নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি

নাগরিকত্ব ও অধিকারের নিশ্চিত হলেই কেবল রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি

নূরুল হক
নিজস্ব প্রতিবেদক, টেকনাফ
কক্সবাজার ভিশন ডটকম

নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত না পাওয়া পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নন। তাদের ফেলে আসা স¤পদ, ভিটি-বাড়ি ফেরত এবং জীবনের সুরক্ষার নিশ্চয়তা পেলেই স্বদেশে ফিরে যাবেন তারা। জোর করে কেউ মিয়ানমারে নিয়ে যেতে পারবে না। তারা বলেন, ‘প্রয়োজনে (বাংলাদেশে) গুলি করে আমাদের হত্যা করা হোক, তাতে আমরা খুশি। এতে করে আমাদের মৃতদেহ ন্যুনতম জানাজা ও কবরের একটি স্থান পাবে।’

‘নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত হলে আমরা স্বেচ্ছায় ফিরে যাবো’- এমনটি জানালেন টেকনাফের শালবাগান ২৬ নাম্বার রোহিঙ্গা শিবিরের সিআইসি কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার দিয়ে আসা একই শিবিরের ডি-২ আবু ছিদ্দিক, শামসুল আলম, মো. সেলিম, আবু তাহের, গৃহবধূ হাসিনা বেগম ও জোহরা বেগম।

প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা এ সকল রোহিঙ্গা বলেন, মঙ্গলবার সকালে ইউএনএইচসিআর ও ক্যা¤প ইনচার্জের প্রতিনিধিরা ঘরে ঘরে এসেছে। তারা বলেছে- তালিকায় তার ও পরিবারের নাম রয়েছে, সাক্ষাৎকার দিতে ক্যা¤েপ বিকেলে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাবো না। যে দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে এসেছি, সেখানে কেমনে ফিরে যাব। নির্যাতনের বিচার, নাগরিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত হলে স্বদেশে ফিরে যাবো।

মঙ্গলবার (২০ আগষ্ট) বিকালে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের শালবাগান ২৬ নাম্বার রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (সিআইসি) কার্যালয়ে সাক্ষাতকার শেষে এসব কথা বলেন তারা।

তার আগে সকালে এই শিবিরের কার্যালয়ের ইনচার্জ সিআইসি মোহাম্মদ খালেদ হোসেন ও ইউএনএইচসিআরের প্রটোকল অফিসার এডাম নর্ডসহ প্রত্যাবাসন তালিকা নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্টিত হয়। এরপর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশনারের সমন্বয়ে ১০টি দল শালবাগানের বিভিন্ন ব্লকের ঘরে ঘরে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সিআইসি কার্যালয়ে আসার জন্য নির্দেশনা দেন। এ সময় কিছু রোহিঙ্গা একটি দলকে বাধা দিলে হইচই শোনা যায়। এ খবরে শিবিরের ইনচার্জসহ পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে বাধা প্রদানকারিরা পালিয়ে যান। পরে ওই দল তাদের কাজ শুরু করেন। তবে সকাল থেকে এই শিবিরে আইন শৃংখলা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের তৎপরতা দেখা গেছে।

একইদিন বেলা ২টার পর থেকে তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গারা স্বাক্ষাতকার দেয়ার জন্য ক্যা¤প ইনচার্জের কার্যালয়ের পাশে স্থাপিত কক্ষে ঢুকে সাক্ষাতকার দেন।

সাক্ষাতকার শেষে রোহিঙ্গা আবু তাহের ও রশিদা বলেন, দলটি প্রথমেই জিঞ্জাসা করলেন, মিয়ানমার ফেরত যাবে কিনা। আমরা সরাসরি না বলেছি। কারণ, আমাদের আগে নাগরিকত্ব ও অধিকার ফিরে পেলে নিজ দেশ মিয়ানমারে চলে যাব। তবে স¤পদ, ভিটি-বাড়ি ফেরত ও জীবনের সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

তারা বললেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা ফেরত যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। সেখানে এখনও রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চলছে।

এসব তথ্য নিশ্চিত করে টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যা¤েপর ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের ঘরে ঘরে তাদের সাক্ষাৎকার দিতে আসার জন্য বলা হয়েছে। তাদের সব প্রস্তুতি রয়েছে, বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২১টি পরিবার সাক্ষাতকার দেয়। তবে প্রত্যাবাসন তালিকায় থাকা প্রত্যেক রোহিঙ্গা পরিবারের পর্যায়ক্রমে সাক্ষাতকার নেয়া হবে।

তিনি বলেন, এই শিবিরে ৪২ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। প্রত্যাবাসন প্রত্যাশী ৩ হাজার ৫৪০ জনের মধ্যে এ শিবির থেকে ৩ হাজার ৯১ জনের নামের একটি তালিকা এসেছে। তালিকায় এসকল রোহিঙ্গাদের নাম রয়েছে তাদের সাক্ষাতকার নেয়ার কাজ চলছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে ২৫ আগস্টে কোরবানি ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন শুরু করে। ফলে প্রাণ বাঁচাতে অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। পুরনোসহ উখিয়া-টেকনাফের ৩০টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি স¤পন্ন হয়।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!