, তা হয়নি। সালটা ২০১৭। এক ইঞ্জিনের একটি ছোট বিমান চালিয়ে, আমেরিকা থেকে আফগানিস্তানের কাবুলে এসে নামেন শায়েস্তা ওয়াইজ। মাটির টান অগ্রাহ্য করতে পারেননি। ৩০ বছর বয়সের মধ্যে, ততদিনে ওই বিমানটি নিয়েই পাড়ি দিয়েছেন ১৮টি দেশ আর ২৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার পথ। এমনকি, পার করেছেন আটলান্টিক মহাসাগর। ‘বিচক্রাফট বোনানজা এ ৩৬’ বিমান নিয়ে এর আগে কেউ এত দেশ ঘোরেননি। সেই কাজটাই কনিষ্ঠতম পাইলট হিসেবে সেরে ফেলে বিশ্বরেকর্ড ঝুলিতে পুরেছেন তিনি। বাকি ছিল কেবল নিজের দেশটাই। সব শেষে ফিরে এলেন সেখানে। দেশ ছাড়ার কথা মনে নেই, মনে আছে যে এটাই আমার দেশ। কাবুলে ফিরে আসার পরে শায়েস্তা ওয়াইজ তাঁর বিমান চালানো শেখা এবং শেখার পরে বিমান উড়িয়ে সারা দেশ ঘোরার নানা রকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন সবার সাথে।

তিনি বলেন, “তিনটি দশক পেরিয়ে গেছে। আমার কিছুই মনে নেই এই দেশ ছাড়ার কথা। কিন্তু আমি এটা মনে রেখেছি, যে এটা আমার দেশ। আমি চাই, আমার দেশের মানুষ আমায় চিনুক। আমি চাই, আমার সাফল্য এ দেশের মেয়েদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করুক। আর এ জন্যই আমি সম্প্রতি দেশে ফিরেছি একজন পাইলট হিসেবে। খুব, খুব আনন্দিত আমি।”

আফগানিস্তানে ফিরে একটি ফ্লাইং স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজও শুরু করেন তিনি। তিনি চান, তাঁর এই স্কুলে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে শিখুক আফগানিস্তানের ছেলেমেয়েরা। কারণ তিনিও স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই পেরেছিলেন। বলছিলেন, “বড় হতে হতেই আমার মধ্যে আকাশ ছুঁয়ে দেখার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। নিজেকেই নিজে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতাম। তখন বিশ্বকে আমি একেবারে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করি। অনেক রকম বই পড়তে শুরু করি। সেগুলো আমাকে স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায়।” আমেরিকাতেও একটি স্কুল খুলেছেন বিমান চালনার। এবছরের ৩১ ডিসেম্বর বিয়ে করতে যাচ্ছেন মার্কিন পপ তারকা ম্যাকেঞ্জা রিচার্ডকে।

শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আকাশে আফগান তরুণী

পরিশ্রমের বিকল্প নেই
আফগানিস্তান ও আমেরিকার স্কুলের ছেলেমেয়েদের শায়েস্তা রোজ মনে করিয়ে দেন, “ভালো ও অন্য রকম কিছু করতে চাইলে, তা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে সবার আগে। তবে শুধু স্বপ্ন দেখলেই চলবে না, সেজন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একমাত্র পরিশ্রম করলেই যে কোনো জায়গা বা পরিবেশ থেকে সব বাধা পেরিয়ে সাফল্য পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে জরুরি, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস।”

শায়েস্তার আক্ষেপ, মেয়েদের আধুনিক শিক্ষা, নিজের পায়ে দাঁড়ানো—এসব দিক দিয়ে আফগানিস্তান গোটা বিশ্বের তুলনায় এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে। এ দেশে মেয়ে মানেই যেন ঘরে বন্দি থাকার জন্যই তার জন্ম। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। তাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অগণিত আফগান মহিলা এখন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন। অনেকেই পড়াশোনার পরে চাকরি করছেন, কেউ নিজের ব্যবসাও করছেন। এই বদলের পালেই আরো একটু হাওয়া লাগাতে চান শায়েস্তা ওয়াইজ।

তবে শায়েস্তা এখন আর শুধুমাত্র একটি দেশের প্রতিনিধি নন। বরং বিশ্বের দরবারে, তিনি পুরো নারীজাতির অদম্য প্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন। আকাশজয়ী শায়েস্তা মনে করেন, আকাশের কোনো সীমানা হয় না। তবে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নের পথে অনেক বাধা থাকে। স্বপ্নের পথে হোঁচট খেলে থামতে নেই, বরং আত্মশক্তিতে বিশ্বাস রেখে আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হয় পথ। তবেই আসে বহু প্রতীক্ষিত সাফল্যের ফল, আসে প্রাপ্য সম্মান। আসে পরিশ্রমের মূল্য। ঠিক যেমনটা পেয়েছেন শায়েস্তা ওয়াইজ।
সূত্র: দ্য ওয়াল।