জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে গণঐক্যের ডাক বিএনপির

ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার ভারতের সাথে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করেছে বলে অভিযোগ করে এর বিরুদ্ধে গণঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।

শনিবার (১২ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীতে এক সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার হোসেন এই আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘‘ ফেনীর নদীর পানি সরবারহ, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার, বঙ্গোপসাগরের উপকুল পর্যবেক্ষণে যৌথ রাডার স্থাপন, আমদানিকৃত এলজিপি রপ্তানি করা- এই চারটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বলে আমরা মনে করি। এই চারটি চুক্তির একটিও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে নয়।”

‘‘ আপনাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত তোষণের নীতি হিসেবে আপনারা এসকল চুক্তি করে এসেছেন। উদ্দেশ্য একটাই গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকার জন্যে দেশের গণতন্ত্রকে আপনারা হত্যা করেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ২৯ তারিখে ভোট ডাকাতি করেছেন, এই ডাকাতির সরকার আজকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য
আমাদের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছেন।”

ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘‘ এদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার আছে এসব চুক্তির প্রতিবাদ করার। আমরা বলতে চাই, আমরা এই প্রতিবাদ আর সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব না।”

‘‘ এদেশের জনগণ যে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে দেশ স্বাধীন করেছিলো, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হতে পারে, সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকবে না।”

নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে দুইদিনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই সমাবেশ হয়। আগামীকাল রোববার হবে দেশের সব জেলা সদরে।

আজ নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়ের সামনে এই সমাবেশ শুরু হয় বেলা দেড়টায়, শেষ হয় সাড়ে চারটায়। সমাবেশে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আবরার ফাহাদের ছবির পাশাপাশি ‘দেশবিরোধী’ চুক্তি বাতিলে দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা গেছে নেতা-কর্মীদের হাতে হাতে।

কাকরাইলের নাইটেঙ্গল রেঁস্তোরা থেকে শুরু করে ফকিরের পুল মোড় পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কে হাজার হাজার নেতা-কর্মীর উপস্থিতিতে বিকালে চারটায় সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়।

নয়াপল্টনের সড়কে ওপর এই সমাবেশে হলেও সড়কের একপাশে একটি গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়। এই চলাচল সচল রাখতে জনস্রোতকে সরিয়ে যানচলাচলের ব্যবস্থা করতে মির্জা আব্বাসও নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যবস্থা নিতেও দেখা গেছে।

সরকারের ভারতপ্রীতি নীতির কঠোর সমালোচনা করে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘‘ ২০০১ সালে আজকের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, গ্যাস ভারতকে না দেয়ার কারণে আমি ক্ষমতায় আসতে পারি নাই। আজকে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন এসেছে, আপনি আপনার দেশের আমদানি করা এলপিজি দিয়ে তাহলে কী সেই ২০০১ সালে সেই যে আপনি গ্যাস দেন নাই সেটার আপনি খেসারত দিচ্ছেন কিনা। আপনারা দেখেছেন, এই চুক্তি কত বড় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি এবং আমাদের দেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক চুক্তি-এর প্রতিবাদ বুয়েটের মেধাবী ছাত্র সেটার প্রতিবাদ করে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলো। এ জন্য আজকে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

আমি বলতে চাই, আবরারের এই স্ট্যাটাস এদেশের জনগনের মনের কথা, এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষের কথা, আবরারের একথা এদেশে আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা।”

‘‘ আপনারা শুধু আবরারকে হত্যা করে নাই, তাকে হত্যা করে আপনারা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে হত্যা করেছেন, আপনারা এদেশে আধিপত্যবাদকে বিস্তার করার জন্য আবরারকে হত্যা করেছেন। আজকে সারা বাংলাদেশের মানুষ, ছাত্র সমাজ ফুঁসে উঠেছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে।”

‘‘ আজকে যারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন করে চুক্তি করেন, আজকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রকে যারা হত্যা করেন, এদেশে যারা চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ,
ক্যাসিনোবাজ, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যারা ক্ষমতায় থাকতে চান। আমরা বিশ্বাস করি এই আবরার রক্ত দিয়ে আপনাদের পতনের যে আন্দোলন তার সূত্রপাত করে গেছে, বীজ বপন করে গেছে। বাংলাদেশের জনগণ, দেশপ্রেমিক ছাত্রসমাজ তারা ঐক্যবদ্ধ, তারা আবরারের রক্ত বৃথা যেতে দেবে না। ইনলাল্লাহ এই সরকার বেশিদিন টিকতে পারবে না।”

গণতন্ত্র পুণঃপ্রতিষ্ঠা করতে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রয়োজন উল্লেখ করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ও দেশনেত্রীর মুক্তির জন্য এদেশে আগামী দিনে যেসমস্ত কর্মসূচি আসবে আপনারা সাহসের সাথে আজকের মতো সফল করার জন্য সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে এদেশের জনগণকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করতে পারবো এবং ইস্পাত কঠিন গণঐক্য ছাড়া এই ফ্যাসিবাদের পতন হবে না।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘‘এই সরকার দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। তারা এমন ফাঁদে পড়েছে, সেই ফাঁদ থেকে তাদের কোনো নিস্কৃতি নাই, এই ফাঁদ থেকে তারা উঠে আসতে পারবে না। আমি মনে করি, এই সরকারের পতন এখন সময়ে ব্যাপার।”

‘‘এই দেশের মানুষ কখনো এই ধরনের সরকারকে বরদাশ করতে পারে না। ” বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘‘আজকের খবরের কাগজে দেখলাম, এমন কোনো হল নাই, ডরমেটরি নাই বাংলাদেশে তাদের টর্চার সেল নাই। আজকে এই আবরারের হত্যাকাণ্ড সারা দেশের মানুষকে অবাক করেছে, মর্মাহত করেছে। একজন আবরার হত্যা করে কোনো লাভ হবে না, তার মতো শত শত আবরারের জন্ম দেবে।”

ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তিরও সমালোচনা করেন সাবেক এ আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ বিক্রি করেন নাই। কিন্তু দেশের মানুষ বোকা নয়, তারা জানে আপনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বিক্রি করে এসেছেন ভারতে গিয়ে।”

‘‘এর পরিবর্তে আপনি বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছুই আনতে পারেন নাই। এই ব্যর্থতায় এই সরকারের জন্য কালিমা হয়ে থাকবে ইতিহাসে। আজকে আন্দোলনের সময় এসেছে, আপনারা প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এই সরকারকে আর ক্ষমতায় থাকতে দেয়া যেতে পারে না। জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে জনগণ বিএনপি ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সৃষ্টি করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।”

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘‘দুই দেশের মধ্যে বিনিময়ে চুক্তি হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী একতরফা দান করে দিয়ে আসলেন। আমি অত্যন্ত গর্বিত আমার দেশের প্রধানমন্ত্রী দান করতে জানেন। আবার অত্যন্ত লজ্জিত আমি দেখলাম ভারতের বিমানবন্দরে লাল কার্পেট নাই, এক প্রতিমন্ত্রী তাকে (শেখ হাসিনা) অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। আমি লজ্জা পেয়েছি, জাতি লজ্জা পেয়েছে, দেশ লজ্জা পেয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গেছেন, সেখানে আমাদের ইজ্জতে লেগেছে, আমাদের মানহানী হয়েছে।”

‘‘আমি মনে করি এই ধরনের নতজানু পররাষ্ট্র নীতি যদি সরকারের থাকে সেই সরকার কোনো দিন জনগণেন অধিকার আদায় করতে পারবে না, দেয়া ছাড়া। আপনি যা করতে যাচ্ছেন- চেষ্টা করতে পারেন। আমি মনে করি, আবরারের মতো লক্ষ-কোটি আবরার জন্ম নেবে আপনার অপকর্ম বাংলাদেশে সফল হতে দেবে না।”

মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে ও উত্তর-দক্ষিণের দুই সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার ও আহসান উল্লাহর পরিচালনায় সমাবেশে বিএনপির আবুল খায়ের ভুঁইয়া, রুহুল কবির রিজভী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আজিজুল বারী হেলাল, আবদুস সালাম আজাদ, আমিরুল ইসলাম খান আলিম, অঙ্গসংগঠনের আফরোজা আব্বাস, সাইফুল আলম নিরব, শফিউল বারী বাবু, মুন্সি বজলুল বাসিত আনজু, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সাদেক আহমেদ খান, আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, মোরতাজুল করিম বাদরু, হাসান জাফির তুহিন, হেলেন জেরিন খান, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল বক্তব্য রাখেন।