পুলিশের ‘জামাই’ বলে কথা!

পুলিশের ‘জামাই’ বলে কথা!

কথায় আছে ‘চুরি তো… চুরি, তার ওপর সিনা জুড়ি।’ চট্টগ্রামের হালিশহরে দেশসেরা ব্র্যান্ড আরএফএল– এর এক ডিলারের প্রায় ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের পর উল্টো ওই ডিলারসহ আরএফএল– এর ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা ঠুঁকে দেন এক নারী পুলিশ কনস্টেবলের স্বামী। আপসের কথা বলে থানায় নিয়ে মামলা দেয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের এক সহকারী কমিশনার (সম্প্রতি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত)।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের নারী কনস্টেবল রাজিয়ার স্বামী মো. ইউসুফ (৩০) চট্টগ্রামে আরএফএল- এর দুরন্ত বিভাগে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। আরএফএল– এর খুচরা বিক্রেতা নাসিম উদ্দিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করতে গিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বিক্রয় প্রতিনিধি ও নারী পুলিশ কনস্টেবলের স্বামী ইউসুফ। আট মাস ধরে দেনদরবার হলেও ইউসুফ ওই ডিলারের টাকা পরিশোধ করেননি।

সম্প্রতি ইউসুফ অফিসে অনিয়মিত হওয়ায় আরএফএল চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তারা গত শনিবার (১৯ অক্টোবর) সকালে তাকে অফিসে ডেকে পাঠান। ওইদিন সকাল ১০টার দিকে ইউসুফ হালিশহরের ইসাবেলা টাওয়ারের চতুর্থ তলায় অবস্থিত আরএফএল অফিসে আসেন। এ সময় ডেকে পাঠানো হয় ডিলার নাসিমকেও। টাকার বিষয় নিয়ে আলাপের মাঝেই ইউসুফের স্ত্রী পুলিশ কনস্টেবল রাজিয়া স্থানীয় হালিশহর থানা পুলিশকে অভিযোগ করেন যে, তার স্বামীকে আরএফএল অফিসে ‘আটকে’ রাখা হয়েছে, ‘মারধর’ করা হচ্ছে।

পরে পুলিশ এসে আপসের কথা বলে টাকা আত্মসাৎকারী ইউসুফ ও আরএফএল কর্মকর্তাদের থানায় ডেকে নিয়ে যায়। আরএফএল- এর চার কর্মকর্তাকে সারাদিন থানায় বসিয়ে রাখলেও কোনো সমাধান দিতে পারেনি পুলিশ। উল্টো পরদিন রোববার (২০ অক্টোবর) সকালে আবারও সমাধানের কথা বলে থানায় ডেকে নিয়ে টাকা আত্মসাতের শিকার ডিলারসহ আরএফএল- এর ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দেয় পুলিশ; সমাধানের জন্য যাওয়া চার কর্মকর্তাকে পাঠানো হয় গারদে!

এ বিষয়ে আরএফএল-এর কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, ‘ইউসুফ আমাদের কর্মচারী। তাকে আমরা অফিসে ডাকতেই পারি। মূলত সে কিছুদিন ধরে অফিসে অনিয়মিত ছিল, তাই তাকে আমরা ডেকেছিলাম। কিন্তু তার স্ত্রী ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিয়ে নিজের স্বামীকে টাকা আত্মসাতের দায় থেকে বাঁচানোর জন্য আমাদের অফিসে পুলিশ ডেকে আনেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে নিয়ে যেতে চাইলে আমরা টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাই। তখন তারা বিষয়টি সমাধানের জন্য থানায় যেতে বলেন। ওইদিন রাত পর্যন্ত থানায় বসিয়ে রেখে পরদিন আবারও আমাদের থানায় যেতে বলা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। রোববার (২০ অক্টোব) থানায় গেলে জানতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা দেয়া হয়েছে। এ সময় আমাদের চারজনকে থানার লকাপে প্রবেশ করানো হয়। বিচার চাইতে গিয়ে আমরা হয়ে গেলাম আসামি!’

এ বিষয়ে হালিশহর থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) বদরুল কবীর বলেন, ‘আমরা হালিশহরের অফিস থেকে যাকে উদ্ধার করেছি তার কিছু দেনা ছিল। অফিস কর্তৃপক্ষ (আরএফএল) তাকে ডেকে নিয়ে আটকে রেখেছিল। আমরা অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে নিয়ে আসি। পরে কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই শেষে মামলা দেয়।’

ইন্সপেক্টর বদরুল কবীরের কাছে প্রশ্ন ছিল- ‘আরএফএল কর্তৃপক্ষ কি তাকে (ইউসুফ) বেঁধে রেখেছিল?’

পুলিশের ‘জামাই’ বলে কথা!

চট্টগ্রামের আরএফএল কার্যালয়ে ইউসুফ ও তার স্ত্রী রাজিয়া

জবাবে তিনি বলেন, ‘না তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল।’

এ সময় আরএফএল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগে মামলা করা হয়েছে- জানতে চাইলে ইন্সপেক্টর বদরুল কবীর এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ বিষয়ে জানতে হলে আপনাকে থানায় এসে জানতে হবে অথবা এ বিষয়ে যিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তার সাথে কথা বলতে হবে।’

তার কথার জবাবে এ প্রতিবেদক জানতে চান, ‘কে সিদ্ধান্ত দিয়েছে (মামলা করার)?’

উত্তরে ইন্সপেক্টর বদরুল কবীর বলেন, ‘আমাদের এডিসি আশিক স্যার। তিনি সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন। তার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে নগরের ডবলমুরিং জোনের সহকারী কমিশনার আশিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো একটা লেনদেনের বিষয়ে সমস্যা ছিল। আরএফএল কর্মকর্তারা অপর এক কর্মকর্তাকে আটকে রেখে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করে। তবে আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। আমাকে এসব বলা হয়েছে।’

এ সময় জানতে চাওয়া হয়, কোন অভিযোগে আরএফএল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে? উত্তরে সহকারী কমিশনার আশিকুর রহমান বলেন, ‘অবরোধ’ করে রাখার দায়ে।

এ প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, ‘তাহলে যে মানুষগুলো বিষয়টি সমাধানের জন্য শনিবার সারাদিন থানায় ছিল তাদের কেন রোববার ডেকে নিয়ে আটক করা হলো? পুলিশ পুরো ঘটনা যাচাই করেই কি এ নির্দেশ দিয়েছিল?’

জবাবে সহকারী কমিশনার আশিকুর রহমান বলেন, ‘আপনি দেখেন তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে কি-না? আর আমরা যদি ভুল অভিযোগ করি তবে সেটা আদালত দেখবে।’

ইউসুফকে আটকে রাখা প্রসঙ্গে আরএফএল কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, ‘আমরা ইউসুফকে কোনোভাবেই আটকে রাখার চেষ্টা করিনি। তিনি এখনও আমাদের কর্মচারী। তাকে ওইদিন বেতনও পরিশোধ করা হয়েছে। পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি আদালতকে দেয়া হয়েছে। তা দেখেই আদালত আমাদের জামিন দিয়েছেন। যে ডিলারের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে তাকে নিয়ে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছি আমরা। কিন্তু অভিযুক্ত ইউসুফের স্ত্রী (পুলিশ) ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছেন।’

আল-আমিন বলেন, “আমরা শনিবার সারাদিন থানায় বসে থাকলেও থানার ওসি বা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেউ থানায় ছিলেন না। রোববার সকালে ফের আমাদের থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা ওখানে গিয়ে দেখি সহকারী কমিশনার আশিকুর সাহেব উপস্থিত। এ সময় তাকে বলতে শুনি, ‘এদের নামে মামলা দেন, আটক করেন’।”

টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে তার স্ত্রী পুলিশ কনস্টেবল রাজিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টা অনেক বড়, মোবাইলে বলা যাবে না। আমি এখানে বলতে পারব না। আপনি মামলার আইও থেকে জেনে নেন। আমি পুলিশের সদস্য বলে পুলিশকে জানাইছি, পুলিশ আমাকে হেল্প করেছে।’

চট্টগ্রাম আদালতের এডিশনাল পিপি কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এটি হয়রানিমূলক মামলা। মূলত মামলার বাদীর স্ত্রী পুলিশে কর্মরত থাকায় বাহিনীর শক্তিমত্তা কাজে লাগিয়ে এ ধরনের মামলা করা হয়েছে। মামলার শুনানি করতে গিয়ে আদালত ভবনেও পুলিশের পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। মামলার বাদী এজাহারে লিখেছেন, তাকে আরএফএল অফিসের একটি কক্ষে বেঁধে রাখা হয়েছে। অথচ মামলাটি করেছেন তিনি নিজেই। তাহলে তিনি কীভাবে ছাড়া পেলেন? কে তাকে উদ্ধার করল? এ বিষয়ে কোনো তথ্য এজাহারে নেই। কেনই-বা আসামিরা থানায় উপস্থিত থাকার পরও সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রেফতার করা হলো না?’

তিনি আরও বলেন, ‘পুরো ঘটনার স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজের কোথাও মামলার বাদী ইউসুফকে আটকে রাখা হয়েছে- এমন কোনো দৃশ্য ধরা পড়েনি। বরং অফিসের ভেতর শান্তিপূর্ণভাবেই আলোচনা হয়েছে। এ অবস্থায় অবরোধ বা অপহরণের মামলা কোনো ভাবেই যায় না। আমরা আদালতকে বিষয়টি জানানোর পর গতকাল (সোমবার) চার আসামির জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।’

‘একটি বাহিনীকে এভাবে ব্যবহার খুব দৃষ্টিকটূ’- বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুত্রঃ জাগোনিউজ।