এক কিলোমিটার এলাকায় ১৬৪ দখলদার

সৈকত দখলের তালিকায় আ.লীগ জাপা জাসদ নেতাসহ জনপ্রতিনিধিরা!

সৈকত দখলের তালিকায় আ.লীগ জাপা জাসদ নেতাসহ জনপ্রতিনিধিরা!

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের লাবণী থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার এলাকা ১৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবৈধ দখলে রয়েছে। কক্সবাজার সদর ভূমি অফিসের ২০১১ সালের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে দখলদার হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর প্যানেল মেয়র, জেলা পরিষদ সদস্যসহ বিভিন্ন স্তরের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, যুব মহিলা লীগ, জাতীয় পার্টি ও জাসদ নেতাদের নাম রয়েছে। এছাড়াও দখলদার হিসেবে বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিবেদনটি প্রকাশের ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এসব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো নতুন করে দখলদার বেড়েছে আরো ৩ শতাধিক।

ভূমি অফিসের ওই প্রতিবেদনে দখলদারের তালিকায় রয়েছেন জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সাবেক এমপি মো. ইলিয়াছ, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রনজিত দাস, সাংগঠনিক সম্পাদক ও পৌর প্যানেল মেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম, জেলা জাসদ সভাপতি নঈমুল হক চৌধুরী টুটুল, শহর জাসদ সভাপতি মো. হোসাইন মাসু, জেলা জাতীয় পার্টির সিনিয়র সহ-সভাপতি এডভোকেট মো. তারেক, শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য মাহমুদুল করিম চৌধুরী মাদু, জেলা আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক এমএ মনজুর, উপ-দপ্তর সম্পাদক (জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক) আবু তাহের আজাদ, জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম, যুব মহিলা লীগের সভাপতি আয়েশা সিরাজ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবদুর রহিম, সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কায়সারুল হক জুয়েল, জেলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি রেজাউল করিমের স্ত্রী সাহানা চেমন বানু, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা তাপস রক্ষিত, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এডভোকেট আহমদ হোসাইনের ছেলে জেলা ছাত্রলীগ নেতা কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের সাবেক নারী এমপি এথিন রাখাইনের নিকটাত্মীয় অংথোই।

এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতাদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বারিধারা নিও ডিওএইচএসের বাসিন্দা মো. ইসলামের ছেলে সামিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের আয়শা মঞ্জিলের আবু সুফিয়ানের ছেলে নুরুল আকতার, এহতেশাম ভিলার শামসুল হকের মেয়ে শাহানা খানম দোলন, চকরিয়া পহরচাঁদার মৃত বাচা মিয়ার ছেলে বাদশা মিয়া, পূর্ব বড় ভেওলার আনোয়ার হোসেনের ছেলে ছিদ্দিক আহমদ, যুবলীগ নেতা আশরাফউদ্দিন, ডালিম বড়ুয়া প্রমুখ।

হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন কক্সবাজার-টেকনাফ ১২০ কি.মি. সমুদ্র সৈকতের সীমানা নির্ধারণ ও সৈকতে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আবেদন করে হাইকোর্টে রিট করে। এরই প্রেক্ষিতে ‘সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ’ ও ‘অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ’ এর জন্য হাইকোর্ট কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক সদর ভূমি অফিসের মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরিবেশ অধিদপ্তর, বনবিভাগ, গণপূর্ত বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভূমি বিভাগ ট্রেস ম্যাপসহ এই প্রতিবেদন তৈরি করে।

প্রতিবেদনটি ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর সদর ভূমি অফিস থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে এই প্রতিবেদনটি সংযুক্ত করে জেলা প্রশাসন উচ্চ আদালতে একটি প্রতিবেদন পাঠায়।

কক্সবাজার সদর ভূমি অফিসের প্রতিবেদন (স্মারক নং উ:ভূ:অ/সদর/কক্স/২০১১-১৯২৩, তারিখ ৩০ অক্টোবর, ২০১১ সাল) অনুযায়ী, সমুদ্র সীমানা দখল করে গড়ে ওঠেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ, বনবিভাগ, জেলা পরিষদসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বহুতল ভবনও। উপরন্তু ট্যুরিস্ট পুলিশের সামনের ‘বিচ পার্ক’ এর জমিতে ১০তলা বিশিষ্ট সার্কিট হাউস নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ইয়েস কক্সবাজার’ প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ২০১১ সালের তালিকায় আসা সমুদ্র সীমানা জবরদখলকারী ১৬৪ স্থাপনাতো গত ৮ বছরেও উচ্ছেদ করা হয়নি। উল্টো সেখানে নতুন করে দখলদার বেড়েছে আরো ৩ শতাধিক।

এ বিষয়ে দখলদার তালিকায় থাকা জাতীয় পার্টির সাবেক এমমি মো. ইলিয়াছ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রনজিত দাশসহ অন্যরা জানান, পুরনো ঝিনুক মার্কেটের পার্শ্ববর্তী খালি জায়গায় দোকান নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে জেলা প্রশাসনই একসনা ইজারামূলে জমিটি তাদের নামে বরাদ্দ দিয়েছিল। সেখানে তারা টিনশেড আধাপাকা দোকানঘর নির্মাণ করেছেন। অথচ এই মার্কেটের চেয়ে আরো নিচু এলাকায় বহুতল সরকারি ভবন রয়েছে।

তবে বনবিভাগের রেস্টহাউসটিসহ অন্যান্য সরকারি ভবনগুলো প্রায় ৩ দশক আগে গড়ে ওঠে দাবি করে সংশ্লিষ্টরা ওই সময় সেরকম কোনো নীতিমালা ছিল না বলেও জানান।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) গড়ে ওঠা সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। কিছুদিন আগেও বেশ কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।

তবে কিছু স্থাপনা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় সেসব প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।
সূত্রঃ আজাদী, আহমদ গিয়াস।